ঢাকা , শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
তীব্র গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে থমকে গেছে শিল্পের চাকা, বন্ধ শত শত কারখানা পিএসআর ও টিআইএন সনদ যাচাইয়ে এনবিআরের নতুন নির্দেশনা হবিগঞ্জে ভয়াবহ গ্যাস সংকট, বন্ধ ১৭১ শিল্পকারখানা | কর্মহীন লক্ষাধিক শ্রমিক মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ঘোষণার পর মন্ত্রণালয়ে জরুরি রদবদল ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: ইসিতে জমা পড়েছে তিন মনোনয়নপত্র রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির চূড়ান্ত মনোনয়ন পেলেন মির্জা ফখরুল রাজশাহীতে ভয়াবহ লোডশেডিং: ২৪ ঘণ্টায় ৮ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ নেই, কৃষি-ব্যবসা-জনজীবনে চরম ভোগান্তি ৬০ দিনের সময়সীমার আগেই যুদ্ধবিরতি বাড়াতে সম্মত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান তীব্র গরমে ১৭-১৮ ঘণ্টা লোডশেডিং, নিরাপত্তা চেয়ে প্রশাসনকে বিদ্যুৎ সংস্থার চিঠি সংসার ভাঙার আগে মুখরোচক পরামর্শ, ডিভোর্সের পর একাকী নারীর নীরব কান্না

তীব্র গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে থমকে গেছে শিল্পের চাকা, বন্ধ শত শত কারখানা

জেটিভি নিউজ বাংলা | বিশেষ প্রতিবেদন

তারিখ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ ইল,সময় :সকাল ০৯:৫৭ মিনিট।

তীব্র গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে থমকে গেছে শিল্পের চাকা, বন্ধ শত শত কারখানা

জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ ২০৩ কোটি ঘনফুট, চাহিদা ৩৮৫ কোটি; মেঘনা গ্রুপের ৫৭ কারখানা বন্ধ, উৎপাদন কমেছে গাজীপুর-নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলে
তীব্র গ্যাস সংকটে দেশের শিল্প খাতে নেমে এসেছে বড় ধরনের স্থবিরতা। কোথাও কারখানার মেশিন পুরোপুরি বন্ধ, কোথাও চলছে অর্ধেক সক্ষমতায়। গ্যাসের সংকটের সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকট যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। স্টিল, সিমেন্ট, কাচ, টেক্সটাইল, ডাইং, স্পিনিং, পোশাক ও নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ—প্রায় সব গ্যাসনির্ভর শিল্পই এখন সংকটের মধ্যে পড়েছে। দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, কোথাও আবার সীমিত সক্ষমতায় উৎপাদন চালু রাখা হয়েছে। প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে চলা এই সংকট চতুর্থ সপ্তাহে আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বুধবার জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ নেমে আসে প্রায় ২০৩ কোটি ঘনফুটে। অথচ দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮৫ কোটি ঘনফুট। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭৭ কোটি ঘনফুট। শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, দ্রুত সংকটের সমাধান না হলে শুধু শিল্প উৎপাদন নয়—কর্মসংস্থান ও রপ্তানি, তিন ক্ষেত্রেই বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অর্ডার এবং নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ নিয়ে।

মেঘনা গ্রুপের ৫৭ কারখানা বন্ধ

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে দেশের অন্যতম বড় শিল্পগোষ্ঠী মেঘনা গ্রুপের ৫৭টি কারখানাই বন্ধ রয়েছে। গ্রুপটির চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল জানিয়েছেন, গত ১০ আগস্ট রাত থেকে কারখানাগুলোর উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। মেঘনা গ্রুপ চিনি, ভোজ্যতেল, গম, আটা, ময়দা, সুজি, সিমেন্ট, কাগজ, এলপিজি, ফিডসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করে। শুধু নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্যই গ্রুপটির ১২টি কারখানা রয়েছে। মোস্তফা কামাল বলেন, কারখানা চালানোর মতো ন্যূনতম গ্যাসও পাওয়া যাচ্ছে না। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও বাজারে এসব পণ্যের চাহিদা রয়েছে। ফলে সংকট দীর্ঘ হলে সারা দেশে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায়ও প্রভাব পড়তে পারে। মেঘনা গ্রুপে ৬৫ হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করেন। ফলে দীর্ঘ সময় কারখানা বন্ধ থাকলে এর প্রভাব কর্মসংস্থানেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বন্ধ টি কে গ্রুপের প্রায় ২০ কারখানা

