জেটিভি নিউজ বাংলা
তারিখ : ০৩ আগস্ট ২০২৬ ইং,সময় :রাত ০৮:৩৮ মিনিট।জুলাইয়ে পোশাক রপ্তানি কমেছে ১.৯২ শতাংশ
উচ্চ ভিত্তির প্রভাব, গ্যাস সংকট ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার চাপ; তবুও শিল্পের সক্ষমতা নিয়ে আশাবাদী বিজিএমইএ
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত নতুন অর্থবছরের শুরুতেই সামান্য ধাক্কার মুখে পড়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের ৩ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১ দশমিক ৯২ শতাংশ কম। তবে এই সামান্য পতনকে উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছে না তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। সংগঠনটির মতে, গত বছরের জুলাই ছিল বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির ইতিহাসের অন্যতম সেরা মাস। সে সময় এক মাসেই ৩ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি এবং ২৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল। ফলে সেই অস্বাভাবিক উচ্চ ভিত্তির সঙ্গে তুলনা করলে চলতি বছরের সামান্য পতন স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত। বিজিএমইএর ভাষ্য, বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও জুলাইয়ে প্রায় ৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি দেশের পোশাক শিল্পের সক্ষমতা, স্থিতিস্থাপকতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও একবার প্রমাণ করেছে।এক নজরে জুলাইয়ের চিত্র (ইনফো-বক্স)
► মোট পোশাক রপ্তানি: ৩.৮৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ► আগের বছরের জুলাই: ৩.৯৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ► সার্বিক পরিবর্তন: ১.৯২% হ্রাস ► ওভেন পোশাক রপ্তানি: ৩.১৬% কমেছে ► নিট পোশাক রপ্তানি: ০.৯০% কমেছে ► ইউডি (UD): প্রায় ২.৮% কমেছেউচ্চ ভিত্তির প্রভাবেই প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে
অর্থনীতিতে 'বেস ইফেক্ট' বা উচ্চ ভিত্তির প্রভাব একটি স্বীকৃত ধারণা। কোনো বছরে অস্বাভাবিক উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলে পরবর্তী বছরে সেই প্রবৃদ্ধির হার ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। বিজিএমইএ বলছে, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে দেশের পোশাক রপ্তানি ইতিহাসের অন্যতম সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছিল। তাই সেই রেকর্ডের সঙ্গে তুলনা করলে চলতি বছরের ফলাফল কিছুটা কম দেখালেও বাস্তবে এটি শিল্পের দুর্বলতার প্রতিফলন নয়। বরং বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্যেও উচ্চ রপ্তানি ধরে রাখতে পারা শিল্পের ইতিবাচক সক্ষমতারই পরিচয়।গ্যাস সংকট উৎপাদনে বড় বাধা
শিল্পমালিকদের মতে, বর্তমানে দেশের পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় সমস্যা গ্যাসের তীব্র সংকট। শিল্পাঞ্চলের অনেক কারখানায় দিনের দীর্ঘ সময় গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে অনেক কারখানাকে উৎপাদনের সময়সূচি পরিবর্তন করতে হচ্ছে। কোথাও শিফট কমাতে হচ্ছে, আবার কোথাও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার ওঠানামাও বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।ওভেন পোশাকে বেশি পতন, স্থিতিশীল নিটওয়্যার
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে ওভেন পোশাক রপ্তানিতে তুলনামূলক বেশি ধাক্কা লেগেছে। এ খাতের রপ্তানি কমেছে ৩ দশমিক ১৬ শতাংশ। অন্যদিকে নিট পোশাক রপ্তানি কমেছে মাত্র ০ দশমিক ৯০ শতাংশ। আন্তর্জাতিক বাজারে টি-শার্ট, সোয়েটার, নিট টপসসহ বিভিন্ন নিটজাত পণ্যের চাহিদা তুলনামূলক ভালো থাকায় এই খাতের পতন সীমিত ছিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।ইউডি তথ্যেও মিলছে একই প্রবণতা
রপ্তানির পাশাপাশি বিজিএমইএর ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন (ইউডি) তথ্যেও একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই মাসে সম্পাদিত ইউডির পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। ইউডি মূলত রপ্তানির প্রস্তুতি এবং কাঁচামাল ব্যবহারের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হওয়ায় এটি শিল্পের বর্তমান কার্যক্রমের গতিপ্রকৃতি বোঝার একটি নির্ভরযোগ্য নির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হয়।কাঠামোগত সংস্কার ও নীতিগত সহায়তার ওপর জোর
বিজিএমইএর মতে, শুধু বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতির উন্নতি হলেই চলবে না। দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, বন্দর ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং সময়োপযোগী নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। সংগঠনটি বলছে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হলে এবং প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা অব্যাহত থাকলে আগামী মাসগুলোতে রপ্তানি আবারও ইতিবাচক ধারায় ফিরতে পারে।আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আরও কঠিন
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের পোশাক শিল্প এখন শুধু অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকট নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও কঠিন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি। ভিয়েতনাম, ভারত, কম্বোডিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলো উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত করার মাধ্যমে বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো এখন শুধু কম দামের পণ্য নয়; দ্রুত সরবরাহ, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, টেকসই কারখানা এবং নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন সক্ষমতাকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি সংকটের দ্রুত সমাধান এখন শুধু উৎপাদন নয়, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকারও পূর্বশর্ত।আশাবাদী বিজিএমইএ
সব ধরনের প্রতিকূলতার মধ্যেও বিজিএমইএ মনে করছে, নতুন অর্থবছরের শুরু হতাশাজনক নয়। বরং ইতিহাসের অন্যতম উচ্চ রপ্তানি ভিত্তির পরও ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি দেশের পোশাক শিল্পের স্থিতিস্থাপকতার প্রমাণ। সংগঠনটি জানিয়েছে, শিল্পের ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রাখা, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনতে সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে তারা। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়া এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা অব্যাহত থাকলে আগামী মাসগুলোতে রপ্তানি আবারও ঊর্ধ্বমুখী হবে বলেও আশাবাদ প্রকাশ করেছে বিজিএমইএ।জেটিভি নিউজ বাংলা পর্যবেক্ষণ
বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতা, জ্বালানি সংকট এবং সরবরাহ ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প এখনও শক্ত অবস্থানে রয়েছে। তবে এই অবস্থান ধরে রাখতে জ্বালানি নিরাপত্তা, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক অবকাঠামো এবং দ্রুত নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব চ্যালেঞ্জ দ্রুত মোকাবিলা করা গেলে আগামী মাসগুলোতে দেশের পোশাক রপ্তানি আবারও প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে সক্ষম হবে।জেটিভি নিউজ বাংলা
দেশ ও দশের কথা বলে....

স্টাফ রিপোর্টার 











