জেটিভি নিউজ বাংলা
তারিখ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ ইং,সময়: সকাল ০৭:২৩ মিনিট।গ্যাস সংকট কাটছে না, তৃতীয় এলএনজি টার্মিনাল চালুতে লাগতে পারে দুই বছর
এলএনজি কার্গো আসায় দেশে আপাতত গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। তবে জ্বালানি সংকট এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, তৃতীয় এলএনজি টার্মিনাল চালু না হওয়া পর্যন্ত দেশে গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে নেওয়া কঠিন। সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, নতুন একটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ ও চালু করতে অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে। ফলে ততদিন জ্বালানি খাতকে সীমিত সক্ষমতা নিয়েই চলতে হবে। স্থায়ী সমাধানের জন্য নতুন টার্মিনাল নির্মাণের পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।অগ্নিকাণ্ডের পর প্রকট হয় গ্যাস সংকট
গত ২১ জুলাই মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর দেশে জ্বালানি সংকট প্রকট আকার ধারণ করে। একদিকে গ্যাসের সংকট, অন্যদিকে গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও ঠিকমতো চলতে পারেনি। এতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে টার্মিনালটি মেরামত করে চালু করা হলেও এলএনজি কার্গো না থাকায় আবারও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এতে দেশের দৈনিক গ্যাস সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প এবং সার্বিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনায়। পরিস্থিতি তুলে ধরে সরকারের পক্ষ থেকে জনগণের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে বার্তা দেন। অগ্নিকাণ্ডের পর এক মাস পেরিয়ে গেলেও সংকট এখনও পুরোপুরি কাটেনি। এমনকি রোববার (২৩ আগস্ট) সন্ধ্যা ৬টায় পেট্রোবাংলার দেওয়া হিসাবে, দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে ২ হাজার ৩৮২ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে এসেছে ১ হাজার ৬২৪ মিলিয়ন ঘনফুট এবং এলএনজি থেকে সরবরাহ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫৮ মিলিয়ন ঘনফুট।দৈনিক ঘাটতি ১ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট
পেট্রোবাংলার হিসাবে, বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়েও সর্বোচ্চ ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। এর মধ্যে এলএনজি থেকে প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট এবং দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ আসে। অর্থাৎ দেশে দৈনিক গ্যাসের ঘাটতি প্রায় ১ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই পরিস্থিতিতে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন আরও কমে গেলে সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি সরকার মহেশখালীতে একাধিক টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনাও এখনই বাস্তবায়ন করতে পারছে না। মহেশখালী থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিদ্যমান পাইপলাইন দিয়ে আরও সর্বোচ্চ ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আনা সম্ভব। ফলে মহেশখালীতে তৃতীয় টার্মিনালের পর চতুর্থ টার্মিনাল নির্মাণ করতে হলে একই সঙ্গে নতুন পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হবে। আর সেটি হবে ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ।সরকারের বক্তব্য
গত ১৬ আগস্ট এক অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দেশের চলমান বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনা নেই। ছয় মাস কিংবা এক বছরের মধ্যে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে। তিনি বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। ছয় মাস কিংবা এক বছরে এর সমাধান হবে না। ন্যূনতম দুই বছর লাগবে। একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল তৈরি করতেই প্রায় দেড় থেকে দুই বছর সময় লাগতে পারে। ফলে এর আগে গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধান করা কঠিন। এর আগে গত ১৩ আগস্ট এক অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ২০২৯ সালের মধ্যে দেশে আরও নতুন এফএসআরইউ স্থাপন এবং অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান বাড়াতে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। তিনি বলেন, বর্তমান সংকট সাময়িক এবং সরকার মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধকালীন তৎপরতার মতো পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মন্ত্রী আরও বলেন, গত ১৭ বছর গ্যাস অনুসন্ধান না করে শুধু আমদানির ওপর নির্ভর করে দেশকে একটি জায়গায় নিয়ে আসা হয়েছে। আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও যথাযথভাবে তৈরি করা হয়নি। দুটি এফএসআরইউর জায়গায় চারটি এফএসআরইউ স্থাপন করা হলে বর্তমান সমস্যার মুখোমুখি হতে হতো না। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র থেকে একটি বড় দল বিনিয়োগের জন্য আসছে এবং তারা এফএসআরইউতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। তাদের আগ্রহের বিষয়ে দ্রুত চিঠি দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।নতুন টার্মিনাল থেকে গ্যাস পেতে লাগতে পারে দুই বছর
জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সরকার মহেশখালীতে নতুন একটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। চীনা কোম্পানি সিএনইসিকে কাজ দেওয়ার বিষয়টি অনুমোদন হলেও এখনও চুক্তি সই হয়নি। চীনা কোম্পানিটি চুক্তি সইয়ের পর ২২ মাসের মধ্যে টার্মিনাল নির্মাণ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ফলে দ্রুত চুক্তি হলেও নতুন টার্মিনাল থেকে গ্যাস পেতে প্রায় দুই বছর বা তারও বেশি সময় প্রয়োজন হতে পারে। তবে এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে গেলে সংকট আরও বাড়তে পারে।দেশীয় গ্যাসেও তাৎক্ষণিক সমাধান নেই
নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন বাড়িয়েও তাৎক্ষণিকভাবে বর্তমান সংকট সমাধানের সুযোগ কম। স্থলভাগে বড় কোনো গ্যাসক্ষেত্র পাওয়ার সম্ভাবনাও কম বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এমনকি যেসব গ্যাসক্ষেত্র থেকে বর্তমানে গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে, প্রায় প্রতিদিনই সেসব ক্ষেত্রের উৎপাদন কমছে। দেশের সবচেয়ে বেশি গ্যাস উৎপাদনকারী বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন বর্তমানে গত তিন বছরের তুলনায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে গেছে। সূত্র জানায়, দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোর দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ২ হাজার ৭৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে ২০ ও ২১ আগস্টের হিসাবে এসব গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উৎপাদন হয়েছে ১ হাজার ৬২৯ দশমিক ৮ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ মোট উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৫৯ শতাংশ গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) গ্যাসক্ষেত্রগুলোর দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা ৮৫১ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ৪৭৪ দশমিক ১ মিলিয়ন ঘনফুট। সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের (এসজিএফএল) সক্ষমতা ১৪৩ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও উৎপাদন হয়েছে ১৩৮ দশমিক ৭ মিলিয়ন ঘনফুট। আর বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) গ্যাসক্ষেত্রগুলোর ১৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১১০ দশমিক ৩ মিলিয়ন ঘনফুট। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর পরিচালিত জালালাবাদ, মৌলভীবাজার, বিবিয়ানা ও বাঙ্গুরা গ্যাসক্ষেত্রগুলোর সম্মিলিত দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার ৬১৫ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ৯০৬ দশমিক ৭ মিলিয়ন ঘনফুট।শুধু টার্মিনাল নয়, দরকার গ্যাস অনুসন্ধানও
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করলেই গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। এলএনজি কেনার জন্য পর্যাপ্ত অর্থের সংস্থানও থাকতে হবে। আমদানিনির্ভরতা যত বাড়বে, জ্বালানি আমদানিতে ব্যয়ও তত বাড়বে। তাই এর পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার কথাও ভাবতে হবে। সরকার অবশ্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তারে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এই খাতের বিস্তারও সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল। এর পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে হবে। বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ডিপ ড্রিলিং, নতুন গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান এবং সমুদ্র এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে সাগরে গ্যাস অনুসন্ধান শুরু করা হলেও সেখান থেকে পাওয়া গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে ১০ বছরের আগে সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম মনে করেন, গ্যাস সংকট কাটাতে নেওয়া বড় উদ্যোগগুলোর সুফল পেতে দুই থেকে পাঁচ, এমনকি সাত বছরও সময় লাগতে পারে। তবে প্রতি বছর পাঁচ থেকে ছয়টি করে গ্যাসকূপ অনুসন্ধান করা গেলে এবং সেখান থেকে গ্যাস পাওয়া গেলে পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের গ্যাসের ঘাটতি অনেকটাই দূর করা সম্ভব। জেটিভি নিউজ বাংলাদেশ ও দশের কথা বলে.....

ডেস্ক রিপোর্ট 





