গ্যাসের অভাবে টি কে গ্রুপের ২৮টি প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানার মধ্যে প্রায় ২০টি বন্ধ রয়েছে। চালু থাকা কয়েকটি কারখানাতেও স্বাভাবিক উৎপাদন হচ্ছে না। অন্যদিকে, নাবিল গ্রুপের প্রায় ২০টি কারখানায় উৎপাদন সক্ষমতা ৪০ থেকে ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে। কিছু কারখানায় বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু এতে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যাচ্ছে। শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আপাতত গুদামে থাকা পণ্য দিয়ে বাজারের চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু উৎপাদন বন্ধ থাকলে গুদামের মজুত দ্রুত কমে যাবে। সংকট দীর্ঘ হলে নিত্যপণ্যের সরবরাহেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।

হবিগঞ্জে বন্ধ ১৭১ কারখানা, কর্মহীন প্রায় দুই লাখ

হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলেও গ্যাস সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেখানে ১৭১টি কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। শিল্প সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, এতে প্রায় দুই লাখ শ্রমিক-কর্মচারী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। কারখানা বন্ধের কারণে শুধু শ্রমিকদের আয়ই নয়, সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সরবরাহকারী, পরিবহন ও স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও এর প্রভাব পড়ছে।

গাজীপুরে প্রায় ৫২৫ কারখানার উৎপাদন বন্ধ

গাজীপুরেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। জেলা ও মহানগর এলাকায় প্রায় সাড়ে ৩ হাজার শিল্পকারখানা রয়েছে। এর মধ্যে গ্যাস সংকটে প্রায় ১২ থেকে ১৫ শতাংশ কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৫২৫টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু বন্ধ কারখানাই নয়, যেসব বড় কারখানা এখনো চালু রয়েছে, সেগুলোর উৎপাদনও প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে। ফলে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

নারায়ণগঞ্জে ৪৫০ ডায়িং কারখানা বিপাকে

নারায়ণগঞ্জে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। প্রায় ৪৫০টি ডায়িং কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। ডায়িং কারখানাগুলোতে কাপড় প্রক্রিয়াজাত করতে না পারায় এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে পোশাক কারখানায়। প্রয়োজনীয় কাপড় না পাওয়ায় শতাধিক পোশাক কারখানাও বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, গ্যাস না থাকায় ডায়িং কারখানা থেকে প্রয়োজনীয় কাপড় পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে পোশাক কারখানার উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।

সাভার-আশুলিয়ায় বয়লার, ডাইং ও ফিনিশিং বিভাগে সংকট

সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলেও গ্যাসের চাপ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম। ফলে অনেক কারখানায় বয়লার, ডাইং, ওয়াশিং ও ফিনিশিং বিভাগ স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। শিল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে এই অঞ্চলে কয়েক হাজার শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা যেমন কমছে, তেমনি শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা কমানো, উৎপাদন শিফট বন্ধ রাখা কিংবা সরাসরি ছাঁটাইয়ের মতো পরিস্থিতিও তৈরি হচ্ছে।

নরসিংদী ও মাধবদীতে ৮০ শতাংশ কারখানা বন্ধ

দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ টেক্সটাইল শিল্পাঞ্চল নরসিংদী ও মাধবদীতেও গ্যাস সংকট বড় ধাক্কা দিয়েছে। শিল্প প্রতিনিধিদের দাবি, এখানকার প্রায় ৮০ শতাংশ টেক্সটাইল, ডাইং ও প্রিন্টিং কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে প্রতিদিন প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে বলে শিল্প প্রতিনিধিরা দাবি করেছেন। নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের সরবরাহ সীমিত হয়ে পড়ায় উৎপাদন বন্ধের পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক চাপও বাড়ছে। অন্যদিকে, দেশের অন্যতম বড় ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম তাদের ১০টি প্রধান কারখানার সবকটিই বন্ধ করেছে।

পোশাকশিল্পেও উৎপাদন নেমেছে অর্ধেকে

গ্যাস সংকটের সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকট যুক্ত হওয়ায় সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছে পোশাক ও বস্ত্রশিল্প। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, অনেক পোশাক কারখানায় উৎপাদন প্রায় ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যদিকে বিটিএমএর সদস্য বস্ত্রকলগুলোর বড় অংশও বন্ধ রয়েছে। চালু থাকা কারখানাগুলোতে ৩০ শতাংশের বেশি উৎপাদন করা যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ডেনিম, ডাইং, ফিনিশিং ও স্পিনিংয়ের মতো গ্যাসনির্ভর খাতগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক কারখানা এখন মাত্র ৩০ শতাংশ সক্ষমতায় উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। পোশাক শিল্পের উৎপাদন ব্যবস্থা একক কোনো কারখানার ওপর নির্ভরশীল নয়। স্পিনিং থেকে সুতা, এরপর ডাইং, ফিনিশিং এবং সবশেষে গার্মেন্টস—পুরো প্রক্রিয়াটি একটি সমন্বিত সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। ফলে একটি ধাপে গ্যাস সংকট তৈরি হলে এর প্রভাব পুরো উৎপাদন চেইনে ছড়িয়ে পড়ে।

