ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬, ২৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
দিনদুপুরে সশস্ত্র হামলা: ‘ব্যবসা করতে হলে এককালীন ২ কোটি, মাসে ১০ লাখ’—চাঁদা না পেয়ে ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠানে তাণ্ডব, লুট ৩৫ লাখ টাকা গাজীপুরে চোলাই মদ তৈরির কারখানার সন্ধান, ১,৫১০ লিটার মদ ও ‘ওয়াশ’ জব্দ বন্যায় সারা দেশে সাড়ে ৪ কোটি টাকা ও ৮ হাজার ৯৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ, সর্বোচ্চ সহায়তা চট্টগ্রামে প্রাথমিকের পাঠ্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে খেলাধুলা, মাঠবিহীন স্কুলে বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন আমিনবাজার ও মাতুয়াইলে ওয়েস্ট টু এনার্জি প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে একাত্তরের বিতর্কিত ভূমিকার দায় স্বীকার করে ক্ষমা চাইতে হবে: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বন্যা পরিস্থিতিতে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে প্রধানমন্ত্রী, উদ্ধার-ত্রাণ-পুনর্বাসনে সমন্বিত কার্যক্রম জোরদার জেলা-উপজেলা হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়াতে কাজ চলছে, ঢাকামুখী রোগীর চাপ কমানো হবে: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার: রাজধানীতে সক্রিয় শতাধিক চক্র, গ্রেফতারই কি সমাধান ওমরা ও ট্যুরিস্ট ভিসার আড়ালে মানবপাচারের সিন্ডিকেট: অনুসন্ধানে বারী মোল্লাকে ঘিরে বিস্তর তথ্য, চলছে বিভাগীয় তদন্ত

কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার: রাজধানীতে সক্রিয় শতাধিক চক্র, গ্রেফতারই কি সমাধান

জেটিভি নিউজ বাংলা

তারিখ: ১১ জুলাই ২০২৬ ইং,সময় সকাল ১১:১৩ মিনিট

কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার: রাজধানীতে সক্রিয় শতাধিক চক্র, গ্রেফতারই কি সমাধান?

