ঢাকা , বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
রাষ্ট্র সংস্কারের সম্ভাবনা রাজনৈতিক-আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধের হাতে জিম্মি’— ড. ইফতেখারুজ্জামান জুলাই আন্দোলনের দুই বছর: কতটা পূরণ হলো প্রত্যাশা, কতটা রয়ে গেল অপূর্ণ? বিমানবন্দর নিরাপত্তায় ১৭ সদস্যের জাতীয় কমিটি পুনর্গঠন, আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিতের উদ্যোগ দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে দুই তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ: ৬ যুবকের আমৃত্যু কারাদণ্ড, প্রত্যেককে ১ লাখ টাকা জরিমানা রাজধানীর আরেক ‘মোহাম্মদপুর’ হয়ে উঠছে মিরপুর? টার্গেট কিলিং, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংয়ে আতঙ্কে বাসিন্দারা জুলাইয়ে পোশাক রপ্তানি কমেছে ১.৯২ শতাংশ উচ্চ ভিত্তির প্রভাব, গ্যাস সংকট ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার চাপ; তবুও শিল্পের সক্ষমতা নিয়ে আশাবাদী বিজিএমইএ গণমাধ্যমে সরকারের হস্তক্ষেপ নেই, সাংবাদিকদের বিভাজন না বাড়ানোর আহ্বান মির্জা ফখরুলের বেনজীরের জামিন বাতিলে দুবাইয়ে ল’ ফার্ম নিয়োগ করেছে সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী  আগস্টে ১২ কেজি এলপিজির দাম বাড়ল ৭০ টাকা, নতুন মূল্য ১,৫৯৮ টাকা সরকার-ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে ৪-৫ বছরের মধ্যে অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

রাষ্ট্র সংস্কারের সম্ভাবনা রাজনৈতিক-আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধের হাতে জিম্মি’— ড. ইফতেখারুজ্জামান

‘রাষ্ট্র সংস্কারের সম্ভাবনা রাজনৈতিক-আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধের হাতে জিম্মি’— ড. ইফতেখারুজ্জামান

