ঢাকা , মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, ভোট হবে বিকেল ২টা থেকে ৫টা গভীর রাতেও বিদ্যুতের চাহিদা সর্বোচ্চের কাছাকাছি, তীব্র লোডশেডিংয়ের নেপথ্যে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এনজিও ঋণ ও  ১২ লাখ টাকা নিয়ে পালিয়ে আদালতে মামলা চলমান এবং একাধিক বিয়ে করে গয়না ও টাকা পয়সা আত্মসাত মন খুলে গান গাওয়া যায়, নম্বর দেওয়া যায় না’: শিক্ষামন্ত্রী জনপ্রশাসনের শীর্ষ দুই পদে নতুন নিয়োগের আলোচনা, সম্ভাব্য তালিকায় একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা জেনেও কেন প্রার্থী দিল জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট? রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন ও রাজনৈতিক সমঝোতা নিয়ে ১১ দলীয় জোটের বৈঠক কাঁচা মরিচ আমদানিতে অর্ধেকে নেমেছে দাম, বেনাপোলে ৩০০ থেকে ১৫০-১৮০ টাকা মহেশখালীর মেগা প্রকল্প থেকে বন্যার্তদের পুনর্বাসন—রোববার কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে তারেক রহমান বকশীবাজারে আলিয়া মাদ্রাসার সামনে পুলিশের ব্যারিকেড প্রত্যাহার, যান চলাচল স্বাভাবিক

গভীর রাতেও বিদ্যুতের চাহিদা সর্বোচ্চের কাছাকাছি, তীব্র লোডশেডিংয়ের নেপথ্যে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা

জেটিভি নিউজ বাংলা

তারিখ: ১১ আগস্ট ২০২৬ ইং| সময়: সকাল ৯:২৬ মিনিট

গভীর রাতেও বিদ্যুতের চাহিদা সর্বোচ্চের কাছাকাছি, তীব্র লোডশেডিংয়ের নেপথ্যে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা

সাধারণত সন্ধ্যার পর বিদ্যুতের চাহিদা বাড়তে বাড়তে রাত ৮টার দিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এরপর মানুষ ঘুমিয়ে পড়লে চাহিদা কমে আসার কথা। সেই হিসাবেই রাত ১১টার পর বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে আনা হয়। তবে এবার সেই চিত্র বদলে গেছে। এখন গভীর রাতেও বিদ্যুতের চাহিদা থাকছে প্রায় সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি। ফলে রাত ১টা থেকে ভোর পর্যন্তও তীব্র লোডশেডিং হচ্ছে। বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এর অন্যতম কারণ সারা দেশে রাতভর চলা হাজার হাজার ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জিং। বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগে মানুষ ঘুমিয়ে পড়লে বাসাবাড়ির লাইট, ফ্যানসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ব্যবহার কমে যেত। ফলে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও স্বাভাবিকভাবে কমে আসত। কিন্তু বর্তমানে দিনের বেলায় চলাচল করা বিপুলসংখ্যক ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইক সাধারণত রাতে চার্জে দেওয়া হয়। এ কারণে মানুষ ঘুমিয়ে পড়লেও বিদ্যুতের চাহিদা প্রত্যাশিত মাত্রায় কমছে না। একই সময়ে রাতের দিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ায় গভীর রাতে লোডশেডিং আরও তীব্র হচ্ছে।

রাতের বিদ্যুৎ চাহিদায় বড় পরিবর্তন

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ—পিজিসিবি সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণেও রাতের বিদ্যুৎ চাহিদার পরিবর্তিত চিত্র পাওয়া গেছে। ৯ আগস্ট রাত ৮টায় দেশের সান্ধ্য পিক বা সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৯৩৫ মেগাওয়াট। ওই সময় উৎপাদন হয় ১৪ হাজার ২১৩ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৭২২ মেগাওয়াট। কিন্তু রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা প্রত্যাশিত মাত্রায় কমেনি। রাত ১টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট। এ সময় উৎপাদন নেমে আসে ১২ হাজার ৫০৫ মেগাওয়াটে। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে। ওই দিন এটিই ছিল সর্বোচ্চ লোডশেডিং। রাত ২টাতেও পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি। এ সময় ১৬ হাজার ১১৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন ছিল ১২ হাজার ৩৬৪ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৭৫১ মেগাওয়াট। রাত ৩টায় দেশের বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৭১ মেগাওয়াট। বিপরীতে উৎপাদন হয় ১২ হাজার ৪৩২ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬৩৯ মেগাওয়াটে। রাত ৪টায় চাহিদা কিছুটা কমে ১৫ হাজার ৭৪৩ মেগাওয়াটে এলেও উৎপাদনও কমিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় উৎপাদন ছিল ১২ হাজার ২৮০ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৪৬৩ মেগাওয়াট। ভোর ৫টায়ও বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৬৫১ মেগাওয়াট। বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১২ হাজার ২৭৯ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৩৭২ মেগাওয়াট

