জেটিভি নিউজ বাংলা
তারিখ: ২৭ জুলাই ২০২৬ ইং,সময় বেলা ১১:১৬ মিনিট।‘খুনিরা শুধু স্বামীকে নয়, আমাদের সবকিছু কেড়ে নিয়েছে’—একরাম হত্যার বিচার ও জমি ফেরতের আকুতি স্ত্রীর
২০১৮ সালের সেই ভয়াল রাতের পর থেকে থমকে গেছে একরামুল হকের পরিবারের জীবন। দুই মেয়েকে নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থকষ্টের মধ্যে দীর্ঘ আট বছর পার করেছেন তার স্ত্রী আয়েশা বেগম। স্বামীকে হারানোর পাশাপাশি পৈত্রিক জমি-সম্পত্তিও ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে জবরদখল করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। কক্সবাজারের টেকনাফ পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় চার্জশিট দাখিলের পর নিজের প্রত্যাশা জানিয়ে আয়েশা বেগম বলেন,
“আমি বিচার চাই, আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই। আমার স্বামী একরাম হত্যার সঙ্গে জড়িত সব আসামির বিচার চাই। সাবেক সংসদ সদস্য বদি কর্তৃক আমার পিতার কেড়ে নেওয়া জমিও ফেরত চাই। খুনিরা শুধু আমার স্বামীকে কেড়ে নেয়নি, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে আমাদের পৈত্রিক জমিজমা ও সম্পত্তি জবরদখল করে নিয়েছে। খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি আমাদের জমি ফেরত দিতে ট্রাইব্যুনাল যেন প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেন, এটাই এখন আমার শেষ চাওয়া।”
আট বছর আগের সেই কালরাত
২০১৮ সালের ২৬ মে কক্সবাজারের টেকনাফের মেরিন ড্রাইভ সড়কের নোয়াখালিয়া পাড়া এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানের নামে কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় নিহত হন একরামুল হক। সেদিন গভীর রাতে একটি ফোনকল স্তব্ধ করে দিয়েছিল পুরো দেশকে। মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তে একরামের মোবাইল ফোনটি চালু ছিল। ফোনের ওপাশে ছিলেন তার স্ত্রী আয়েশা বেগম এবং তাদের দুই সন্তান। সেই অডিওতে শোনা যায় মেয়ের প্রশ্ন—“আব্বু, তুমি কান্না করতেছো যে?” জবাবে একরাম বলেন, “না আম্মু, আমি কাঁদছি না।” স্ত্রী আয়েশা বেগমের কণ্ঠেও ধরা পড়ে অসহায় আর্তনাদ—“ও আল্লাহ! তোমরা ওরে কী করলা? হ্যালো... হ্যালো...!” ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসছিল বুটের শব্দ, গাড়ির দরজা খোলার আওয়াজ এবং কিছু কর্কশ নির্দেশ। একরামের শেষ আকুতি ছিল—“আমি কোনো অন্যায় করি নাই।” এরপরই শোনা যায় দুটি গুলির শব্দ এবং এক মায়ের বুকফাটা কান্না। দীর্ঘ আট বছর ধরে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার ও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে একরামের পরিবার।নিরাপত্তাহীনতায় কেটেছে আট বছর
হত্যাকাণ্ডের পর একটি সাজানো গল্প দিয়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর থেকে মামলাজনিত জটিলতা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে নিহত একরামের স্ত্রী ও দুই সন্তান নিজেদের বাড়িতে স্বাভাবিকভাবে থাকতে পারেননি। চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় আত্মগোপনে থাকতে হয়েছে তাদের। জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে আছে পারিবারিক বাড়িটি।যে অডিও রেকর্ড বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়
২০১৮ সালের ২৬ মে রাতে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানের নামে টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের নোয়াখালিয়া পাড়ায় র্যাব-৭-এর একটি দল একরামুল হককে গুলি করে হত্যা করে। মৃত্যুর আগে স্ত্রী ও মেয়ের সঙ্গে চলমান ফোনালাপ, একরামের গোঙানি, মেয়ের আকুতি এবং গুলির শব্দসহ সেই অডিও রেকর্ড ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বিষয়টি ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দেয়। পরবর্তী সময়ে ২০২১ সালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র র্যাবের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।ট্রাইব্যুনালে বিচার শুরু
