জেটিভি নিউজ বাংলা
প্রকাশের তারিখ: ২৯ জুলাই ২০২৬ ইং,সময়: ১১:৪১ মিনিটডলারের বিকল্পে ভারতীয় রুপিতে বাণিজ্যের প্রস্তাব রাশিয়ার, রূপপুরের অর্থ জট কাটাতে নতুন উদ্যোগ
জেটিভি নিউজ বাংলা ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার সঙ্গে আর্থিক লেনদেনে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতীয় রুপিতে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছে মস্কো। শুধু রুপিতে লেনদেনই নয়, দুই দেশের মধ্যে একটি স্বতন্ত্র পেমেন্ট অবকাঠামো (Payment Infrastructure) গড়ে তোলা এবং ঢাকায় একটি রুশ ব্যাংকের শাখা চালুর বিষয়টিও আবার সামনে এনেছে দেশটি। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ-রাশিয়া বাণিজ্যে ডলারের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাজনিত জটিলতা মোকাবিলায় বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর সঙ্গে কূটনৈতিক, আর্থিক ও নিয়ন্ত্রক নানা বিষয় জড়িত থাকায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাংলাদেশকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, আগামী সেপ্টেম্বর অথবা অক্টোবরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বাংলাদেশ-রাশিয়া ‘ইন্টারগভর্নমেন্টাল কমিশন অন ট্রেড, ইকোনমিক, সায়েন্টিফিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল কোঅপারেশন’-এর বৈঠকে এসব প্রস্তাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। বৈঠকের আগে বাংলাদেশের অবস্থান ও অগ্রাধিকার নির্ধারণে প্রস্তুতিমূলক বৈঠকও চলছে। কেন রুপিতে বাণিজ্যের প্রস্তাব? ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর একাধিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে রাশিয়ার ব্যাংকিং ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেনের প্রচলিত ব্যবস্থায় বাধা সৃষ্টি হওয়ায় রাশিয়া বিভিন্ন দেশের সঙ্গে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। ইতোমধ্যে ভারত, চীন, তুরস্কসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে বিকল্প মুদ্রায় লেনদেনের ব্যবস্থা চালু করেছে দেশটি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের একটি কাঠামো গড়ে তুলতে চায় মস্কো। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে আমদানি-রপ্তানির অর্থ ভারতীয় রুপিতে নিষ্পত্তি করা হবে। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে একটি স্বতন্ত্র পেমেন্ট নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে, যাতে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কম পড়ে। রূপপুর প্রকল্পের অর্থ পরিশোধে জটিলতা রাশিয়ার এই প্রস্তাবের অন্যতম বড় কারণ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের ঋণ পরিশোধে তৈরি হওয়া জটিলতা। রাশিয়ার অর্থায়নে নির্মাণাধীন এই প্রকল্পের ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময় বাংলাদেশ বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়ে। কারণ, নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রুশ ব্যাংকগুলোর কাছে অর্থ পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। শুরুতে চীনা মুদ্রা ইউয়ানে অর্থ পরিশোধের বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া হলেও সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা ঝুঁকির কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো তাতে আগ্রহ দেখায়নি। বর্তমানে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে বাংলাদেশ সোনালী ব্যাংকে রাশিয়ার নামে খোলা একটি হিসাবে ঋণের কিস্তির অর্থ জমা রাখছে। তবে সেই অর্থ এখনও রাশিয়ায় স্থানান্তর করা সম্ভব হয়নি। ফলে কয়েক বিলিয়ন ডলারের আর্থিক দায় নিষ্পত্তির বিষয়টি ঝুলে রয়েছে। বাংলাদেশ আগে এই অর্থ দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রকল্পে ব্যবহারের প্রস্তাব দিলেও রাশিয়া তাতে সম্মত হয়নি। রুশ ব্যাংকের শাখা খোলার প্রস্তাব আবারও বাংলাদেশে একটি রুশ ব্যাংকের শাখা স্থাপনের প্রস্তাব নতুন নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও মস্কো একই উদ্যোগ নিয়েছিল। সে সময় বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতামত চাইলেও শেষ পর্যন্ত আর অগ্রগতি হয়নি। এবার আবারও একই প্রস্তাব সামনে এনেছে রাশিয়া। সংশ্লিষ্টদের মতে, রুশ ব্যাংকের শাখা চালু হলে দুই দেশের মধ্যে অর্থ লেনদেন আরও সহজ হতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, আর্থিক