অটোরিকশা ও ইজিবাইকের রাতের চার্জিংয়ে বাড়ছে চাপ

বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাতের উচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদার সঙ্গে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকের ব্যাপক চার্জিংয়ের বিষয়টিও আলোচনায় আসছে। দিনের বেলায় রাস্তায় চলাচল করা বিপুলসংখ্যক ব্যাটারিচালিত যান সাধারণত রাতে চার্জে দেওয়া হয়। ফলে একই সময়ে বিপুলসংখ্যক ব্যাটারি চার্জে বসলে রাতের বিদ্যুতের চাহিদা কমার পরিবর্তে তা উচ্চ পর্যায়ে থাকার একটি কারণ হতে পারে। সারা দেশে কত অটোরিকশা ও ইজিবাইক রয়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে দেশের প্রায় সব এলাকাতেই ব্যাটারিচালিত এসব যান দিনে চলাচলের পর রাতে চার্জে দেওয়া হয়। ফলে মানুষের ঘুমিয়ে পড়ার পরও বিদ্যুতের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। আগে সন্ধ্যার পর থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত সময়কে মূলত পিক আওয়ার ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হতো। এখন রাত ১১টার পরও বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় একই থাকছে। এমনকি রাত ১২টা, ১টা, ২টা বা ৩টার সময়ও চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি থাকছে। অথচ এ সময়ে উৎপাদন কমে যাওয়ায় ঘাটতি বাড়ছে। ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি—ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামীম আহমেদ বলেন, বিদ্যুতের চাহিদা এমনিতেই আগের চেয়ে বেশি। অটোরিকশার কারণে বিদ্যুতের চাহিদা আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। তারা রাতের বেলায় মূলত চার্জ করে। তিনি জানান, ডেসকোর এলাকায় রেজিস্ট্রেশন করা অটোরিকশা রয়েছে প্রায় ৩ হাজার। এসব অটোরিকশা যাতে অফ-পিক আওয়ারে চার্জ করতে পারে, সেজন্য একটি পাইলট প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হয়েছে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামীম আহমেদ আরও বলেন, একদিকে রাতে বিদ্যুতের চাহিদা প্রত্যাশিত মাত্রায় কমছে না, অন্যদিকে সেই চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদনও বাড়ানো যাচ্ছে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে লোডশেডিংয়ে, বিশেষ করে গভীর রাতে ও গ্রামাঞ্চলে।

গ্রামের মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে

বিদ্যুতের এই সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে গ্রামাঞ্চলে। বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড—আরইবির সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অনেক এলাকায় তারা চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎও পাচ্ছে না। ফলে এলাকা ভেদে গড়ে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তা প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে চাইছেন না। বিদ্যুতের লোডশেডিং নিয়ে বক্তব্য দিলে তা সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা হিসেবে দেখা হতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে তাদের মধ্যে।

জ্বালানি সংকটে বাড়ছে না বিদ্যুৎ উৎপাদন

বিদ্যুৎ উৎপাদন কম থাকার মূল কারণগুলোর একটি হলো জ্বালানি সংকট। গ্যাসের সরবরাহ এখনও প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়েনি। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন পাওয়া যাচ্ছে না। ৯ আগস্ট দুপুর ১২টায় দিনের সর্বোচ্চ উৎপাদন বা ডে পিক পর্যায়ে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ১৪ হাজার ৭৬ মেগাওয়াট। এ সময় গ্যাস থেকে ৩ হাজার ৮৮৪ মেগাওয়াট, তরল জ্বালানি থেকে ১ হাজার ৫২০ মেগাওয়াট এবং কয়লা থেকে ৫ হাজার ৭১৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। একই সময়ে সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৬৪২ মেগাওয়াট, জলবিদ্যুৎ থেকে ২১৯ মেগাওয়াট এবং বায়ু থেকে কোনো বিদ্যুৎ পাওয়া যায়নি। ভারতীয় এইচভিডিসি থেকে ৯০১ মেগাওয়াট, ত্রিপুরা থেকে ১৫৬ মেগাওয়াট, আদানি থেকে ৮২২ মেগাওয়াট এবং নেপাল থেকে ৩৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাসের ঘাটতি না মেটানো পর্যন্ত গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব নয়। অপরদিকে, বেসরকারি উদ্যোক্তাদের পাওনা পরিশোধ না করে তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোও কঠিন। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের হাতেই দেশের বেশিরভাগ তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বেসরকারি উদ্যোক্তারা সরকারের কাছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা পাওনা রয়েছেন। এই পাওনা পরিশোধ না হওয়া এবং জ্বালানি সরবরাহের সংকটের কারণে উৎপাদন বাড়ানোর সক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়েছে।

