জেটিভি নিউজ বাংলা
তারিখ :২৬ জুলাই ২০২৬ ইং,সময় সকাল ১০:৩০ মিনিট
রুট বদলে নতুন কৌশলে স্বর্ণ চোরাচালান, শাহজালাল বিমানবন্দরে তিন মাসে জব্দ ৫২ কেজির বেশি স্বর্ন
ঢাকা: রুট ও কৌশল পরিবর্তন করে হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দেশে স্বর্ণ চোরাচালানের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই-আড়াই বছরে যেখানে সাধারণত দুই থেকে আড়াই কেজি স্বর্ণের চালান ধরা পড়ত, সেখানে চলতি বছর থেকে ১৫ কেজি বা তারও বেশি ওজনের চালান উদ্ধার হচ্ছে। সাম্প্রতিক তিনটি বড় অভিযানে উদ্ধার হওয়া স্বর্ণের পরিমাণ এবং পাচারের ধরন বিশ্লেষণ করে এ তথ্য জানানো হয়েছে। বিমানবন্দরে কর্মরত একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে চোরাকারবারীরা এখন বড় চালান আনার দিকে ঝুঁকেছে। তাদের ধারণা, যেসব চালান ধরা পড়ছে না, সেগুলোর পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। সীমান্ত এলাকায় যেসব স্বর্ণ উদ্ধার হচ্ছে, তার বড় অংশই শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে বের হওয়ার পর সেখানে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন তারা। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বিমানপথে স্বর্ণ চোরাচালান নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাড়তি নজরদারি এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে একের পর এক চালান জব্দ হওয়ায় চোরাকারবারীরা এখন রুট ও কৌশল—উভয়ই পরিবর্তন করেছে। যদিও এসব তৎপরতা ঠেকাতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও নজরদারি জোরদার করেছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ বলেন, “বিমানবন্দরকে চোরাকারবারীমুক্ত রাখতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আমাদের নজরদারির কারণেই স্বর্ণের চালানগুলো ধরা পড়ছে।”
নতুন কৌশল, নতুন রুট
গত ১৯ জুলাই শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ডিজিএফআই ও ঢাকা কাস্টমস হাউসের যৌথ অভিযানে ফলের ক্যারেটের মধ্যে বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে রাখা অন্তত ১৬ কেজি স্বর্ণের বার জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের আসামি করে মামলা করেছে কাস্টমস। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, গত কয়েক বছরে আমদানি করা পণ্যের ভেতরে লুকিয়ে স্বর্ণ আনার ঘটনাগুলোর মধ্যে এটিই প্রথম। তাদের মতে, এটি চোরাকারবারীদের সম্পূর্ণ নতুন কৌশল। তাদের তথ্য অনুযায়ী, চালানটি ক্যাথে প্যাসিফিক কার্গো বিমানে আনা হয়। রামবুটান, চেরি ও অ্যাভোকাডোভর্তি ফলের ক্যারেটের মধ্যে বিশেষভাবে স্বর্ণ লুকানো ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, স্বর্ণ হংকং হয়ে ফলের কার্টনের ভেতরে রেখে কার্গোতে পাঠানো হয়, যাতে সহজেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়ানো যায়। এদিকে গোয়েন্দা তথ্য বলছে, দুবাই-চট্টগ্রাম-ঢাকা ফ্লাইটও এখন নতুন রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ কৌশলে দুবাই থেকে আসা একজন যাত্রী স্বর্ণ নিয়ে বিমানে ওঠেন। পরে চট্টগ্রাম থেকে চক্রের আরেক সদস্য একই ফ্লাইটে উঠে বিমানের ভেতরেই স্বর্ণ গ্রহণ করেন। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর দুবাই থেকে আসা যাত্রী আন্তর্জাতিক আগমনী টার্মিনাল দিয়ে বের হয়ে যান, আর চট্টগ্রাম থেকে ওঠা ব্যক্তি স্বর্ণ নিয়ে অভ্যন্তরীণ টার্মিনাল দিয়ে বেরিয়ে আসেন। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, অভ্যন্তরীণ আগমনী টার্মিনালে নিয়মিত তল্লাশি না থাকায় এই পদ্ধতিতে স্বর্ণ বের করে আনা তুলনামূলক সহজ। আগে থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্য না থাকলে এমন যাত্রীদের শনাক্ত করাও কঠিন। গত বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) এই রুট ব্যবহার করে স্বর্ণ পাচারের সময় ৭২০ গ্রাম স্বর্ণসহ এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। গোয়েন্দাদের ভাষ্য, আগে এ ধরনের তথ্য থাকলেও সাম্প্রতিক আটকের ঘটনায় নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, চোরাকারবারীরা এ কৌশলও ব্যবহার করছে। তারা আরও জানান, আগে দুবাই বা সৌদি আরব থেকে আসা ফ্লাইটে বিমানের ক্রু, বিমানের স্পর্শকাতর অংশ, লাগেজ কিংবা শরীরে বিশেষ বেল্ট ব্যবহার করে স্বর্ণ আনা হতো। এসব ক্ষেত্রেও বিমানের কিছু অসাধু ব্যক্তির যোগসাজশ থাকত।তিন মাসে জব্দ ৫২ কেজির বেশি স্বর্ণ
