৫৪০ কোটি টাকার চার ফ্লাইওভার প্রকল্পে ধীরগতি, বাড়ছে জনদুর্ভোগ
রাজশাহী প্রতিনিধি: রাজশাহী মহানগরীর যানজট নিরসনে চারটি গুরুত্বপূর্ণ রেলক্রসিংয়ে ফ্লাইওভার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি কোনো প্রকল্পের কাজ। ৫৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া এসব প্রকল্পের মূল মেয়াদ চলতি বছরের জুনে শেষ হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি ফ্লাইওভারের কাজ শেষ করতে ডিসেম্বর পর্যন্ত নতুন সময় চাওয়া হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান চত্বর ফ্লাইওভারের মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ চলায় নগরীর বিভিন্ন সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি, খানাখন্দ, কাদা ও যানজটের কারণে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী। ব্যবসা-বাণিজ্যে ক্ষতির পাশাপাশি ভাঙাচোরা সড়কে যানবাহন চলাচলেও বেড়েছে ঝুঁকি। নগরবাসীর অভিযোগ, কাজের ধীরগতি, সমন্বয়হীনতা ও দুর্বল তদারকির কারণে উন্নয়ন প্রকল্পই এখন জনভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের শেষ দিকে নগরীর চারটি গুরুত্বপূর্ণ রেলক্রসিংয়ে যানজট নিরসনের লক্ষ্যে ৫৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি ফ্লাইওভার নির্মাণকাজ শুরু হয়। এর মধ্যে রায়পাড়া ফ্লাইওভারে ৮৬ কোটি ১৯ লাখ, বন্ধগেটে ৯৭ কোটি ৭০ লাখ, বিলশিমলায় ৮৭ কোটি ৩০ লাখ এবং শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান চত্বরে সবচেয়ে বড় ফ্লাইওভার নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৭০ কোটি ৫১ লাখ টাকা। প্রকল্পগুলোর মেয়াদ চলতি বছরের জুনে শেষ হলেও তিনটি ফ্লাইওভারের কাজ শেষ করার নতুন সময় নির্ধারণের জন্য ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় চাওয়া হয়েছে। আর শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান চত্বরের ফ্লাইওভারের মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে।সরেজমিনে নির্মাণকাজের চিত্র
সরেজমিনে দেখা যায়, বিন্দুর মোড় থেকে নিউমার্কেট পর্যন্ত ফ্লাইওভারের নির্মাণকাজ এখনও পিলার নির্মাণ পর্যায়ে রয়েছে। কাজের কারণে গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে আংশিক বন্ধ থাকায় রেলগেট এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই যানজট তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে বন্ধগেট ফ্লাইওভারের মূল অবকাঠামোর কাজ শেষের পথে হলেও সড়কজুড়ে খোঁড়াখুঁড়ি ও শাটারিংয়ের কারণে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বিলশিমলা-বহরমপুর ফ্লাইওভারের কাজ চলায় সিটি বাইপাস দিয়ে সরাসরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে যানবাহনকে কয়েক কিলোমিটার ঘুরে গন্তব্যে যেতে হচ্ছে। রায়পাড়া ফ্লাইওভারের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকলেও পাশেই ওয়াসার পানির লাইন স্থাপনের কাজ শুরু হওয়ায় নতুন করে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে।মানুষের ভোগান্তি
