বিশ্বে সর্বোচ্চ বেতন পেয়েও কেন পেশা ছাড়ছেন মার্কিন চিকিৎসকেরা
ডেস্ক রিপোর্ট | JTV News Bangla
২৪ জানুয়ারি ২০২৬,৩:১২ পিএম।
বিশ্বের সর্বোচ্চ বেতনভোগী চিকিৎসকদের দেশ হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র। টেক্সাসের ডালাসসহ বিভিন্ন শহরের হাসপাতালের পার্কিং লটে সারি সারি বিলাসবহুল গাড়ি—বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ, লেক্সাস—এই চিত্রই যেন সেই বাস্তবতার প্রতীক। কিন্তু এই বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর সংকট—চরম মানসিক অবসাদ বা ‘বার্নআউট’।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক থিংকট্যাংক দ্য কমনওয়েলথ ফান্ড ১০টি উন্নত দেশের প্রায় ১১ হাজার চিকিৎসকের ওপর একটি জরিপ চালায়। এতে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসকদের ৪৩ শতাংশ বর্তমানে বার্নআউটে ভুগছেন—যা জরিপভুক্ত সব দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বেতন বেশি, তবু সুখ কম
একজন মার্কিন প্রাইমারি কেয়ার চিকিৎসক বছরে গড়ে প্রায় ২ লাখ ৪২ হাজার মার্কিন ডলার আয় করেন। অথচ তুলনামূলকভাবে ব্রিটেনের এনএইচএস চিকিৎসকেরা প্রায় অর্ধেক বেতন পেলেও তাঁদের মধ্যে বার্নআউটের হার ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ বিপুল আয়ও চিকিৎসকদের মানসিক শান্তি নিশ্চিত করতে পারছে না।
বোস্টনের ইন্টারনিস্ট ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ড. রেবতী রবি বলেন,
“বার্নআউট এখন আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি নীরব কিন্তু ভয়ংকর সত্য। এই ব্যবস্থার ভেতরেই মানসিক ভেঙে পড়ার সব উপাদান রয়েছে।”
সংকটের মূল কারণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের প্রধান কারণ অতিরিক্ত প্রশাসনিক চাপ ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা।
রোগীর চিকিৎসার চেয়ে চিকিৎসকদের এখন বেশি সময় ব্যয় করতে হয় ইনস্যুরেন্স কোম্পানির অনুমোদন, ফরম পূরণ এবং কাগজপত্র সামলাতে।
ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ড (EHR) ব্যবস্থাও নতুন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. টেইট শানাফেল্ট জানান, চিকিৎসকেরা প্রতিদিন গড়ে এক ঘণ্টা সময় ব্যয় করেন কেবল রোগীদের ডিজিটাল মেসেজের জবাব দিতে। কোভিড-পরবর্তী সময়ে এই চাপ আরও বেড়েছে।
ডালাসের চিকিৎসক স্কট ইয়েটস বলেন,
“আমরা মেডিকেল স্কুলে পড়েছি মানুষকে চিকিৎসা দিতে, ইনস্যুরেন্সের কাগজ সামলাতে নয়।”
ভুল চিকিৎসা ও আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি
গবেষণায় দেখা গেছে, বার্নআউটে ভোগা চিকিৎসকদের হাতে ভুল চিকিৎসা হওয়ার ঝুঁকি স্বাভাবিকের তুলনায় দ্বিগুণ। ফলে এটি কেবল চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; বরং জনস্বাস্থ্যের জন্যও একটি বড় হুমকি।
এ ছাড়া এই অবসাদের কারণে বহু মেধাবী চিকিৎসক পেশা ছাড়ছেন বা আগেভাগেই অবসর নিচ্ছেন। এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বছরে প্রায় ৪৬০ কোটি ডলারের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।
সমাধানের পথ কী
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু যোগব্যায়াম বা ‘মাইন্ডফুলনেস’ দিয়ে এই সংকট সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার।
অস্ট্রেলিয়ার উদাহরণ টেনে গবেষকেরা জানান, সেখানে প্রশাসনিক কাজের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়েছে, যা চিকিৎসকদের কাজের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে।
এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে নোট লেখা, কোডিং ও চার্ট তৈরির মতো রুটিন কাজ সহজ করা গেলে চিকিৎসকেরা রোগীদের জন্য বেশি সময় দিতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে চিকিৎসকদের এই মানসিক সংকট ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।