জেটিভি নিউজ বাংলা
তারিখ : ১৫ জুলাই ২০২৬ ইং,সময় বেলা ০২:১৪ মিনিট।নয়াপল্টনই যেন রুহুল কবির রিজভীর দ্বিতীয় ঠিকানা, ৭৮৭ দিনের ত্যাগ-সংগ্রামের গল্প এখনও আলোচনায়
ঢাকা: বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নিবেদিতপ্রাণ নেতা, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। বয়স প্রায় ৭০ ছুঁইছুঁই। ছাত্রজীবনে বামপন্থি ছাত্র সংগঠনের মাধ্যমে রাজনীতিতে যাত্রা শুরু করলেও সময়ের পরিক্রমায় তিনি হয়ে ওঠেন বিএনপি ও জিয়া পরিবারের অন্যতম বিশ্বস্ত এবং আস্থাভাজন নেতা।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দলের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন রিজভী। অসংখ্যবার জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন, বিসর্জন দিয়েছেন যৌবনের সোনালি সময়। বিশেষ করে বিএনপির দুঃসময়ে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে থেকে দল ও নেতাকর্মীদের পাশে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। আর সুসময়ে সেই অবদানের যথাযথ মূল্যায়নও পেয়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হওয়ার পরও দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় আগের মতোই নিয়মিত নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সময় দিচ্ছেন রুহুল কবির রিজভী। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা মন্তব্যও শোনা যায়। কেউ বলেন, "নয়াপল্টনের রিজভী এখনও নয়াপল্টনেই।" আবার অনেকে মন্তব্য করেন, "নয়াপল্টনের মায়া এখনও ছাড়তে পারেননি রিজভী।"
তবে বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন বিএনপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন। তিনি বলেন, "রুহুল কবির রিজভী ভাই একজন সংগ্রামী নেতা। দলের দুঃসময়ের কাণ্ডারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাই নয়াপল্টনের কার্যালয়টি তার কাছে শুধুই একটি অফিস নয়, এটি ভালোবাসার জায়গা। বিগত সরকারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেও তিনি কার্যালয় ছাড়েননি। দলের সুসময়েও সেই কার্যালয়কে ভুলে যাননি। আত্মিক সম্পর্কে
র কারণেই এখনও নিয়মিত সেখানে যাতায়াত করেন।" বিএনপি কার্যালয়ে রিজভীর টানা ৭৮৭ দিনের বসবাস আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত টানা ৭৮৭ দিন বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় নয়াপল্টনে একাই অবস্থান করেন অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী।
সে সময় বিএনপির তৎকালীন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ দলের শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতা গ্রেফতার হন। সেই প্রেক্ষাপটে দলীয় কার্যক্রম সচল রাখতে তিনি কার্যালয়েই অবস্থান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে রিজভী বলেন, "আমি ২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারি থেকে কার্যালয়ে অবস্থান করি। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। এরপর ম্যাডামকে জেলে নেওয়া হয়। তখন পার্টি অফিসের নিচ থেকে নেতাকর্মীদেরও ধরে নিয়ে যাওয়া হতো।"
তিনি আরও বলেন, "আমি ব্রত নিয়েছিলাম—নেতাকর্মীরা অফিসে এসে যেন কাউকে না পেয়ে ফিরে না যান। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখতেই সেখানে থেকেছি। ম্যাডাম জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর সিদ্ধান্ত নিই বাসায় ফিরে যাব।" শেষবার রিজভীর নেতৃত্বেই তালা ভেঙে কার্যালয়ে প্রবেশ করে বিএনপি
২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর বিএনপির মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে দলীয় নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের পর বিকেল থেকেই নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।
পরদিন, ২৯ অক্টোবর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ক্রাইম সিন ইউনিট কার্যালয়ের তিন পাশে "Do Not Cross: Crime Scene" ফিতা টানিয়ে আলামত সংগ্রহ করে এবং সেখানে পুলিশি পাহারা বসানো হয়। যদিও পরবর্তীতে কার্যালয়ে তালা লাগানোর বিষয়টি পুলিশের পক্ষ থেকে অস্বীকার করা হয়।
দীর্ঘ প্রায় আড়াই মাস পর, ২০২৪ সালের ১১ জানুয়ারি রুহুল কবির রিজভীর নেতৃত্বে বিএনপির নেতাকর্মীরা সেই তালা ভেঙে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রবেশ করেন।
সেদিনের ঘটনা স্মরণ করে ছাত্রদলের এক নেতা বলেন, "দীর্ঘ সময় কার্যালয়ে তালা ঝুললেও কেউ তা ভাঙার সাহস করেনি। রিজভী ভাইয়ের নির্দেশনায় আমরা তালা ভেঙে অফিসে প্রবেশ করি। আমার কাছে সেটি ছিল শুধু একটি তালা ভাঙা নয়; সেদিন আমরা ফ্যাসিস্ট হাসিনার শিকল ভেঙে দেশবাসীর কাছে বিজয়ের বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলাম।" জলাবদ্ধতার মধ্যেও নয়াপল্টনে রিজভী
সম্প্রতি টানা বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলে নয়াপল্টনের বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নিচেও পানি জমে। কিন্তু সেই পরিস্থিতিও রিজভীকে থামাতে পারেনি। জমে থাকা পানির মধ্যেই তিনি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন এবং বন্যা পরিস্থিতিসহ সমসাময়িক নানা বিষয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরেন। এর আগের দিনও তিনি হাঁটুসমান পানি মাড়িয়ে রিকশায় করে বাসায় ফিরেছেন। রিজভীর এই নিষ্ঠার প্রসঙ্গে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিবুন নবী খান সোহেল বলেন,
"রাজনীতি করতে গিয়ে তিনি যেমন বারবার কারাবরণ করেছেন, তেমনি দলের দুঃসময়ের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোও নয়াপল্টনের কার্যালয়ে কাটিয়েছেন। এখনও দলের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নিয়মিত কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আসেন। দলের প্রতি তার যে ত্যাগ, নিষ্ঠা ও ভালোবাসা, তা ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে।"
জেটিভি নিউজ বাংলার পর্যবেক্ষণ
বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে রুহুল কবির রিজভীর নাম উচ্চারিত হয় একজন ত্যাগী, সংগ্রামী এবং সংগঠননির্ভর নেতা হিসেবে। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এখনও নিয়মিত নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তার উপস্থিতি দলীয় রাজনীতিতে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। ৭৮৭ দিনের কার্যালয়বাস থেকে শুরু করে দুঃসময়ের নেতৃত্ব—সব মিলিয়ে নয়াপল্টনের সঙ্গে রিজভীর সম্পর্ক এখন বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। জেটিভি নিউজ বাংলাদেশ ও দশের কথা বলে....

স্টাফ রিপোর্টার 






