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত তিন মাসে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তিনটি বড় অভিযানে ৫২ কেজির বেশি স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ১২০ কোটির বেশি টাকা। গত ২৮ মার্চ দিবাগত রাতে দুবাই থেকে আসা বাংলাদেশ বিমানের বিজি-৩৪৮ ফ্লাইটের কার্গো কম্পার্টমেন্টের টয়লেটের প্যানেলের ভেতর থেকে সাদা কাপড়ে মোড়ানো অবস্থায় ১৫৩টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। মোট ওজন ছিল ১৭ কেজি ৯০১ গ্রাম। ২৪ ক্যারেটের ওই স্বর্ণের বাজারমূল্য প্রায় ৪৬ কোটি টাকা। এ ঘটনায় বাংলাদেশ বিমানের সাত কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তদন্তকারীরা জানান, কয়েকজনের মোবাইল ফোনে স্বর্ণ চোরাকারবারিদের ব্যবহৃত সাংকেতিক চিহ্ন বা কোড পাওয়া গেছে। তবে অধিকতর তদন্তের স্বার্থে এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, ওই ঘটনার সন্দেহভাজনদের সর্বোচ্চ নজরদারিতে রাখা হয়েছে, যাতে তারা দেশ ছেড়ে পালাতে বা আত্মগোপনে যেতে না পারেন। এর তিন মাস পর, গত ২ জুলাই একই ধরনের আরেকটি চালান জব্দ হয়। বাংলাদেশ বিমানের দুবাই থেকে আসা ফ্লাইট থেকে উদ্ধার করা হয় ১৮ কেজি ৭২০ গ্রাম স্বর্ণ, যার বাজারমূল্য প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। এ ঘটনায়ও মামলা হয়েছে। তবে মামলায় কাউকে নাম উল্লেখ করে আসামি করা হয়নি। এরপর গত ১৯ জুলাই কার্গো ভিলেজে ফলের ক্যারেটের ভেতর থেকে আরও ১৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়।তদন্তে মিলছে যোগসূত্র
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রথম দুই ঘটনার মধ্যে অনেক মিল রয়েছে। দুই ক্ষেত্রেই স্বর্ণের পরিমাণ প্রায় একই এবং একই এয়ারলাইনস ব্যবহার করা হয়েছে। পরে কার্গোতে ফলের ক্যারেটের মধ্যে আরেকটি চালান ধরা পড়ায় ধারণা করা হচ্ছে, আগের কৌশল ধরা পড়ে যাওয়ায় চোরাকারবারীরা নতুন কৌশল হিসেবে কার্গো ব্যবহার শুরু করেছে। তাদের ভাষ্য, প্রথম দুই চালানের তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে বাংলাদেশ বিমানের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী এতে জড়িত। তাদের সঙ্গে নেপথ্যে আর কারা রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীরা জানান, খুব শিগগিরই স্বর্ণ চোরাচালানে জড়িত বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আইনের আওতায় আনা হবে। বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, “আমরা তদন্ত প্রায় শেষ করে ফেলেছি। খুব দ্রুতই ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন হবে।” বাংলাদেশ বিমানের মুখপাত্র বোসরা ইসলাম বলেন, “ব্যক্তির অপরাধের দায় প্রতিষ্ঠান নেবে না। দুটি ঘটনায় মামলা হয়েছে। পুলিশ তদন্ত করছে। যাদের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তিনি আরও বলেন, “বিমানের কোনও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিমান কোনও অপরাধীকে ছাড় দেয় না।”উদ্বেগ বাড়ছে
বিমানবন্দরসংশ্লিষ্টদের মতে, চোরাকারবারীরা যেভাবে নতুন নতুন ফাঁকফোকর খুঁজে স্বর্ণ পাচারের চেষ্টা করছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ধরা পড়া চালানগুলো থেকে তাদের কৌশল সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেলেও, যেসব চালান এখনও ধরা পড়ছে না, সেগুলো নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। বিমানবন্দরের সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী ও নেতা খায়রুল আলম ভূঁইয়া বলেন, “আমরা এখন খুবই শঙ্কিত। চোরাকারবারীরা কার্গোও ব্যবহার করছে। অর্থাৎ তাদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে। সেই নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই তারা অপতৎপরতা চালানোর চেষ্টা করছে।” তিনি আরও বলেন, “কর্তৃপক্ষের উচিত সব ক্ষেত্রে নজরদারি আরও বাড়ানো। তা না হলে বিমানবন্দর চোরাকারবারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হবে এবং নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে।”জেটিভি নিউজ বাংলা
দেশ ও দশের কথা বলে...

স্টাফ রিপোর্টার 





















