ক্রিকেট মাঠ থেকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের আতঙ্ক: ডেভিড ইমনের উত্থান, সন্ত্রাস সাম্রাজ্য ও গ্রেপ্তারের পূর্ণ কাহিনি
জেটিভি নিউজ বাংলা
তারিখ: ৩০ জুলাই ২০২৬ ইং,সময় দুপুর ১২:৪৩ মিনিট। মাত্র তিন বছর আগেও তিনি ছিলেন সম্ভাবনাময় এক ক্রিকেটার। জাতীয় ও বিদেশি ক্রিকেটারদের নেট অনুশীলনে বল করতেন, বাঁহাতি লেগ স্পিনার (চায়নাম্যান) হিসেবে পরিচিতি ছিল বেশ। কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানে সেই ক্রিকেটারই চট্টগ্রামের অপরাধ জগতের অন্যতম ভয়ংকর নাম হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তিনি মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন। ব্যবসায়ী, প্রবাসী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকদের বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে কোটি কোটি টাকা চাঁদা দাবি, একের পর এক হত্যাকাণ্ড, অস্ত্রবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডে আতঙ্কের প্রতীক হয়ে ওঠেন। পাশাপাশি বিদেশে পলাতক কুখ্যাত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করে অপরাধ জগতে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ডেভিড ইমনের বয়স আনুমানিক ২৫ বছর। ২০২২ সালের পর তিনি ধীরে ধীরে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন এবং পরবর্তীতে পুরোপুরি অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়েন। তার অনুসারী ও শুটারদের অধিকাংশের বয়সও ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে।যেভাবে অপরাধ জগতে উত্থান
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকায় জন্ম নেওয়া ইমন শৈশবে একজন প্রতিভাবান ক্রিকেটার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। রহমানিয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করার পর জীবিকার সন্ধানে ওমানে পাড়ি জমান। প্রায় এক বছর প্রবাস জীবন কাটিয়ে দেশে ফিরে আসেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি পুরোপুরি অপরাধ জগতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ওই সময় চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার আতুরার ডিপো এলাকায় আত্মগোপন করে বিভিন্ন অপরাধী চক্রের সংস্পর্শে আসেন। পরবর্তীতে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে দ্রুত আন্ডারওয়ার্ল্ডে প্রভাব বিস্তার শুরু করেন।বড় সাজ্জাদের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বিদেশে অবস্থানরত বড় সাজ্জাদের প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ শুরু করেন ডেভিড ইমন। পরবর্তীতে বড় সাজ্জাদের আরেক সহযোগী ছোট সাজ্জাদ ওরফে সাজ্জাদ হোসেন কারাগারে গেলে ইমন ও মোহাম্মদ রায়হান আলম মাঠপর্যায়ে পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনার দায়িত্ব নেন। চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, পতেঙ্গা, চান্দগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় এবং জেলার রাউজান, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি অঞ্চলে তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বিস্তৃত ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। অস্ত্র চালনায় দক্ষতা ও শক্তিশালী গ্যাং পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ডেভিড ইমন ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ শুটার। তার বিরুদ্ধে ১৫ থেকে ২০টি অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের তথ্য রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার অস্ত্র হাতে একাধিক ছবি এবং কলরেকর্ড ভাইরাল হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, তার নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৫০ জন শুটার ও সক্রিয় অপরাধীর একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ছিল। ভয়ভীতি প্রদর্শন, চাঁদাবাজি এবং সশস্ত্র হামলার মাধ্যমে তিনি অপরাধ সাম্রাজ্য বিস্তার করেন। একের পর এক হত্যা ও চাঞ্চল্যকর অপরাধ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ডেভিড ইমন অন্তত সাতটি হত্যা মামলাসহ ১৫টির বেশি মামলার আসামি হন। এর মধ্যে কয়েকটি আলোচিত ঘটনা হলো—ডিজিটাল ডট নেট অফিসে হামলা