ডিজেল দিয়ে কারখানা চালানোও কঠিন

গ্যাস ও বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু এতে উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। একটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাদের কারখানা চালাতে প্রতিদিন প্রায় ৬৫ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হচ্ছে। এতে প্রতিদিন খরচ হচ্ছে প্রায় ৭০ লাখ টাকা। এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর জানিয়েছেন, দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের কারণে তাদের ডিজেল ব্যবহার ৩৯০ শতাংশ বেড়েছে। স্নোটেক্স গ্রুপের জ্বালানি ব্যয়ও বেড়েছে প্রায় ১৫০ শতাংশ। এতে একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের মূল্য প্রতিযোগিতাও কঠিন হয়ে পড়ছে। উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, দীর্ঘ সময় এভাবে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে যাবে।

সবচেয়ে বড় শঙ্কা এখন আন্তর্জাতিক অর্ডার

শিল্পোদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন রপ্তানি আদেশ নিয়ে। কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হলে সময়মতো পণ্য তৈরি করা সম্ভব হবে না। এরপর নির্ধারিত সময়ে জাহাজীকরণ করা না গেলে বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার বাতিল করতে পারেন অথবা অর্ডার অন্য দেশে সরিয়ে নিতে পারেন। উদ্যোক্তারা বলছেন, কখন গ্যাস বা বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে না—এ বিষয়ে সরকার যদি আগাম একটি নির্ভরযোগ্য সময়সূচি দেয়, তাহলে তারা উৎপাদন পরিকল্পনা করতে পারবেন। কিন্তু বর্তমানে অনিশ্চিত সরবরাহের কারণে কারখানাগুলোর পুরো উৎপাদন পরিকল্পনা ভেঙে পড়ছে।

‘গ্যাস সংকট এখন পুরো অর্থনীতির ঝুঁকি’

বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, গ্যাস সংকট এখন আর শুধু পোশাকশিল্পের সমস্যা নয়; এটি পুরো শিল্প ও অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তৈরি পোশাকের উৎপাদনব্যবস্থা স্পিনিং, ডাইং, ফিনিশিং থেকে শুরু করে গার্মেন্টস পর্যন্ত একটি সমন্বিত সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নির্ভরশীল। এর যেকোনো একটি পর্যায়ে গ্যাসের সংকট তৈরি হলে পুরো উৎপাদনব্যবস্থাই ব্যাহত হয়। তিনি বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখা। পোশাকশিল্পে একটি চালান সময়মতো দিতে না পারলে শুধু একটি অর্ডার নয়, ভবিষ্যতের ব্যবসায়িক সম্পর্কও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশকে এখন ভারত, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের মতো দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। তাই জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে।

উদ্যোক্তাদের দাবি—গ্যাস সরবরাহে পূর্বানুমানযোগ্য সময়সূচি

মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, স্বল্পমেয়াদে শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত অগ্রাধিকার কাঠামো তৈরি করতে হবে। কোন সময়ে গ্যাসের চাপ কম থাকবে এবং কখন সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে—সরকারকে অন্তত একটি পূর্বানুমানযোগ্য সময়সূচি দিতে হবে। এতে উদ্যোক্তারা উৎপাদন পরিকল্পনা করতে পারবেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদেরও বাস্তব পরিস্থিতি জানানো সম্ভব হবে। তিনি আরও বলেন, শুধু বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে এই সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। ডিজেল দিয়ে উৎপাদন চালাতে গিয়ে যে অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে, তা অনেক কারখানার জন্য বহন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিল্পের আর্থিক সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর জোর

মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, বর্তমান সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য—
  • নতুন গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ খনন;
  • এলএনজি সরবরাহ সক্ষমতা বৃদ্ধি;
  • জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ;
  • শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের অবকাঠামো তৈরি—
এসব বিষয়ে এখনই গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি মনে করেন, গ্যাস সংকটকে শুধু আজকের সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না। এটি বাংলাদেশের শিল্পায়ন, রপ্তানি সক্ষমতা ও বিনিয়োগের ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সাময়িকভাবে সংকট কাটানো গেলেও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে একই সমস্যা বারবার ফিরে আসতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থা হারানো সহজ, কিন্তু সেই আস্থা পুনরুদ্ধার করা অনেক কঠিন।

