জুলাই আন্দোলনের দুই বছর: কতটা পূরণ হলো প্রত্যাশা, কতটা রয়ে গেল অপূর্ণ?
জেটিভি নিউজ বাংলা | বিশেষ প্রতিবেদন তারিখ: ০৫ আগস্ট ২০২৬ ইং| সময়: সকাল ১১:২১ পুর্বাহ্ন ডেস্ক রিপোর্ট: ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্টের এক রায়ে ২০১৮ সালের আন্দোলনের মাধ্যমে বাতিল হওয়া সরকারি চাকরির কোটাব্যবস্থা পুনর্বহাল হয়। রায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিদের জন্য সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত বহাল রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। এই রায়ের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে দেশজুড়ে নতুন করে আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ ছিল, স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পর এমন কোটা ব্যবস্থা বৈষম্যমূলক এবং এটি সরকারি চাকরিতে মেধাভিত্তিক নিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করবে। তৎকালীন সরকার বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ওপর ছেড়ে দিলেও আন্দোলনকারীরা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে কোটা সংস্কারের দাবি জানায়। প্রাথমিকভাবে আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল কোটাপ্রথার সংস্কার ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করা। তবে সময়ের পরিক্রমায় সেই আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। এতে প্রাণহানিসহ বিভিন্ন সহিংস ঘটনার পাশাপাশি দল-মত নির্বিশেষে দেশের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ দেখা যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু কোটা নয়; গুম, খুন, ভোটাধিকার সংকট ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত হওয়ার অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ জমা হচ্ছিল। সেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, যার মধ্য দিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। আজ ৫ আগস্ট সেই আন্দোলনের দুই বছর পূর্ণ হলো। এর মধ্যে ১৮ মাস দায়িত্ব পালন করেছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এরপর তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার পথে। ফলে জুলাই আন্দোলনের প্রত্যাশা ও বাস্তব প্রাপ্তির হিসাব এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।সফলতা ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল সরকারের পতন। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে মেধার ভিত্তিতে আসন বণ্টন, মতপ্রকাশের তুলনামূলক স্বাধীনতা, গুমের সংস্কৃতির অবসান এবং ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার মতো ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। তবে তিনি বলেন, সরকারি চাকরিতে মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করা যায়নি। বিসিএসসহ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কাঙ্ক্ষিত সংস্কার হয়নি, পিএসসি এখনও পুরোনো নিয়মেই চলছে। চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। নতুন রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়েও হতাশা রয়েছে। সংসদে এখনও প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কাদা ছোড়াছুড়ি চলছে এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়িত হয়নি।ক্ষমতার পরিবর্তনে আন্দোলনের ভূমিকা
২০০৮ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলেও ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনকে বিএনপি, জামায়াত ও তাদের মিত্ররা বিতর্কিত বলে দাবি করে। দীর্ঘদিন আন্দোলন করেও সরকার পরিবর্তন সম্ভব হয়নি। বরং আন্দোলনের সময় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ শীর্ষ নেতাদের কারাবরণ করতে হয়েছে এবং বহু নেতাকর্মী আত্মগোপনে ছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে ১ জুলাই শুরু হওয়া কোটাবিরোধী আন্দোলন মাত্র ৩৬ দিনের মধ্যে সরকার পতনের আন্দোলনে পরিণত হয়। ৫ আগস্ট সেই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটে। তবে এতে কয়েকশ মানুষের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজের ভাষ্য, জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদের পতন হলেও ক্ষমতা পরিবর্তনের পরও দুর্নীতি, দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি এবং মব সংস্কৃতির মতো বিষয়গুলো উদ্বেগজনকভাবে রয়ে গেছে।যেসব খাতে ইতিবাচক পরিবর্তনের দাবি
বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই আন্দোলনের পর অবাধ নির্বাচন, রাজনৈতিক সংলাপ, সরকার ও বিরোধী দলের আলোচনার পরিবেশ, জুলাই সনদ প্রণয়ন এবং গুম-খুনের সংস্কৃতি হ্রাসের মতো কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে। রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল কাইয়ূম বলেন, দীর্ঘদিনের একটি ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে নতুন ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে তরুণদের মধ্যে দেশ ও সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে।হতাশার জায়গাগুলো কোথায়
খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির আহমদ আলী কাসেমীর মতে, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের অঙ্গীকারনামার অনেক বিষয় বাস্তবায়ন হয়নি। প্রধান বিচারপতি নিয়োগ, প্রশাসক নিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় নিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আগের ধারা অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, রাষ্ট্র কাঠামোয় বড় পরিবর্তন এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের যে প্রত্যাশা ছিল, তা এখনও পূরণ হয়নি। বিরোধী দলের কর্মসূচিতে হামলার ঘটনাও উদ্বেগের বিষয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।তবুও আশাবাদী বিএনপি ও জামায়াত
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের পতন হলেও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার, দলীয়করণ বন্ধ এবং দুর্নীতি-চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। তবে তিনি ভবিষ্যতে জনগণের প্রত্যাশা পূরণের আশা প্রকাশ করেন। অন্যদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী সেলিমা রহমান বলেন, জুলাইয়ের পর মানুষ এখন স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারছে, গুম-খুনের সংস্কৃতি নেই এবং সংসদ প্রাণবন্ত হয়েছে। পাশাপাশি সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভাতা চালু করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, মাত্র ছয় মাসেই সরকার অনেক কাজ বাস্তবায়ন করেছে। বাকি প্রতিশ্রুতিগুলোও পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।জেটিভি নিউজ বাংলা
দেশ ও দশের কথা বলে....

ডেস্ক রিপোর্ট 