তারিখ: ৫ আগস্ট ২০২৬ ইং,সময় ঃ সন্ধ্যা ০৬:২২ মিনিট। জেটিভি নিউজ বাংলা ডেস্ক: ছবি সংগৃহীত চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান রাষ্ট্র সংস্কারের এক অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি করেছিল। কিন্তু দুই বছর পর সেই সম্ভাবনা রাজনৈতিক আপস, আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধ এবং পুরোনো ক্ষমতার অপব্যবহারের সংস্কৃতির চাপে অনেকটাই থমকে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের ভিত্তি তৈরি করলেও তা ছিল নড়বড়ে। অন্যদিকে নির্বাচিত সরকারও দলীয়করণ, স্বার্থের সংঘাত এবং ‘এবার আমাদের পালা’ মানসিকতা থেকে বের হতে পারেনি বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। এক গণমাধ্যমকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠাই ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা। অথচ এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে গঠিত সংস্কার কমিশনগুলোর বহু যুগান্তকারী সুপারিশ উপেক্ষিত হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)সহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক করার উদ্যোগ রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধের মুখে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা বাড়ায়—এমন আইন দ্রুত অনুমোদন পেলেও সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনার সহায়ক বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল কিংবা স্থগিত করা হয়েছে। ফলে তাঁর ভাষায়, রাষ্ট্র সংস্কারের অভীষ্ট এখন “রাজনৈতিক-আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধের হাতে জিম্মি”। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর তিনটি মৌলিক দায়িত্ব ছিল—মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার নিশ্চিত করা, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন এবং রাষ্ট্র সংস্কারের ভিত্তি তৈরি করা। তাঁর মতে, আন্দোলনের মূল চেতনা ছিল জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক একটি সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। তিনি জানান, এ লক্ষ্যেই একাধিক সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছিল এবং কমিশনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী সুপারিশ দিয়েছিল। এসব সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই রাষ্ট্র সংস্কারের শক্ত ভিত্তি তৈরি হতে পারত। কিন্তু বাস্তবে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি হলেও অনেক ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। ফলে সংস্কারের ভিত্তি দুর্বল থেকে গেছে। জুলাই সনদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষর থাকলেও ‘নোট অব ডিসেন্ট’-এর কারণে মৌলিক অনেক বিষয়ে বড় দলগুলোর আপত্তি নথিভুক্ত রয়েছে। ফলে একদিকে সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করা হলেও অন্যদিকে আপত্তিকৃত বিষয়গুলো নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান অনুযায়ী বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে জুলাইয়ের মূল চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাষ্ট্র সংস্কারের সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের পর ক্ষমতায় আসা সরকারও নিজেদের নির্বাচনী অঙ্গীকার, ৩১ দফা রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কর্মসূচি এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা নিতে পারেনি। ফলে রাষ্ট্র সংস্কারের সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ না হলেও বড় ধরনের অন্তরায় সৃষ্টি হয়েছে। ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, রাষ্ট্র সংস্কারের সবচেয়ে বড় বাধা বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র এবং রাজনৈতিক দলগুলো। তাঁর ভাষায়, আমলাতন্ত্র জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অনুকূল কোনো মৌলিক সংস্কার কখনোই চায়নি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও ক্ষমতায় গিয়ে পুরোনো সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অর্জন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কিছু ভিত্তি তৈরি হলেও তা ছিল অত্যন্ত নড়বড়ে। সংস্কার কমিশনের আশু বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশগুলোর বড় অংশই বাস্তবায়িত হয়নি। বরং সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টা ও আমলাতন্ত্র নিজেদের সুবিধাজনক বিষয়গুলো বেছে নিয়েছে। সরকার পরিচালনায় স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ, জবাবদিহি এবং স্বার্থের সংঘাত এড়ানোর ক্ষেত্রেও বড় ঘাটতি ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এমনকি এ জন্য একটি ফরম্যাটও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সরকার বিদায়ের আগ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। শেষ মুহূর্তে সীমিত কিছু তথ্য প্রকাশ করা হলেও তা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোর ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা ও জনসম্পৃক্ততা ছিল না। একই সময়ে সরকারের কিছু উপদেষ্টা ও তাঁদের কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও কার্যকর তদন্ত হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন। দুদক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুদক সংস্কার কমিশনের প্রায় সব সুপারিশেই রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য ছিল। এমনকি তৎকালীন দুদক চেয়ারম্যানও সেগুলোর সঙ্গে একমত ছিলেন। তারপরও আশু করণীয় সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা হয়নি। তাঁর অভিযোগ, আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধের কারণে সরকারের নিজস্ব সংস্কার কমিশনের সুপারিশও বাস্তবায়ন হয়নি। দুদক আইন সংশোধনের সময়ও কমিশনকে সম্পৃক্ত করা হয়নি এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলো বাদ দেওয়া হয়। তিনি বলেন, তৎকালীন দুদক কমিশনের পদত্যাগের পাঁচ মাস পরও কমিশন শূন্য রয়েছে। নতুন কমিশন গঠনের জন্য সার্চ কমিটি করা হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান অগ্রগতি খুবই সীমিত। বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাস মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন, সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে কিছু ব্যতিক্রমী উদ্যোগ দেখা গেলেও প্রশাসন পরিচালনায় সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন নেই। বরং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ ব্যাংক, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন নিয়োগে দলীয়করণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাঁর মতে, ‘এখন আমাদের পালা’—এই মানসিকতাই আবারও প্রাধান্য পাচ্ছে। রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য জরুরি করণীয় হিসেবে তিনি বিচার বিভাগ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও তথ্য কমিশনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি প্রশাসনিক সংস্কার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংস্কার ছাড়া টেকসই পরিবর্তন সম্ভব নয় বলেও মত দেন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নতুন বেতন কাঠামো দেওয়া প্রয়োজন, তবে তা সম্পদ বিবরণী প্রকাশের শর্তসাপেক্ষ হওয়া উচিত। তাঁর প্রস্তাব, যেসব কর্মকর্তা তাঁদের সম্পদের হিসাব জনসম্মুখে প্রকাশ করবেন, কেবল তাঁরাই নতুন পে-স্কেলের সুবিধা পাবেন। গুম প্রতিরোধ আইন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর মতে, খসড়া আইনটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে অভিযুক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কার্যত সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে। তদন্ত ও জবাবদিহির দায়িত্বও এমন প্রতিষ্ঠানের হাতে রাখা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধেই অতীতে অভিযোগ ছিল। এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। রাষ্ট্রপতির সম্পদ বিবরণী প্রসঙ্গে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগেই সম্পদের হিসাব প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা উচিত। যদিও বর্তমান আইনে সে বাধ্যবাধকতা নেই, তবুও আইনি সংস্কারের মাধ্যমে এটি নিশ্চিত করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকালের বাইরে সংঘটিত দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন বা সম্পদ পাচারের অভিযোগের বিচার অবশ্যই হওয়া উচিত। সবশেষে তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রকৃত রাষ্ট্র সংস্কার তখনই সম্ভব হবে, যখন রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় আন্তরিক হবে। অন্যথায় রাষ্ট্র সংস্কারের স্বপ্ন রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক চক্রের হাতেই জিম্মি হয়ে থাকবে।     জেটিভি নিউজ বাংলা