সংকটের বড় কারণ এলএনজি সরবরাহে ধাক্কা

বর্তমান সংকটের বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকা। ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি সমস্যার পর টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যায়। এতে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। ৬ আগস্ট টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু হলেও পুরো সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি। এর মধ্যে সাগরের খারাপ আবহাওয়ার কারণে নতুন এলএনজি বহনকারী জাহাজ টার্মিনালে ভিড়তে না পারায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো। এখন তা ৩০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যার কারণে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট দৈনিক গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার কথা উঠে এসেছে।

গ্যাস সংকট এখন জাতীয় অর্থনীতির সংকট

চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, গ্যাস সংকট এখন আর শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতির সমস্যা। তাঁর নিজের সয়াবিন বীজ মাড়াই কারখানাসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্পেও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হকও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, প্রয়োজনে গ্যাস সরবরাহে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করে আগে থেকেই শিল্পোদ্যোক্তাদের জানাতে হবে। একই সঙ্গে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার অপচয় এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা কমাতে হবে।

নিত্যপণ্যেও সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা

অর্থনীতিবিদদের মতে, নিত্যপণ্য উৎপাদনকারী কারখানাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি বাজারে নজরদারি বাড়ানো জরুরি। কারণ সংকট দীর্ঘ হলে গুদামে থাকা মজুত পণ্য শেষ হয়ে যেতে পারে। তখন বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে চিনি, ভোজ্যতেল, আটা, ময়দা, সুজি, ফিডসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদনকারী কারখানাগুলো দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে এর প্রভাব সরাসরি ভোক্তা পর্যায়েও পড়তে পারে।

সামনে বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি

বর্তমান সংকট দ্রুত সমাধান না হলে এর প্রভাব ধাপে ধাপে আরও বিস্তৃত হতে পারে। প্রথমে কমবে শিল্প উৎপাদন। এরপর বাড়বে উৎপাদন খরচ। এরপর দেখা দিতে পারে নগদ অর্থের সংকট। কারখানাগুলোর ব্যাংকঋণের কিস্তি পরিশোধে সমস্যা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বাড়তে পারে শ্রমিক ছাঁটাই। রপ্তানিমুখী শিল্প সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে অর্ডার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে। এতে কমতে পারে রপ্তানি আয় এবং বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ। অন্যদিকে নিত্যপণ্য উৎপাদন কমে গেলে বাজারে সরবরাহ ঘাটতি এবং মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ গ্যাস সংকট এখন আর কেবল শিল্পকারখানার সমস্যা নয়। এটি উৎপাদন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি, ব্যাংকিং খাত, নিত্যপণ্যের সরবরাহ এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

সমাধানে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ জরুরি

সংশ্লিষ্টদের মতে, স্বল্পমেয়াদে সীমিত গ্যাসের সঠিক বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। শিল্প ও নিত্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলভিত্তিক গ্যাস সরবরাহের একটি নির্ভরযোগ্য পরিকল্পনা প্রকাশ করা প্রয়োজন। কোন শিল্পাঞ্চলে কখন গ্যাসের চাপ কমবে এবং কখন সরবরাহ স্বাভাবিক হবে—আগাম জানানো হলে উদ্যোক্তারা উৎপাদন পরিকল্পনা করতে পারবেন। দীর্ঘমেয়াদে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, নতুন কূপ খনন, এলএনজি অবকাঠামোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ একটি কারখানার মেশিন বন্ধ হওয়া মানে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্ধ নয়। এর সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায় শ্রমিকের আয়, কমে যায় বাজারের সরবরাহ, বাড়ে শিল্পের ব্যয় এবং ধীর হয়ে যায় অর্থনীতির চাকা।

জেটিভি নিউজ বাংলা’র বিশ্লেষণ

বর্তমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি টিকিয়ে রাখতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প নেই। আজ একটি কারখানা বন্ধ হচ্ছে, আগামীকাল হয়তো আরেকটি। কোথাও উৎপাদন শূন্যে নেমেছে, কোথাও ৩০ থেকে ৫০ শতাংশে। ডিজেল দিয়ে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা হচ্ছে, কিন্তু তাতে বাড়ছে ব্যয়। এভাবে সংকট দীর্ঘায়িত হলে শুধু শিল্পোদ্যোক্তাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না; এর প্রভাব পড়বে শ্রমিকের আয়, বাজারের সরবরাহ, পণ্যের দাম, ব্যাংকঋণ, রপ্তানি আয় এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও। তাই গ্যাস সংকটকে সাময়িক জ্বালানি ঘাটতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান, রপ্তানি সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি। অর্থনীতি ও শিল্প ডেস্ক জেটিভি নিউজ বাংলা

দেশ ও দশের কথা বলে.... 