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। কোথাও তারা স্থানীয় ‘বড় ভাইয়ের’ অনুসারী, কোথাও মাদক কারবারের বাহক, আবার কোথাও চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সামনের সারির সদস্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বয়স কম হওয়ায় গ্রেফতারের পর অনেকেই আইনের বিশেষ সুরক্ষা পেয়ে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র বা সংশোধনাগারে যায়। কিন্তু মুক্তি বা জামিনে বেরিয়ে আবারও পুরোনো এলাকায় ফিরে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। বদলে যাচ্ছে শুধু গ্যাংয়ের নাম কিংবা রাজনৈতিক আনুগত্য, বদলাচ্ছে না অপরাধের ধরন। বরং আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে তারা। এতে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—কিশোর গ্যাং রুখবে কে? ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদপুর, মিরপুর ও উত্তরাকে কেন্দ্র করে এখনও সক্রিয় রয়েছে শতাধিক কিশোর গ্যাং। এসব চক্র ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, ভাড়াটে হামলা, অস্ত্রের মহড়া, জমি দখল এমনকি হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর অপরাধেও জড়িত। নিয়মিত অভিযান চালিয়ে সদস্যদের গ্রেফতার করা হলেও অনেকেই অল্প সময়ের মধ্যেই এলাকায় ফিরে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, কিশোর গ্যাং এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে শুধু অভিযান ও গ্রেফতার দিয়ে সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। গ্যাং সদস্যদের পাশাপাশি তাদের অর্থদাতা, মাদক সরবরাহকারী, রাজনৈতিক ও স্থানীয় পৃষ্ঠপোষক এবং অপরাধ থেকে লাভবান ব্যক্তিদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। একইসঙ্গে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সমাজকে প্রতিরোধমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে। ডিএমপির সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী, রাজধানীর ৫০টি থানা এলাকায় ১১৮টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩২টি গ্যাং রয়েছে মিরপুর বিভাগের সাতটি থানা এলাকায়। শুধু পল্লবী থানাতেই রয়েছে ১৪টি গ্রুপ। তেজগাঁও বিভাগের ছয়টি থানা এলাকায় রয়েছে ২৬টি গ্যাং, যার মধ্যে মোহাম্মদপুর থানায়ই রয়েছে ১৬টি। এছাড়া রমনা বিভাগে ৬টি, লালবাগে ১০টি, ওয়ারীতে ১৩টি, মতিঝিলে ১০টি, গুলশানে ১১টি এবং উত্তরা বিভাগে ১০টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। তবে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের হিসাবে সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা ১০০-এর নিচে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, তালিকা ও সংজ্ঞাগত পার্থক্যের কারণে সংখ্যায় কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। অনেক গ্রুপ ভেঙে নতুন নামে আত্মপ্রকাশ করে, আবার একই সদস্য একাধিক গ্রুপের সঙ্গেও যুক্ত থাকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি গ্যাংয়ে সাধারণত ৭ থেকে ২০ জন সদস্য থাকে এবং তাদের বয়স ১৪ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। দেশীয় ধারালো অস্ত্রের পাশাপাশি কিছু চক্রের হাতে আগ্নেয়াস্ত্রও রয়েছে। অধিকাংশ সদস্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাদক ব্যবসা কিংবা মাদক সেবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। রাজনৈতিক পালাবদলে বদলেছে ‘বড় ভাই’ সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংগুলোর নেতৃত্ব, আনুগত্য ও ছত্রছায়ায় পরিবর্তন এসেছে। আগে যারা কোনো কাউন্সিলর, ছাত্রসংগঠনের নেতা বা স্থানীয় প্রভাবশালীর অনুসারী ছিল, তাদের একটি অংশ এখন নতুন নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়েছে। কেউ দলবদল করেছে, কেউ নতুন নেতৃত্বের অধীনে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। ক্ষমতার শূন্যতা ও অন্তর্বর্তী সময়ের দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে কোথাও পুরোনো গ্যাং নতুন নামে ফিরে এসেছে, কোথাও বিভক্ত সদস্যরা নতুন চক্র গঠন করেছে। আনুগত্য পরিবর্তন ও এলাকার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। বাজার, বাসস্ট্যান্ড, ফুটপাত, পার্কিং, ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা, ময়লা ব্যবস্থাপনা, ছোট টেন্ডার এবং জমি দখলের মতো বিভিন্ন খাতে আধিপত্য ধরে রাখতে কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো, হামলা, চাঁদা আদায় এবং রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের কাজেও তাদের সামনে রাখা হয়। মোহাম্মদপুর এলাকায় এলেক্স গ্রুপ, ইমন গ্রুপ, শুটার আনোয়ার গ্রুপ, কব্জি কাটা গ্রুপ, আকাশ গ্রুপ, ‘দ্য কিং অব লও ঠেলা’ এবং ডায়মন্ড গ্রুপসহ বিভিন্ন নামে কিশোর গ্যাং সক্রিয় থাকার তথ্য রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। নিয়মিত