গত ১৩ জুলাই চট্টগ্রামের চকবাজার এলাকার একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে আন্তর্জাতিক নম্বর থেকে ফোন করে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। চাঁদা না পেয়ে তার নির্দেশে ৩০ থেকে ৩৫ জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী প্রকাশ্য দিবালোকে প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। এ ঘটনার অডিও ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশব্যাপী ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।বাকলিয়া জোড়া খুন
২০২৫ সালের ৩০ মার্চ চট্টগ্রামের বাকলিয়া এলাকায় সংঘটিত আলোচিত জোড়া খুনের ঘটনায় ডেভিড ইমনকে অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত শুটার ও মোটরসাইকেল সরবরাহের দায়িত্বও তার ওপর ছিল।ঢাকাইয়া আকবর হত্যাকাণ্ড
২০২৫ সালের ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবরকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় ডেভিড ইমনকে প্রধান আসামি করা হয়। স্মার্ট গ্রুপের পরিচালকের বাসভবনে হামলা চলতি বছরের শুরুতে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ও স্মার্ট গ্রুপের পরিচালক মুজিবুর রহমানের বাসভবনে চাঁদা আদায়ের উদ্দেশ্যে একাধিক হামলার ঘটনা ঘটে। গত ২ জানুয়ারি এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি পুলিশি পাহারার মধ্যেও গুলিবর্ষণের ঘটনার পেছনে ইমনের নির্দেশ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।পুলিশের নথিতে অপরাধের বিস্তার
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট চট্টগ্রামে আনিস ও মোহাম্মদ হাসান হত্যা মামলার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো ডেভিড ইমনের নাম আলোচনায় আসে। এরপর ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া জোড়া খুন এবং একই বছরের ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে ঢাকাইয়া আকবর হত্যাকাণ্ডে তার নাম উঠে আসে। সর্বশেষ চন্দনপুরা এলাকায় ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে সশস্ত্র হামলা ও চাঁদাবাজির ঘটনায় তিনি আবারও ব্যাপক আলোচনায় আসেন।ক্রিকেটার থেকে সন্ত্রাসী
চট্টগ্রাম ব্রাদার্স একাডেমির সাবেক কোচ আমিনুল হক বলেন, “ইমন খুবই ভালো ক্রিকেট খেলতেন। বাঁহাতি লেগ স্পিনার (চায়নাম্যান) হিসেবে তার পরিচিতি ছিল। ব্যাটিংও ভালো করতেন। জাতীয় দলের খেলোয়াড় কিংবা বিদেশি দলের খেলোয়াড়েরা চট্টগ্রামে এলে নেট অনুশীলনে ইমন বল করতেন। তার ভালো সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই খেলা থেকে উধাও হয়ে যায়। ২০২০ সালের পর তাকে আর দেখা যায়নি।” স্থানীয় সূত্র জানায়, একজন সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার হিসেবে পরিচিত ইমন পরবর্তীতে অপরাধী চক্রের সংস্পর্শে এসে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হাঁটতে শুরু করেন।যেভাবে গ্রেপ্তার হলেন
গত ২৫ জুলাই চট্টগ্রামের অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়ক এলাকায় অভিযান চালিয়ে ডেভিড ইমনের দুই ঘনিষ্ঠ সহযোগী আসিফ ও আরিফকে বিদেশি পিস্তলসহ গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম ও যশোর জেলা পুলিশ যৌথ অভিযান শুরু করে। পরে ২৯ জুলাই ভোরে যশোর-নড়াইল মহাসড়কের ঝুমঝুমপুর চেকপোস্ট এলাকায় একটি কালো মাইক্রোবাসে করে ভারতে পালানোর সময় ডেভিড ইমন ও তার তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানায়, ছদ্মবেশ ধারণের উদ্দেশ্যে তিনি গোঁফ কেটে ফেলেন এবং ‘মিরাজ’ নামে পরিচয় ব্যবহার করছিলেন। বর্তমানে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ ও আইনি প্রক্রিয়ার জন্য চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়েছে।পুলিশের বক্তব্য
চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হাটহাজারী সার্কেল) কাজী মো. তারেক আজিজ বলেন, “জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সন্ত্রাসী ইমন বর্তমানে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের হেফাজতে রয়েছে। লোকজনকে ফোনে এমনভাবে হুমকি দিতেন যে, মানুষ খুব সহজেই ভয় পেয়ে যেত। অস্ত্র চালনায়ও তিনি অত্যন্ত দক্ষ। একাধিক হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অপরাধে তার সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” এক সময়ের সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার থেকে চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসীতে পরিণত হওয়া ডেভিড ইমনের এই উত্থান ও পতনের ঘটনা এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।জেটিভি নিউজ বাংলা
দেশ ও দশের কথা বলে....

নিজস্ব প্রতিবেদক 