ট্যাগস

জনপ্রিয় সংবাদ

তীব্র গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে থমকে গেছে শিল্পের চাকা, বন্ধ শত শত কারখানা

তীব্র গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে থমকে গেছে শিল্পের চাকা, বন্ধ শত শত কারখানা

আপডেট সময় ৪ ঘন্টা আগে

জেটিভি নিউজ বাংলা | বিশেষ প্রতিবেদন

তারিখ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ ইল,সময় :সকাল ০৯:৫৭ মিনিট।

তীব্র গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে থমকে গেছে শিল্পের চাকা, বন্ধ শত শত কারখানা

জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ ২০৩ কোটি ঘনফুট, চাহিদা ৩৮৫ কোটি; মেঘনা গ্রুপের ৫৭ কারখানা বন্ধ, উৎপাদন কমেছে গাজীপুর-নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলে
তীব্র গ্যাস সংকটে দেশের শিল্প খাতে নেমে এসেছে বড় ধরনের স্থবিরতা। কোথাও কারখানার মেশিন পুরোপুরি বন্ধ, কোথাও চলছে অর্ধেক সক্ষমতায়। গ্যাসের সংকটের সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকট যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। স্টিল, সিমেন্ট, কাচ, টেক্সটাইল, ডাইং, স্পিনিং, পোশাক ও নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ—প্রায় সব গ্যাসনির্ভর শিল্পই এখন সংকটের মধ্যে পড়েছে। দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, কোথাও আবার সীমিত সক্ষমতায় উৎপাদন চালু রাখা হয়েছে। প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে চলা এই সংকট চতুর্থ সপ্তাহে আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বুধবার জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ নেমে আসে প্রায় ২০৩ কোটি ঘনফুটে। অথচ দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮৫ কোটি ঘনফুট। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭৭ কোটি ঘনফুট। শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, দ্রুত সংকটের সমাধান না হলে শুধু শিল্প উৎপাদন নয়—কর্মসংস্থান ও রপ্তানি, তিন ক্ষেত্রেই বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অর্ডার এবং নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ নিয়ে।

মেঘনা গ্রুপের ৫৭ কারখানা বন্ধ

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে দেশের অন্যতম বড় শিল্পগোষ্ঠী মেঘনা গ্রুপের ৫৭টি কারখানাই বন্ধ রয়েছে। গ্রুপটির চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল জানিয়েছেন, গত ১০ আগস্ট রাত থেকে কারখানাগুলোর উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। মেঘনা গ্রুপ চিনি, ভোজ্যতেল, গম, আটা, ময়দা, সুজি, সিমেন্ট, কাগজ, এলপিজি, ফিডসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করে। শুধু নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্যই গ্রুপটির ১২টি কারখানা রয়েছে। মোস্তফা কামাল বলেন, কারখানা চালানোর মতো ন্যূনতম গ্যাসও পাওয়া যাচ্ছে না। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও বাজারে এসব পণ্যের চাহিদা রয়েছে। ফলে সংকট দীর্ঘ হলে সারা দেশে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায়ও প্রভাব পড়তে পারে। মেঘনা গ্রুপে ৬৫ হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করেন। ফলে দীর্ঘ সময় কারখানা বন্ধ থাকলে এর প্রভাব কর্মসংস্থানেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বন্ধ টি কে গ্রুপের প্রায় ২০ কারখানা

গ্যাসের অভাবে টি কে গ্রুপের ২৮টি প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানার মধ্যে প্রায় ২০টি বন্ধ রয়েছে। চালু থাকা কয়েকটি কারখানাতেও স্বাভাবিক উৎপাদন হচ্ছে না। অন্যদিকে, নাবিল গ্রুপের প্রায় ২০টি কারখানায় উৎপাদন সক্ষমতা ৪০ থেকে ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে। কিছু কারখানায় বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু এতে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যাচ্ছে। শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আপাতত গুদামে থাকা পণ্য দিয়ে বাজারের চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু উৎপাদন বন্ধ থাকলে গুদামের মজুত দ্রুত কমে যাবে। সংকট দীর্ঘ হলে নিত্যপণ্যের সরবরাহেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।