এতে ক্ষোভ প্রকাশ করে এলাকার ব্যবসায়ী আবদুর রহিম বলেন, ‘নির্মাণকাজ খুব ধীরগতিতে চলছে। এতে আমাদের ব্যবসার ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। প্রায় ছয় মাস ধরে ব্যবসা নেই বললেই চলে।’ ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকচালক জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে কাজ চলছে। রাস্তায় গর্ত ও ভাঙাচোরা অবস্থার কারণে প্রায়ই গাড়ি নষ্ট হচ্ছে। দ্রুত কাজ শেষ করে সড়ক সংস্কারের দাবি জানাই।’ রিকশাচালক শুকুর আলী বলেন, ‘আগে রাজশাহীর রাস্তা ভালো ছিল। এখন বৃষ্টি হলেই পানি জমে যায়। গত সপ্তাহে গর্তে পড়ে আমার রিকশা নষ্ট হয়েছে। মেরামতে প্রায় দুই হাজার টাকা খরচ হয়েছে।’ রায়পাড়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘রাজশাহীতে এত বড় ফ্লাইওভারের প্রয়োজন ছিল কিনা, সেটিই এখন প্রশ্ন। উন্নয়নের নামে মানুষকে বছরের পর বছর দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।’ বন্ধগেট এলাকার বাসিন্দা সজীব ভূঁইয়া বলেন, ‘এক কিলোমিটার পথ যেতে এখন তিন কিলোমিটার ঘুরতে হয়। এতে সময় ও জ্বালানি—দুই-ই নষ্ট হচ্ছে।’ বহরমপুর এলাকার বাসিন্দা অরুণ মণ্ডল বলেন, ‘ভাঙা রাস্তা দিয়ে চলাচল এমনিতেই কষ্টকর। বর্ষায় তা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।’কবে শেষ হবে কাজ?
নগরীর বন্ধগেট, হড়গ্রাম রেলক্রসিং ও গৌরহাঙ্গা রেলক্রসিংয়ের ওপর তিনটি ফ্লাইওভার নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ডিয়েনকো লিমিটেডের প্রকল্প পরিচালক সুবোধ চন্দ্র মিত্র বলেন, ‘আমরা যত দ্রুত সম্ভব নির্মাণকাজ করছি।’ এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যের জন্য তিনি সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। বিলশিমলা এলাকার ফ্লাইওভারের নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান মজিদ সন্সের নির্বাহী পরিচালক জারগিছুর রহমান বলেন, ‘আমাদের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় চাওয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হবে বলে আশা করছি।’ গৌরহাঙ্গা এলাকার একাংশের ফ্লাইওভার নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান এসইএলের প্রকল্প ব্যবস্থাপক রাসেল আলম বলেন, ‘গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইনের কারণে নগর ভবন ও স্টেশন এলাকার নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে। এসব লাইন না সরালে কাজ করা সম্ভব নয়। তবে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অংশের কাজ চলমান রয়েছে। আগামী বছরের এপ্রিলের মধ্যে ওই অংশের কাজ শেষ হবে।’ রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহমদ আল মঈন বলেন, ‘তিনটি ফ্লাইওভারের কাজ চলতি বছরের শেষেই শেষ হবে। তবে নানা জটিলতার কারণে শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান চত্বরের ফ্লাইওভারের মেয়াদ ২০২৮ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের কাজের উদ্দেশ্য জনজীবনের উন্নয়ন। কাজ চলাকালে সাময়িক অসুবিধা হলেও প্রকল্প শেষ হলে নগরবাসী এর সুফল পাবেন।’ রাসিকের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বিল জটিলতার কারণে ঠিকাদাররা কাজ এগিয়ে নিতে পারেননি। সেই জটিলতা দূর করা হয়েছে। এখন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ দুই থেকে তিনটি ফ্লাইওভার যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করছি।’ সবমিলিয়ে, যানজট নিরসন ও নগরবাসীর চলাচল সহজ করার উদ্দেশ্যে নেওয়া ৫৪০ কোটি টাকার চার ফ্লাইওভার প্রকল্প এখন সময় ও বাস্তবায়ন জটিলতায় আটকে আছে। দ্রুত কাজ শেষ না হলে নির্মাণকাজের কারণে সৃষ্ট জনদুর্ভোগ আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা করছেন নগরবাসী। জেটিভি নিউজ বাংলাদেশ ও দশের কথা বলে....

রাজশাহী প্রতিনিধি 





