অভিযান ও গ্রেফতারের পরও পুরোনো চক্র ভেঙে নতুন নামে সংগঠিত হওয়ার প্রবণতা বন্ধ হয়নি। ‘অপরাধী হয়ে জন্মায় না, তৈরি করা হয়’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম বলেন, সমাজে ‘মাসল পাওয়ার’-নির্ভর একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এলাকা নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও অবৈধ অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় জনশক্তির একটি অংশ কিশোরদের দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে। এখানেই অপরাধী ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের মধ্যে সংযোগ গড়ে ওঠে। তার ভাষ্য, কোনো কিশোর জন্মগতভাবে অপরাধী নয়। সামাজিক, পারিবারিক, অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাকে অপরাধে জড়িয়ে ফেলা হয়। শুরুতে মাদক পৌঁছে দেওয়া, তথ্য সংগ্রহ, এলাকায় মহড়া, চাঁদা আদায় কিংবা প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর মতো কাজ দেওয়া হয়। পরে বড় অপরাধীদের তত্ত্বাবধানে তারা আরও গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তিনি আরও বলেন, আজ যারা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য, তাদের একটি অংশই ভবিষ্যতে বড় গ্যাং লিডার বা সংঘবদ্ধ অপরাধীতে পরিণত হতে পারে। কম ঝুঁকিতে অর্থ, অস্ত্র, মোটরসাইকেল, পরিচিতি ও ‘বড় ভাইদের’ সান্নিধ্য পাওয়ার কারণে অপরাধ তাদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। তাই এটিকে শুধু বখে যাওয়া কিশোরের সমস্যা হিসেবে দেখলে সংকটের গভীরতা বোঝা যাবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ এখন শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ নয়; সারা দেশেই এর বিস্তার ঘটছে। সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের কিশোরদের একটি অংশ তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে এবং স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী তাদের সংগঠিত করে অপরাধে ব্যবহার করছে। তার মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। মাদক ব্যবসায়ী, অর্থদাতা, পৃষ্ঠপোষক ও গডফাদারদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আরও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, কিশোর গ্যাং দমনে বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। গ্যাং সদস্যদের তথ্যভাণ্ডার তৈরি, পৃষ্ঠপোষকদের তালিকা প্রস্তুত, মাদক ও অর্থের উৎস শনাক্ত, দ্রুত বিচার, কার্যকর সংশোধন ও পুনর্বাসন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের শিক্ষা ও কর্মমুখী কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় কিছুদিন অভিযান চললেও পরে নতুন নাম ও নতুন ‘বড় ভাইয়ের’ অধীনে একই কিশোররা আবারও অপরাধে ফিরে আসবে। গ্রেফতারই কি যথেষ্ট? ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান বলেন, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে এবং সদস্যদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। তবে মোহাম্মদপুর এলাকায় ভাসমান মানুষের সংখ্যা বেশি। আশপাশের জেলা-উপজেলা থেকেও অনেকে এসে অপরাধ করে আবার চলে যায়। জেনেভা ক্যাম্পকেন্দ্রিক অপরাধী চক্রেও কিশোরদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তিনি বলেন, শুধু গ্রেফতার করলে সমস্যার সমাধান হবে না। পরিবার, স্থানীয় সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে। বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে স্থানীয়দের সঙ্গে বৈঠক করা হচ্ছে এবং অভিভাবকদের সন্তানদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জানানো হচ্ছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, মোহাম্মদপুর, মিরপুর ও উত্তরার গ্যাংগুলোকে বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে। অভিযান চালিয়ে সদস্যদের গ্রেফতার করা হলেও অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় অনেককে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। সংশোধনের সুযোগ পেয়েও কেউ কেউ ফিরে এসে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তার মতে, বিদ্যমান আইন ও পুনর্বাসন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তবে শুধু পুলিশ, বিচার বিভাগ বা সমাজ—কোনো একপক্ষকে দায়ী করলে চলবে না। রাজনৈতিক কর্মসূচি ও মিছিলে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ব্যবহারও বন্ধ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রে কিশোরদের মিছিলের সামনে রাখা হয়, উসকানি দেওয়া হয় এবং ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা হয়। রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্ব যদি অপ্রাপ্তবয়স্কদের এভাবে ব্যবহার না করার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেয়, তাহলে পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব।  