হবিগঞ্জে বন্ধ ১৭১ কারখানা, কর্মহীন প্রায় দুই লাখ

হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলেও গ্যাস সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেখানে ১৭১টি কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। শিল্প সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, এতে প্রায় দুই লাখ শ্রমিক-কর্মচারী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। কারখানা বন্ধের কারণে শুধু শ্রমিকদের আয়ই নয়, সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সরবরাহকারী, পরিবহন ও স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও এর প্রভাব পড়ছে।

গাজীপুরে প্রায় ৫২৫ কারখানার উৎপাদন বন্ধ

গাজীপুরেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। জেলা ও মহানগর এলাকায় প্রায় সাড়ে ৩ হাজার শিল্পকারখানা রয়েছে। এর মধ্যে গ্যাস সংকটে প্রায় ১২ থেকে ১৫ শতাংশ কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৫২৫টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু বন্ধ কারখানাই নয়, যেসব বড় কারখানা এখনো চালু রয়েছে, সেগুলোর উৎপাদনও প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে। ফলে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

নারায়ণগঞ্জে ৪৫০ ডায়িং কারখানা বিপাকে

নারায়ণগঞ্জে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। প্রায় ৪৫০টি ডায়িং কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। ডায়িং কারখানাগুলোতে কাপড় প্রক্রিয়াজাত করতে না পারায় এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে পোশাক কারখানায়। প্রয়োজনীয় কাপড় না পাওয়ায় শতাধিক পোশাক কারখানাও বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, গ্যাস না থাকায় ডায়িং কারখানা থেকে প্রয়োজনীয় কাপড় পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে পোশাক কারখানার উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।

সাভার-আশুলিয়ায় বয়লার, ডাইং ও ফিনিশিং বিভাগে সংকট

সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলেও গ্যাসের চাপ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম। ফলে অনেক কারখানায় বয়লার, ডাইং, ওয়াশিং ও ফিনিশিং বিভাগ স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। শিল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে এই অঞ্চলে কয়েক হাজার শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা যেমন কমছে, তেমনি শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা কমানো, উৎপাদন শিফট বন্ধ রাখা কিংবা সরাসরি ছাঁটাইয়ের মতো পরিস্থিতিও তৈরি হচ্ছে।

নরসিংদী ও মাধবদীতে ৮০ শতাংশ কারখানা বন্ধ

দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ টেক্সটাইল শিল্পাঞ্চল নরসিংদী ও মাধবদীতেও গ্যাস সংকট বড় ধাক্কা দিয়েছে। শিল্প প্রতিনিধিদের দাবি, এখানকার প্রায় ৮০ শতাংশ টেক্সটাইল, ডাইং ও প্রিন্টিং কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে প্রতিদিন প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে বলে শিল্প প্রতিনিধিরা দাবি করেছেন। নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের সরবরাহ সীমিত হয়ে পড়ায় উৎপাদন বন্ধের পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক চাপও বাড়ছে। অন্যদিকে, দেশের অন্যতম বড় ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম তাদের ১০টি প্রধান কারখানার সবকটিই বন্ধ করেছে।

পোশাকশিল্পেও উৎপাদন নেমেছে অর্ধেকে

গ্যাস সংকটের সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকট যুক্ত হওয়ায় সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছে পোশাক ও বস্ত্রশিল্প। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, অনেক পোশাক কারখানায় উৎপাদন প্রায় ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যদিকে বিটিএমএর সদস্য বস্ত্রকলগুলোর বড় অংশও বন্ধ রয়েছে। চালু থাকা কারখানাগুলোতে ৩০ শতাংশের বেশি উৎপাদন করা যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ডেনিম, ডাইং, ফিনিশিং ও স্পিনিংয়ের মতো গ্যাসনির্ভর খাতগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক কারখানা এখন মাত্র ৩০ শতাংশ সক্ষমতায় উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। পোশাক শিল্পের উৎপাদন ব্যবস্থা একক কোনো কারখানার ওপর নির্ভরশীল নয়। স্পিনিং থেকে সুতা, এরপর ডাইং, ফিনিশিং এবং সবশেষে গার্মেন্টস—পুরো প্রক্রিয়াটি একটি সমন্বিত সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। ফলে একটি ধাপে গ্যাস সংকট তৈরি হলে এর প্রভাব পুরো উৎপাদন চেইনে ছড়িয়ে পড়ে।

