জেটিভি নিউজ বাংলা
তারিখ: ১৩ জুলাই ২০২৬ইং, সময়: সকাল ১০:১৬ মিনিট।প্রাথমিকের পাঠ্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে খেলাধুলা, মাঠবিহীন স্কুলে বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন
২০২৭ সাল থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলাকে জাতীয় পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে যাচ্ছে সরকার। তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, কারণ দেশের প্রায় ১১ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনও খেলার মাঠ নেই। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার ৩৪২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৫২টিরই নিজস্ব মাঠ না থাকায় মাঠবিহীন এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার ব্যবস্থা কীভাবে করা হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মোট প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৬০৭টি। এর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৬৫ হাজার ৫৬৯টি এবং বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৫৩ হাজার ৩৮টি। সরকারি বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ১০ হাজার ৭৪০টিতে কোনও খেলার মাঠ নেই। রাজধানী ঢাকার ৩৪২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ৯০টিতে নিজস্ব মাঠ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, জাতীয় পাঠ্যক্রমে খেলাধুলাকে বাধ্যতামূলক করা হলে শিক্ষার্থীদের শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক বিকাশ, নেতৃত্বের গুণাবলি এবং দলগত কাজের দক্ষতা বাড়বে। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ভিত্তিক খেলাধুলার সংস্কৃতিও আরও শক্তিশালী হবে। গত ১৫ মে জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে আয়োজিত ‘শিশুর নিরাপদ জীবন: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে শিশু-কিশোর সংগঠন খেলাঘর বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ না থাকার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। সংগঠনটির মতে, খেলার মাঠের অভাবে শিশুরা মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইসে আসক্ত হয়ে পড়ছে এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এর ফলে তারা মানসিক বৈকল্য নিয়ে বেড়ে উঠছে এবং ধর্ষণ, পাচার, মানসিক নির্যাতন, অপুষ্টি ও শিশুশ্রমসহ বিভিন্ন ঝুঁকির মুখে পড়ছে।খেলাধুলাকে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, শিশুদের ক্রীড়ামোদী করে গড়ে তুলতে খেলাধুলাকে জাতীয় পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য খেলাধুলা বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। গত ৪ জুন মিরপুরের ন্যাশনাল বাংলা উচ্চ বিদ্যালয়ে ‘প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট (বালক-বালিকা) ২০২৬’-এর জাতীয় পর্যায়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিশুদের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাই শিশুদের ক্রীড়ামোদী করে গড়ে তুলতে খেলাধুলাকে জাতীয় পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় গত ২৮ জুন সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলাকে বাধ্যতামূলকভাবে জাতীয় পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে মাঠের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করাসহ একগুচ্ছ নির্দেশনা জারি করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর (ডিপিই)। এর আগে ১৬ মার্চ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।মাঠ না থাকলে কীভাবে বাস্তবায়ন হবে
ডিপিইর নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যেসব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ রয়েছে, সেগুলো খেলাধুলার উপযোগী করতে প্রয়োজনীয় চাহিদা নিরূপণ করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ আনার উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যদিকে যেসব বিদ্যালয়ের নিজস্ব মাঠ নেই, সেগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরে পাঠাতে হবে। পাশাপাশি আশপাশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি মালিকানাধীন মাঠ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্যবহারের লক্ষ্যে সমঝোতা বা চুক্তির উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া মন্দির, মসজিদ, খালি জায়গা, পতিত জমি কিংবা অন্য কোনও সরকারি সংস্থার মাঠ থাকলে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় যৌথভাবে খেলাধুলার আয়োজনের ব্যবস্থাও করতে হবে। যেসব বিদ্যালয়ে কোনওভাবেই মাঠের ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়, সেখানে বরাদ্দ অর্থ দিয়ে দাবা, ক্যারামসহ বিভিন্ন ইনডোর গেমসের সরঞ্জাম সরবরাহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়মিত বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজন এবং প্রতিদিন পাঠদান শেষে ও সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বিদ্যালয়ের মাঠ শিশুদের জন্য উন্মুক্ত রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক মুহাম্মদ ফাতিহুল কাদীর বলেন, ২০২৭ সাল থেকে খেলাধুলা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তিনি জানান, শহরের অধিকাংশ বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ না থাকাটা বাংলাদেশের বড় সংকট। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনা হবে। বইয়ের মাধ্যমে ধারণা দেওয়ার পাশাপাশি বাস্তব অনুশীলনের বিষয়টিও নিশ্চিত করার চেষ্টা থাকবে। তবে ২০২৭ সালের মূল বই ইতোমধ্যে প্রস্তুত হয়ে যাওয়ায় এবার মূল বইয়ে বিষয়টি যুক্ত হচ্ছে না; পরে আলাদাভাবে বা একসঙ্গে সংযোজন করা হবে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী বলেন, এটি একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত। এ বিষয়ে মতামত দেওয়ার এখতিয়ার তাঁর নেই। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে অধিদফতর প্রয়োজনীয় কাজ করবে।খেলার মাঠ দখলমুক্ত করার উদ্যোগ
গত ৮ জুন জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি ৭১ বিধিতে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশ দিয়ে দেশের খেলার মাঠ দখলমুক্ত করার দাবি জানান। তিনি বলেন, ইট-পাথরের ব্যস্ত নগরে বন্দি শিশু-কিশোরদের মোবাইলের ডিজিটাল স্ক্রিন থেকে বের করে খেলার মাঠের মুক্ত পরিবেশে ফিরিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে বিভাগীয় ও জেলা শহরের মাঠ ও পার্ক দখলদার এবং মাদকসেবীদের কবল থেকে মুক্ত করে জনসাধারণের জন্য নিরাপদ করার আহ্বান জানান। জবাবে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, মাঠ ও পার্ক পুনরুদ্ধার এবং আধুনিকায়নে সরকার বদ্ধপরিকর। ইতোমধ্যে ঢাকাসহ সারা দেশে উচ্ছেদ ও উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনায় এখন প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে আন্তঃবিদ্যালয় ফুটবল ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা দেশজুড়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছে, যা তৃণমূল পর্যায়ে খেলাধুলার গতি বাড়িয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের ২৯ মে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠ খেলাধুলার উপযোগী করতে উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এর আগে ২০১৭ সালের ৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের খেলার মাঠ দখলমুক্ত করে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার উপযোগী করতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরকে (মাউশি) প্রস্তাব দেয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। পরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগও এ বিষয়ে নির্দেশনা জারি করলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায়নি। গত ১৬ জুন জাতীয় সংসদে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক জানান, দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে ৮ থেকে ১০ বিঘা আয়তনের একটি উন্মুক্ত খেলার মাঠ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি আরও জানান, ঢাকা মহানগরীসহ সারা দেশে অবৈধ দখলকৃত খেলার মাঠ উদ্ধার ও খেলাধুলার উপযোগী করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে আহ্বায়ক হিসেবে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং সদস্য হিসেবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীরা রয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, কমিটি ইতোমধ্যে দুটি সভা করেছে এবং ঢাকার বিভিন্ন মাঠ সরেজমিনে পরিদর্শন করেছে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছেও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে।জেটিভি নিউজ বাংলা
দেশ ও দশের কথা বলে ...

স্টাফ রিপোর্টার 





