দেশ ও দশের কথা বলে....

ট্যাগস

জনপ্রিয় সংবাদ

রাষ্ট্র সংস্কারের সম্ভাবনা রাজনৈতিক-আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধের হাতে জিম্মি’— ড. ইফতেখারুজ্জামান

রাষ্ট্র সংস্কারের সম্ভাবনা রাজনৈতিক-আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধের হাতে জিম্মি’— ড. ইফতেখারুজ্জামান

আপডেট সময় ৩ মিনিট আগে

‘রাষ্ট্র সংস্কারের সম্ভাবনা রাজনৈতিক-আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধের হাতে জিম্মি’— ড. ইফতেখারুজ্জামান

তারিখ: ৫ আগস্ট ২০২৬ ইং,সময় ঃ সন্ধ্যা ০৬:২২ মিনিট। জেটিভি নিউজ বাংলা ডেস্ক: ছবি সংগৃহীত চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান রাষ্ট্র সংস্কারের এক অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি করেছিল। কিন্তু দুই বছর পর সেই সম্ভাবনা রাজনৈতিক আপস, আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধ এবং পুরোনো ক্ষমতার অপব্যবহারের সংস্কৃতির চাপে অনেকটাই থমকে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের ভিত্তি তৈরি করলেও তা ছিল নড়বড়ে। অন্যদিকে নির্বাচিত সরকারও দলীয়করণ, স্বার্থের সংঘাত এবং ‘এবার আমাদের পালা’ মানসিকতা থেকে বের হতে পারেনি বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। এক গণমাধ্যমকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠাই ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা। অথচ এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে গঠিত সংস্কার কমিশনগুলোর বহু যুগান্তকারী সুপারিশ উপেক্ষিত হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)সহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক করার উদ্যোগ রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধের মুখে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা বাড়ায়—এমন আইন দ্রুত অনুমোদন পেলেও সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনার সহায়ক বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল কিংবা স্থগিত করা হয়েছে। ফলে তাঁর ভাষায়, রাষ্ট্র সংস্কারের অভীষ্ট এখন “রাজনৈতিক-আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধের হাতে জিম্মি”। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর তিনটি মৌলিক দায়িত্ব ছিল—মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার নিশ্চিত করা, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন এবং রাষ্ট্র সংস্কারের ভিত্তি তৈরি করা। তাঁর মতে, আন্দোলনের মূল চেতনা ছিল জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক একটি সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। তিনি জানান, এ লক্ষ্যেই একাধিক সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছিল এবং কমিশনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী সুপারিশ দিয়েছিল। এসব সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই রাষ্ট্র সংস্কারের শক্ত ভিত্তি তৈরি হতে পারত। কিন্তু বাস্তবে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি হলেও অনেক ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। ফলে সংস্কারের ভিত্তি দুর্বল থেকে গেছে। জুলাই সনদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষর থাকলেও ‘নোট অব ডিসেন্ট’-এর কারণে মৌলিক অনেক বিষয়ে বড় দলগুলোর আপত্তি নথিভুক্ত রয়েছে। ফলে একদিকে সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করা হলেও অন্যদিকে আপত্তিকৃত বিষয়গুলো নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান অনুযায়ী বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে জুলাইয়ের মূল চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাষ্ট্র সংস্কারের সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের পর ক্ষমতায় আসা সরকারও নিজেদের নির্বাচনী অঙ্গীকার, ৩১ দফা রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কর্মসূচি এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা নিতে পারেনি। ফলে রাষ্ট্র সংস্কারের সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ না হলেও বড় ধরনের অন্তরায় সৃষ্টি হয়েছে। ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, রাষ্ট্র সংস্কারের সবচেয়ে বড় বাধা বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র এবং রাজনৈতিক দলগুলো। তাঁর ভাষায়, আমলাতন্ত্র জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অনুকূল কোনো মৌলিক সংস্কার কখনোই চায়নি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও ক্ষমতায় গিয়ে পুরোনো সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অর্জন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কিছু ভিত্তি তৈরি হলেও তা ছিল অত্যন্ত নড়বড়ে। সংস্কার কমিশনের আশু বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশগুলোর বড় অংশই বাস্তবায়িত হয়নি। বরং সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টা ও আমলাতন্ত্র নিজেদের সুবিধাজনক বিষয়গুলো বেছে নিয়েছে। সরকার পরিচালনায় স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ, জবাবদিহি এবং স্বার্থের সংঘাত এড়ানোর ক্ষেত্রেও বড় ঘাটতি ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এমনকি এ জন্য একটি ফরম্যাটও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সরকার বিদায়ের আগ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। শেষ মুহূর্তে সীমিত কিছু তথ্য প্রকাশ করা হলেও তা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোর ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা ও জনসম্পৃক্ততা ছিল না। একই সময়ে সরকারের কিছু উপদেষ্টা ও তাঁদের কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও কার্যকর তদন্ত হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন। দুদক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুদক সংস্কার কমিশনের প্রায় সব সুপারিশেই রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য ছিল। এমনকি তৎকালীন দুদক চেয়ারম্যানও সেগুলোর সঙ্গে একমত ছিলেন। তারপরও আশু করণীয় সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা হয়নি। তাঁর অভিযোগ, আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধের কারণে সরকারের নিজস্ব সংস্কার কমিশনের সুপারিশও বাস্তবায়ন হয়নি। দুদক আইন সংশোধনের সময়ও কমিশনকে সম্পৃক্ত করা হয়নি এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলো বাদ দেওয়া হয়। তিনি বলেন, তৎকালীন দুদক কমিশনের পদত্যাগের পাঁচ মাস পরও কমিশন শূন্য রয়েছে। নতুন কমিশন গঠনের জন্য সার্চ কমিটি করা হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান অগ্রগতি খুবই সীমিত। বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাস মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন, সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে কিছু ব্যতিক্রমী উদ্যোগ দেখা গেলেও প্রশাসন পরিচালনায় সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন নেই। বরং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ ব্যাংক, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন নিয়োগে দলীয়করণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাঁর মতে, ‘এখন আমাদের পালা’—এই মানসিকতাই আবারও প্রাধান্য পাচ্ছে। রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য জরুরি করণীয় হিসেবে তিনি বিচার বিভাগ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও তথ্য কমিশনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি প্রশাসনিক সংস্কার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংস্কার ছাড়া টেকসই পরিবর্তন সম্ভব নয় বলেও মত দেন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নতুন বেতন কাঠামো দেওয়া প্রয়োজন, তবে তা সম্পদ বিবরণী প্রকাশের শর্তসাপেক্ষ হওয়া উচিত। তাঁর প্রস্তাব, যেসব কর্মকর্তা তাঁদের সম্পদের হিসাব জনসম্মুখে প্রকাশ করবেন, কেবল তাঁরাই নতুন পে-স্কেলের সুবিধা পাবেন। গুম প্রতিরোধ আইন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর মতে, খসড়া আইনটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে অভিযুক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কার্যত সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে। তদন্ত ও জবাবদিহির দায়িত্বও এমন প্রতিষ্ঠানের হাতে রাখা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধেই অতীতে অভিযোগ ছিল। এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। রাষ্ট্রপতির সম্পদ বিবরণী প্রসঙ্গে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগেই সম্পদের হিসাব প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা উচিত। যদিও বর্তমান আইনে সে বাধ্যবাধকতা নেই, তবুও আইনি সংস্কারের মাধ্যমে এটি নিশ্চিত করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকালের বাইরে সংঘটিত দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন বা সম্পদ পাচারের অভিযোগের বিচার অবশ্যই হওয়া উচিত। সবশেষে তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রকৃত রাষ্ট্র সংস্কার তখনই সম্ভব হবে, যখন রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় আন্তরিক হবে। অন্যথায় রাষ্ট্র সংস্কারের স্বপ্ন রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক চক্রের হাতেই জিম্মি হয়ে থাকবে।     জেটিভি নিউজ বাংলা

দেশ ও দশের কথা বলে....