ডিজেল দিয়ে কারখানা চালানোও কঠিন

গ্যাস ও বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু এতে উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। একটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাদের কারখানা চালাতে প্রতিদিন প্রায় ৬৫ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হচ্ছে। এতে প্রতিদিন খরচ হচ্ছে প্রায় ৭০ লাখ টাকা। এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর জানিয়েছেন, দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের কারণে তাদের ডিজেল ব্যবহার ৩৯০ শতাংশ বেড়েছে। স্নোটেক্স গ্রুপের জ্বালানি ব্যয়ও বেড়েছে প্রায় ১৫০ শতাংশ। এতে একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের মূল্য প্রতিযোগিতাও কঠিন হয়ে পড়ছে। উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, দীর্ঘ সময় এভাবে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে যাবে।

সবচেয়ে বড় শঙ্কা এখন আন্তর্জাতিক অর্ডার

শিল্পোদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন রপ্তানি আদেশ নিয়ে। কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হলে সময়মতো পণ্য তৈরি করা সম্ভব হবে না। এরপর নির্ধারিত সময়ে জাহাজীকরণ করা না গেলে বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার বাতিল করতে পারেন অথবা অর্ডার অন্য দেশে সরিয়ে নিতে পারেন। উদ্যোক্তারা বলছেন, কখন গ্যাস বা বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে না—এ বিষয়ে সরকার যদি আগাম একটি নির্ভরযোগ্য সময়সূচি দেয়, তাহলে তারা উৎপাদন পরিকল্পনা করতে পারবেন। কিন্তু বর্তমানে অনিশ্চিত সরবরাহের কারণে কারখানাগুলোর পুরো উৎপাদন পরিকল্পনা ভেঙে পড়ছে।

‘গ্যাস সংকট এখন পুরো অর্থনীতির ঝুঁকি’

বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, গ্যাস সংকট এখন আর শুধু পোশাকশিল্পের সমস্যা নয়; এটি পুরো শিল্প ও অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তৈরি পোশাকের উৎপাদনব্যবস্থা স্পিনিং, ডাইং, ফিনিশিং থেকে শুরু করে গার্মেন্টস পর্যন্ত একটি সমন্বিত সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নির্ভরশীল। এর যেকোনো একটি পর্যায়ে গ্যাসের সংকট তৈরি হলে পুরো উৎপাদনব্যবস্থাই ব্যাহত হয়। তিনি বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখা। পোশাকশিল্পে একটি চালান সময়মতো দিতে না পারলে শুধু একটি অর্ডার নয়, ভবিষ্যতের ব্যবসায়িক সম্পর্কও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশকে এখন ভারত, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের মতো দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। তাই জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে।

উদ্যোক্তাদের দাবি—গ্যাস সরবরাহে পূর্বানুমানযোগ্য সময়সূচি

মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, স্বল্পমেয়াদে শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত অগ্রাধিকার কাঠামো তৈরি করতে হবে। কোন সময়ে গ্যাসের চাপ কম থাকবে এবং কখন সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে—সরকারকে অন্তত একটি পূর্বানুমানযোগ্য সময়সূচি দিতে হবে। এতে উদ্যোক্তারা উৎপাদন পরিকল্পনা করতে পারবেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদেরও বাস্তব পরিস্থিতি জানানো সম্ভব হবে। তিনি আরও বলেন, শুধু বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে এই সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। ডিজেল দিয়ে উৎপাদন চালাতে গিয়ে যে অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে, তা অনেক কারখানার জন্য বহন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিল্পের আর্থিক সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর জোর

মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, বর্তমান সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য—
  • নতুন গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ খনন;
  • এলএনজি সরবরাহ সক্ষমতা বৃদ্ধি;
  • জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ;
  • শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের অবকাঠামো তৈরি—
এসব বিষয়ে এখনই গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি মনে করেন, গ্যাস সংকটকে শুধু আজকের সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না। এটি বাংলাদেশের শিল্পায়ন, রপ্তানি সক্ষমতা ও বিনিয়োগের ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সাময়িকভাবে সংকট কাটানো গেলেও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে একই সমস্যা বারবার ফিরে আসতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থা হারানো সহজ, কিন্তু সেই আস্থা পুনরুদ্ধার করা অনেক কঠিন।