জেটিভি নিউজ বাংলা

দেশ ও দশের কথা বলে....

ট্যাগস

জনপ্রিয় সংবাদ

দিনদুপুরে সশস্ত্র হামলা: ‘ব্যবসা করতে হলে এককালীন ২ কোটি, মাসে ১০ লাখ’—চাঁদা না পেয়ে ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠানে তাণ্ডব, লুট ৩৫ লাখ টাকা

কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার: রাজধানীতে সক্রিয় শতাধিক চক্র, গ্রেফতারই কি সমাধান

আপডেট সময় ১১:১৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

জেটিভি নিউজ বাংলা

তারিখ: ১১ জুলাই ২০২৬ ইং,সময় সকাল ১১:১৩ মিনিট

কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার: রাজধানীতে সক্রিয় শতাধিক চক্র, গ্রেফতারই কি সমাধান?

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। কোথাও তারা স্থানীয় ‘বড় ভাইয়ের’ অনুসারী, কোথাও মাদক কারবারের বাহক, আবার কোথাও চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সামনের সারির সদস্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বয়স কম হওয়ায় গ্রেফতারের পর অনেকেই আইনের বিশেষ সুরক্ষা পেয়ে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র বা সংশোধনাগারে যায়। কিন্তু মুক্তি বা জামিনে বেরিয়ে আবারও পুরোনো এলাকায় ফিরে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। বদলে যাচ্ছে শুধু গ্যাংয়ের নাম কিংবা রাজনৈতিক আনুগত্য, বদলাচ্ছে না অপরাধের ধরন। বরং আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে তারা। এতে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—কিশোর গ্যাং রুখবে কে? ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদপুর, মিরপুর ও উত্তরাকে কেন্দ্র করে এখনও সক্রিয় রয়েছে শতাধিক কিশোর গ্যাং। এসব চক্র ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, ভাড়াটে হামলা, অস্ত্রের মহড়া, জমি দখল এমনকি হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর অপরাধেও জড়িত। নিয়মিত অভিযান চালিয়ে সদস্যদের গ্রেফতার করা হলেও অনেকেই অল্প সময়ের মধ্যেই এলাকায় ফিরে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, কিশোর গ্যাং এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে শুধু অভিযান ও গ্রেফতার দিয়ে সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। গ্যাং সদস্যদের পাশাপাশি তাদের অর্থদাতা, মাদক সরবরাহকারী, রাজনৈতিক ও স্থানীয় পৃষ্ঠপোষক এবং অপরাধ থেকে লাভবান ব্যক্তিদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। একইসঙ্গে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সমাজকে প্রতিরোধমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে। ডিএমপির সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী, রাজধানীর ৫০টি থানা এলাকায় ১১৮টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩২টি গ্যাং রয়েছে মিরপুর বিভাগের সাতটি থানা এলাকায়। শুধু পল্লবী থানাতেই রয়েছে ১৪টি গ্রুপ। তেজগাঁও বিভাগের ছয়টি থানা এলাকায় রয়েছে ২৬টি গ্যাং, যার মধ্যে মোহাম্মদপুর থানায়ই রয়েছে ১৬টি। এছাড়া রমনা বিভাগে ৬টি, লালবাগে ১০টি, ওয়ারীতে ১৩টি, মতিঝিলে ১০টি, গুলশানে ১১টি এবং উত্তরা বিভাগে ১০টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। তবে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের হিসাবে সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা ১০০-এর নিচে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, তালিকা ও সংজ্ঞাগত পার্থক্যের কারণে সংখ্যায় কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। অনেক গ্রুপ ভেঙে নতুন নামে আত্মপ্রকাশ করে, আবার একই সদস্য একাধিক গ্রুপের সঙ্গেও যুক্ত থাকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি গ্যাংয়ে সাধারণত ৭ থেকে ২০ জন সদস্য থাকে এবং তাদের বয়স ১৪ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। দেশীয় ধারালো অস্ত্রের পাশাপাশি কিছু চক্রের হাতে আগ্নেয়াস্ত্রও রয়েছে। অধিকাংশ সদস্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাদক ব্যবসা কিংবা মাদক সেবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। রাজনৈতিক পালাবদলে বদলেছে ‘বড় ভাই’ সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংগুলোর নেতৃত্ব, আনুগত্য ও ছত্রছায়ায় পরিবর্তন এসেছে। আগে যারা কোনো কাউন্সিলর, ছাত্রসংগঠনের নেতা বা স্থানীয় প্রভাবশালীর অনুসারী ছিল, তাদের একটি অংশ এখন নতুন নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়েছে। কেউ দলবদল করেছে, কেউ নতুন নেতৃত্বের অধীনে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। ক্ষমতার শূন্যতা ও অন্তর্বর্তী সময়ের দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে কোথাও পুরোনো গ্যাং নতুন নামে ফিরে এসেছে, কোথাও বিভক্ত সদস্যরা নতুন চক্র গঠন করেছে। আনুগত্য পরিবর্তন ও এলাকার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। বাজার, বাসস্ট্যান্ড, ফুটপাত, পার্কিং, ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা, ময়লা ব্যবস্থাপনা, ছোট টেন্ডার এবং জমি দখলের মতো বিভিন্ন খাতে আধিপত্য ধরে রাখতে কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো, হামলা, চাঁদা আদায় এবং রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের কাজেও তাদের সামনে রাখা হয়। মোহাম্মদপুর এলাকায় এলেক্স গ্রুপ, ইমন গ্রুপ, শুটার আনোয়ার গ্রুপ, কব্জি কাটা গ্রুপ, আকাশ গ্রুপ, ‘দ্য কিং অব লও ঠেলা’ এবং ডায়মন্ড গ্রুপসহ বিভিন্ন নামে কিশোর গ্যাং সক্রিয় থাকার তথ্য রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। নিয়মিত অভিযান ও গ্রেফতারের পরও পুরোনো চক্র ভেঙে নতুন নামে সংগঠিত হওয়ার প্রবণতা বন্ধ হয়নি। ‘অপরাধী হয়ে জন্মায় না, তৈরি করা হয়’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম বলেন, সমাজে ‘মাসল পাওয়ার’-নির্ভর একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এলাকা নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও অবৈধ অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় জনশক্তির একটি অংশ কিশোরদের দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে। এখানেই অপরাধী ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের মধ্যে সংযোগ গড়ে ওঠে। তার ভাষ্য, কোনো কিশোর জন্মগতভাবে অপরাধী নয়। সামাজিক, পারিবারিক, অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাকে অপরাধে জড়িয়ে ফেলা হয়। শুরুতে মাদক পৌঁছে দেওয়া, তথ্য সংগ্রহ, এলাকায় মহড়া, চাঁদা আদায় কিংবা প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর মতো কাজ দেওয়া হয়। পরে বড় অপরাধীদের তত্ত্বাবধানে তারা আরও গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তিনি আরও বলেন, আজ যারা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য, তাদের একটি অংশই ভবিষ্যতে বড় গ্যাং লিডার বা সংঘবদ্ধ অপরাধীতে পরিণত হতে পারে। কম ঝুঁকিতে অর্থ, অস্ত্র, মোটরসাইকেল, পরিচিতি ও ‘বড় ভাইদের’ সান্নিধ্য পাওয়ার কারণে অপরাধ তাদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। তাই এটিকে শুধু বখে যাওয়া কিশোরের সমস্যা হিসেবে দেখলে সংকটের গভীরতা বোঝা যাবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ এখন শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ নয়; সারা দেশেই এর বিস্তার ঘটছে। সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের কিশোরদের একটি অংশ তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে এবং স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী তাদের সংগঠিত করে অপরাধে ব্যবহার করছে। তার মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। মাদক ব্যবসায়ী, অর্থদাতা, পৃষ্ঠপোষক ও গডফাদারদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আরও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, কিশোর গ্যাং দমনে বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। গ্যাং সদস্যদের তথ্যভাণ্ডার তৈরি, পৃষ্ঠপোষকদের তালিকা প্রস্তুত, মাদক ও অর্থের উৎস শনাক্ত, দ্রুত বিচার, কার্যকর সংশোধন ও পুনর্বাসন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের শিক্ষা ও কর্মমুখী কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় কিছুদিন অভিযান চললেও পরে নতুন নাম ও নতুন ‘বড় ভাইয়ের’ অধীনে একই কিশোররা আবারও অপরাধে ফিরে আসবে। গ্রেফতারই কি যথেষ্ট? ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান বলেন, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে এবং সদস্যদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। তবে মোহাম্মদপুর এলাকায় ভাসমান মানুষের সংখ্যা বেশি। আশপাশের জেলা-উপজেলা থেকেও অনেকে এসে অপরাধ করে আবার চলে যায়। জেনেভা ক্যাম্পকেন্দ্রিক অপরাধী চক্রেও কিশোরদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তিনি বলেন, শুধু গ্রেফতার করলে সমস্যার সমাধান হবে না। পরিবার, স্থানীয় সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে। বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে স্থানীয়দের সঙ্গে বৈঠক করা হচ্ছে এবং অভিভাবকদের সন্তানদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জানানো হচ্ছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, মোহাম্মদপুর, মিরপুর ও উত্তরার গ্যাংগুলোকে বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে। অভিযান চালিয়ে সদস্যদের গ্রেফতার করা হলেও অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় অনেককে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। সংশোধনের সুযোগ পেয়েও কেউ কেউ ফিরে এসে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তার মতে, বিদ্যমান আইন ও পুনর্বাসন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তবে শুধু পুলিশ, বিচার বিভাগ বা সমাজ—কোনো একপক্ষকে দায়ী করলে চলবে না। রাজনৈতিক কর্মসূচি ও মিছিলে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ব্যবহারও বন্ধ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রে কিশোরদের মিছিলের সামনে রাখা হয়, উসকানি দেওয়া হয় এবং ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা হয়। রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্ব যদি অপ্রাপ্তবয়স্কদের এভাবে ব্যবহার না করার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেয়, তাহলে পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব।  

জেটিভি নিউজ বাংলা

দেশ ও দশের কথা বলে....