খাতের সুশাসন এবং বৈদেশিক সম্পর্কের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়েই বাংলাদেশকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাণিজ্য সম্প্রসারণে নতুন রোডম্যাপ আর্থিক লেনদেনের পাশাপাশি বাণিজ্য সম্প্রসারণেও একগুচ্ছ প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া। এর মধ্যে রয়েছে— বাংলাদেশ-রাশিয়া বিজনেস কাউন্সিল গঠন, রাশিয়ার বাজারের জন্য নিবন্ধিত বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানিকারকদের তালিকা তৈরি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি, বাংলাদেশে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নে সহায়তা এবং বিনিয়োগ ও শিল্প সহযোগিতা সম্প্রসারণ। রাশিয়ার মতে, রাজনৈতিক সম্পর্কের তুলনায় দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। যুদ্ধের পর কমেছে রপ্তানি রাশিয়া বাংলাদেশের একটি সম্ভাবনাময় বাজার হলেও যুদ্ধ শুরুর পর দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। যুদ্ধের আগে বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় বছরে ৫০ কোটি ডলারের বেশি পণ্য রপ্তানি হতো। তবে সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ২৪ কোটি ৫০ লাখ ডলারের পণ্য। অন্যদিকে বাংলাদেশ এখনও রাশিয়া থেকে গম, সারসহ বিভিন্ন কৌশলগত পণ্য আমদানি করছে। বাংলাদেশের অগ্রাধিকার আসন্ন আন্তঃসরকার কমিশনের বৈঠকে বাংলাদেশ কয়েকটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিতে যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রযুক্তি হস্তান্তর, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সহযোগিতা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উন্নয়ন, ডিজিটাল অর্থনীতি ও ই-কমার্স, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কানেক্টিভিটি ও লজিস্টিকস। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, শুধু বাণিজ্য নয়, দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ক্ষেত্রেও এই বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কম দামে ইউরিয়া সার দিতে আগ্রহ দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা আরও জোরদারের অংশ হিসেবে সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ব্যবস্থায় বাংলাদেশকে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার টন ইউরিয়া সার সরবরাহের আগ্রহ প্রকাশ করেছে রাশিয়া। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারদরের তুলনায় প্রতি টনে ১০ ডলার কম দামে সার সরবরাহ করা হবে। এছাড়া সূর্যমুখী তেল, গম, মিউরিয়েট অব পটাশ (এমওপি), হলুদ মটরশুঁটি, ছোলা, লাল মসুর ও সবুজ মসুর ডালের সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়েও আগ্রহ দেখিয়েছে দেশটি। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির রাশিয়ার এই আগ্রহকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, পারস্পরিক স্বার্থ ও সুবিধার ভিত্তিতে দুই দেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সুযোগ যেমন আছে, চ্যালেঞ্জও কম নয় বিশ্লেষকদের মতে, ভারতীয় রুপিতে বাণিজ্য চালু হলে বাংলাদেশ-রাশিয়া বাণিজ্যে অর্থ পরিশোধের দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা অনেকটাই কাটতে পারে। বিশেষ করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের অর্থ পরিশোধের বিকল্প পথ খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। তবে বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক নয়; এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং ঝুঁকি এবং কূটনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্নও জড়িত। ফলে বাংলাদেশকে এমন একটি কাঠামো বেছে নিতে হবে, যা একদিকে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগকে এগিয়ে নেবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে দেশের সম্পর্ক এবং আর্থিক স্থিতিশীলতাও অক্ষুণ্ন রাখবে। সব মিলিয়ে, আসন্ন বাংলাদেশ-রাশিয়া আন্তঃসরকার কমিশনের বৈঠক শুধু একটি নিয়মিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠক নয়; বরং নিষেধাজ্ঞার নতুন বৈশ্বিক বাস্তবতায় দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক কোন পথে এগোবে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করতে পারে।জেটিভি নিউজ বাংলা
দেশ ও দশের কথা বলে.....

ডেস্ক রিপোর্ট 





















