জেটিভি নিউজ বাংলা
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কমছে শিক্ষার্থী, আস্থা বাড়ছে কিন্ডারগার্টেন ও মাদ্রাসায়
নিজস্ব প্রতিবেদক তারিখ: ২৫ জুলাই ২০২৬ ইং,সময়: সকাল ১০:১১ মিনিট। রাজশাহী বিভাগের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে গত ১২ বছরে শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমেছে। একই সময়ে কিন্ডারগার্টেন, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী ভর্তির প্রবণতা বেড়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষার মান, তদারকি, জবাবদিহিতা এবং অভিভাবকদের পছন্দের পরিবর্তনের কারণে এই চিত্র তৈরি হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে রাজশাহী বিভাগের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১৩ লাখ ২০ হাজার ৯৭৫ জন। ২০২৬ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৮৩ হাজার ৯৯২ জনে। অর্থাৎ গত ১২ বছরে সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমেছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৯৮৩ জন। অথচ একই সময়ে সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিভাগটির জনসংখ্যা প্রায় ২৫ লাখ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে, কিন্ডারগার্টেনসহ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০১৪ সালের ৪ লাখ ৩৬ হাজার ৯৬৬ জন থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ৫ লাখ ৪ হাজার ৩০ জনে পৌঁছেছে। পাশাপাশি প্রতিবছর আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী বাড়লেও এ বিষয়ে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। শিক্ষাবিদদের মতে, সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষার মান, শৃঙ্খলা, তদারকি এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি অভিভাবকদের আস্থায় প্রভাব ফেলছে। ফলে শহর ও গ্রাম—উভয় এলাকাতেই অভিভাবকদের একটি বড় অংশ সন্তানদের কিন্ডারগার্টেন কিংবা মাদ্রাসায় ভর্তি করাতে আগ্রহী হচ্ছেন। রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার কান্তানগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আফরোজা খাতুন জানান, বিদ্যালয়ের আশপাশে দুটি কিন্ডারগার্টেন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ১০০ থেকে কমে ৬০-এ নেমে এসেছে। রাজশাহী মহানগরীর আটকোষি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নীলুফা আক্তার খানম বলেন, পাঁচ বছর আগে বিদ্যালয়ে সাড়ে পাঁচশোর বেশি শিক্ষার্থী থাকলেও বর্তমানে তা কমে প্রায় সাড়ে তিনশোতে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যালয়ের এক কিলোমিটারের মধ্যে অন্তত ১০টি কিন্ডারগার্টেন এবং কয়েকটি মাদ্রাসা থাকায় অনেক শিক্ষার্থী সেদিকে চলে গেছে। বিভাগের দুই ডজনেরও বেশি সরকারি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বক্তব্যেও একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে। রাজশাহীর তানোর উপজেলার কচুয়া-২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিখিল রঞ্জন প্রামাণিক জানান, তার বিদ্যালয়ের ১৭ জন শিক্ষার্থী নিকটবর্তী একটি মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার জন্য বিদ্যালয় ছেড়ে গেছে। প্রতি বছরই নতুন শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা কমছে। অভিভাবকদের মতে, কিন্ডারগার্টেনগুলোতে নিয়মিত ক্লাস, বাড়ির কাজ, পরীক্ষা, নিবিড় তদারকি এবং অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের কারণে তারা এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতি বেশি আস্থা রাখছেন। রাজশাহী মহানগরীর অভিভাবক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরকারি বিদ্যালয়ে বিনামূল্যে পড়ার সুযোগ থাকলেও তিনি শিক্ষার মান নিয়ে সন্তুষ্ট নন। তাই তিনি তার দুই সন্তানকে কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করিয়েছেন। আরেক অভিভাবক সাজু বলেন, আধুনিক শিক্ষা, ইংরেজিতে দক্ষতা এবং মানসম্মত পাঠদানের জন্য তিনি সন্তানকে বেসরকারি বিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন। গৃহকর্মী আসমা বেগমও জানান, কষ্ট করে হলেও মেয়েকে ভালো শিক্ষার আশায় কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করিয়েছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. আকতার বানুর মতে, অভিভাবকরা যে প্রতিষ্ঠানের ওপর বেশি আস্থা রাখেন, সেখানেই সন্তানকে ভর্তি করেন। দুর্বল তদারকি, শিক্ষকদের অনুপ্রেরণার অভাব এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি সরকারি বিদ্যালয়ের প্রতি মানুষের আস্থা কমিয়ে দিয়েছে। তার মতে, এই অবস্থার পরিবর্তনে সরকারি বিদ্যালয়ে কার্যকর তদারকি, জবাবদিহিতা এবং অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ নিশ্চিত করতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষার রাজশাহী বিভাগীয় উপপরিচালকের কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক নূর আখতার জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার কারণ নির্দিষ্টভাবে জানতে গবেষণা প্রয়োজন। রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান দীপক দাস বলেন, এই প্রবণতা শুধু জনসংখ্যার পরিবর্তনের ফল নয়; এটি অভিভাবকদের বিদ্যালয় নির্বাচনের পরিবর্তিত মানসিকতারও প্রতিফলন। তিনি আরও বলেন, কিন্ডারগার্টেন ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের বেতন সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তুলনায় কম হলেও তারা অভিভাবকদের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সরকারের গুরুত্বসহকারে ভাবা উচিত। রাজশাহী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এ কে এম আনোয়ার হোসেন বলেন, শিক্ষক সংকট, ছোট শ্রেণিকক্ষের প্রতি অভিভাবকদের আগ্রহ এবং কোভিড-১৯ মহামারির সময় ও পরবর্তী সময়ে শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রমে বিঘ্ন শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি জানান, সরকারি বিদ্যালয়ের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকার নজরদারি ও জবাবদিহিতা আরও জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে।জেটিভি নিউজ বাংলা
দেশ ও দশের কথা বলে....

নিজস্ব প্রতিনিধি 






