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর একরামের পরিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ন্যায়বিচারের আশায় মামলা করে। এর ধারাবাহিকতায় গত ২৬ জুলাই ২০২৬ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হত্যাকাণ্ডের আনুষ্ঠানিক চার্জশিট দাখিল করা হয়। এতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে।ট্রাইব্যুনালের আদেশ
রাষ্ট্রপক্ষের দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদন ও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়ে ট্রাইব্যুনাল পলাতক শেখ হাসিনাসহ আট আসামির বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। একই সঙ্গে বর্তমানে কারাগারে থাকা তিন আসামিকে ট্রাইব্যুনালে সশরীরে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মামলার পরবর্তী শুনানির দিন নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ আগস্ট ২০২৬। প্রসিকিউশনের দাবি, আসামিদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ, অপহরণ, নির্যাতন এবং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।‘হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে বদি’—চিফ প্রসিকিউটর
চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম আদালতের বাইরে সাংবাদিকদের বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী বা ‘মাস্টারমাইন্ড’ ছিলেন টেকনাফের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি। তদন্তে উঠে এসেছে, স্থানীয় রাজনীতিতে পরিচ্ছন্ন ও জনপ্রিয় নেতা হওয়ায় একরামুল হক বদির একচ্ছত্র আধিপত্যের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। পাশাপাশি একরামের পরিবারের কোটি কোটি টাকার মূল্যবান সম্পত্তি দখলের পরিকল্পনাও ছিল। তার দাবি, রাজনৈতিক ইন্ধন ও ব্যক্তিগত স্বার্থে র্যাবকে ব্যবহার করে হত্যাকাণ্ডটি বাস্তবায়ন করা হয় এবং পরে একরামের জমি ক্ষমতার প্রভাবে আত্মসাৎ করা হয়। বর্তমানে বদি অন্য একটি মামলায় কারাবন্দী রয়েছেন এবং এ মামলাতেও তাকে নতুন করে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।যারা আসামি
তদন্ত প্রতিবেদনে আসামি করা হয়েছে—- সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
- সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি
- সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল
- সাবেক সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের
- সাবেক আইজিপি ও র্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ
- ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুব আলম
- ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন
- কর্নেল (অব.) আনোয়ার লতিফ খান
- মেজর (অব.) রুহুল আমিন
- স্কোয়াড্রন লিডার নাজমুস সাকিব মাহমুদ
- কমান্ডার মো. আশেকুর রহমান সৈকত।
আসামিদের বর্তমান অবস্থা
আবদুর রহমান বদি, কর্নেল (অব.) আনোয়ার লতিফ খান এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুব আলম বর্তমানে অন্য মামলায় কারাবন্দী রয়েছেন। তাদের এ মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আগামী ২৫ আগস্ট ২০২৬ ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে শেখ হাসিনাসহ বাকি আট আসামি পলাতক রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধেও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।পরিবারের শেষ প্রত্যাশা
দীর্ঘ আট বছরের আইনি লড়াইয়ের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হওয়াকে দেশের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছে একরামুল হকের পরিবার। এখন তাদের দৃষ্টি আগামী ২৫ আগস্ট ২০২৬-এর দিকে। সেদিন ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় এই বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপ শুরু হবে। একই সঙ্গে একরামের পরিবারের প্রত্যাশা—স্বামী হত্যার বিচার, দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি এবং হারিয়ে যাওয়া পৈত্রিক জমি-সম্পত্তি ফিরে পাওয়া।জেটিভি নিউজ বাংলা
দেশ ও দশের কথা বলে.....

কক্সবাজার প্রতিনিধি 