সংকটের বড় কারণ এলএনজি সরবরাহে ধাক্কা

বর্তমান সংকটের বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকা। ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি সমস্যার পর টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যায়। এতে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। ৬ আগস্ট টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু হলেও পুরো সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি। এর মধ্যে সাগরের খারাপ আবহাওয়ার কারণে নতুন এলএনজি বহনকারী জাহাজ টার্মিনালে ভিড়তে না পারায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো। এখন তা ৩০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যার কারণে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট দৈনিক গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার কথা উঠে এসেছে।

গ্যাস সংকট এখন জাতীয় অর্থনীতির সংকট

চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, গ্যাস সংকট এখন আর শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতির সমস্যা। তাঁর নিজের সয়াবিন বীজ মাড়াই কারখানাসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্পেও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হকও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, প্রয়োজনে গ্যাস সরবরাহে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করে আগে থেকেই শিল্পোদ্যোক্তাদের জানাতে হবে। একই সঙ্গে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার অপচয় এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা কমাতে হবে।

নিত্যপণ্যেও সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা

অর্থনীতিবিদদের মতে, নিত্যপণ্য উৎপাদনকারী কারখানাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি বাজারে নজরদারি বাড়ানো জরুরি। কারণ সংকট দীর্ঘ হলে গুদামে থাকা মজুত পণ্য শেষ হয়ে যেতে পারে। তখন বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে চিনি, ভোজ্যতেল, আটা, ময়দা, সুজি, ফিডসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদনকারী কারখানাগুলো দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে এর প্রভাব সরাসরি ভোক্তা পর্যায়েও পড়তে পারে।

সামনে বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি

বর্তমান সংকট দ্রুত সমাধান না হলে এর প্রভাব ধাপে ধাপে আরও বিস্তৃত হতে পারে। প্রথমে কমবে শিল্প উৎপাদন। এরপর বাড়বে উৎপাদন খরচ। এরপর দেখা দিতে পারে নগদ অর্থের সংকট। কারখানাগুলোর ব্যাংকঋণের কিস্তি পরিশোধে সমস্যা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বাড়তে পারে শ্রমিক ছাঁটাই। রপ্তানিমুখী শিল্প সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে অর্ডার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে। এতে কমতে পারে রপ্তানি আয় এবং বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ। অন্যদিকে নিত্যপণ্য উৎপাদন কমে গেলে বাজারে সরবরাহ ঘাটতি এবং মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ গ্যাস সংকট এখন আর কেবল শিল্পকারখানার সমস্যা নয়। এটি উৎপাদন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি, ব্যাংকিং খাত, নিত্যপণ্যের সরবরাহ এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

সমাধানে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ জরুরি

সংশ্লিষ্টদের মতে, স্বল্পমেয়াদে সীমিত গ্যাসের সঠিক বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। শিল্প ও নিত্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলভিত্তিক গ্যাস সরবরাহের একটি নির্ভরযোগ্য পরিকল্পনা প্রকাশ করা প্রয়োজন। কোন শিল্পাঞ্চলে কখন গ্যাসের চাপ কমবে এবং কখন সরবরাহ স্বাভাবিক হবে—আগাম জানানো হলে উদ্যোক্তারা উৎপাদন পরিকল্পনা করতে পারবেন। দীর্ঘমেয়াদে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, নতুন কূপ খনন, এলএনজি অবকাঠামোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ একটি কারখানার মেশিন বন্ধ হওয়া মানে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্ধ নয়। এর সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায় শ্রমিকের আয়, কমে যায় বাজারের সরবরাহ, বাড়ে শিল্পের ব্যয় এবং ধীর হয়ে যায় অর্থনীতির চাকা।

জেটিভি নিউজ বাংলা’র বিশ্লেষণ

বর্তমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি টিকিয়ে রাখতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প নেই। আজ একটি কারখানা বন্ধ হচ্ছে, আগামীকাল হয়তো আরেকটি। কোথাও উৎপাদন শূন্যে নেমেছে, কোথাও ৩০ থেকে ৫০ শতাংশে। ডিজেল দিয়ে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা হচ্ছে, কিন্তু তাতে বাড়ছে ব্যয়। এভাবে সংকট দীর্ঘায়িত হলে শুধু শিল্পোদ্যোক্তাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না; এর প্রভাব পড়বে শ্রমিকের আয়, বাজারের সরবরাহ, পণ্যের দাম, ব্যাংকঋণ, রপ্তানি আয় এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও। তাই গ্যাস সংকটকে সাময়িক জ্বালানি ঘাটতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান, রপ্তানি সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি। অর্থনীতি ও শিল্প ডেস্ক জেটিভি নিউজ বাংলা

দেশ ও দশের কথা বলে....