অটোরিকশার চার্জিংয়ে নীতিমালার প্রস্তাব

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, অটোরিকশার কারণে মধ্যরাতেও বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকবে—এটি স্বাভাবিক। কারণ রাতেই তারা বেশি চার্জ দেয়। দিনের বেলায় রিকশা চালাতে হয়। তিনি বলেন, অটোরিকশায় ব্যবহৃত বিদ্যুৎকে সরকার চাইলে লাভজনক খাতে নিতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১৬ থেকে ১৮ টাকা হতে পারে। সরকার চাইলে পিক আওয়ারেও অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ করার সুযোগ দিতে পারে। তার মতে, সরকারের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা একেবারে কম নয়। তবে সবার আগে অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সরকারকে একটি নীতিমালা করে তার আওতায় এসব কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। এর পাশাপাশি এই সুযোগে সোলার চার্জিং স্টেশনের কাজও এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে। এতে মধ্যরাতে লোডশেডিং কমানো সম্ভব হবে, মানুষের ভোগান্তিও কমবে। একই সঙ্গে সরকার বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বিদ্যুৎ বিল আদায়ের মাধ্যমে লাভও করতে পারবে।

JTV News Bangla বিশ্লেষণ

বিদ্যুতের রাতের চাহিদার পরিবর্তিত ধরন এখন বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একদিকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকের সংখ্যা বাড়ছে এবং রাতের বেলায় তাদের চার্জিংয়ের চাপ তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে গ্যাস ও তরল জ্বালানির সংকটের কারণে প্রয়োজন অনুযায়ী উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছে না। ফলে রাতের বেলায় চাহিদা কমার পরিবর্তে তা উচ্চ পর্যায়ে থাকলেও উৎপাদন কমে যাওয়ায় ঘাটতি বাড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে লোডশেডিংয়ে, যার সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে গ্রামাঞ্চলের মানুষকে। বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাটারিচালিত যানবাহনের চার্জিং ব্যবস্থাপনা, অফ-পিক আওয়ারে চার্জিংয়ের সুযোগ, নির্দিষ্ট নীতিমালা এবং সোলার চার্জিং স্টেশন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া গেলে রাতের বিদ্যুতের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি একটি বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাও তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।   জেটিভি নিউজ বাংলা

দেশ ও দশের কথা বলে.....

ট্যাগস

জনপ্রিয় সংবাদ

২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, ভোট হবে বিকেল ২টা থেকে ৫টা

গভীর রাতেও বিদ্যুতের চাহিদা সর্বোচ্চের কাছাকাছি, তীব্র লোডশেডিংয়ের নেপথ্যে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা

আপডেট সময় ৭ ঘন্টা আগে

জেটিভি নিউজ বাংলা

তারিখ: ১১ আগস্ট ২০২৬ ইং| সময়: সকাল ৯:২৬ মিনিট

গভীর রাতেও বিদ্যুতের চাহিদা সর্বোচ্চের কাছাকাছি, তীব্র লোডশেডিংয়ের নেপথ্যে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা

সাধারণত সন্ধ্যার পর বিদ্যুতের চাহিদা বাড়তে বাড়তে রাত ৮টার দিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এরপর মানুষ ঘুমিয়ে পড়লে চাহিদা কমে আসার কথা। সেই হিসাবেই রাত ১১টার পর বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে আনা হয়। তবে এবার সেই চিত্র বদলে গেছে। এখন গভীর রাতেও বিদ্যুতের চাহিদা থাকছে প্রায় সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি। ফলে রাত ১টা থেকে ভোর পর্যন্তও তীব্র লোডশেডিং হচ্ছে। বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এর অন্যতম কারণ সারা দেশে রাতভর চলা হাজার হাজার ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জিং। বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগে মানুষ ঘুমিয়ে পড়লে বাসাবাড়ির লাইট, ফ্যানসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ব্যবহার কমে যেত। ফলে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও স্বাভাবিকভাবে কমে আসত। কিন্তু বর্তমানে দিনের বেলায় চলাচল করা বিপুলসংখ্যক ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইক সাধারণত রাতে চার্জে দেওয়া হয়। এ কারণে মানুষ ঘুমিয়ে পড়লেও বিদ্যুতের চাহিদা প্রত্যাশিত মাত্রায় কমছে না। একই সময়ে রাতের দিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ায় গভীর রাতে লোডশেডিং আরও তীব্র হচ্ছে।

রাতের বিদ্যুৎ চাহিদায় বড় পরিবর্তন

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ—পিজিসিবি সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণেও রাতের বিদ্যুৎ চাহিদার পরিবর্তিত চিত্র পাওয়া গেছে। ৯ আগস্ট রাত ৮টায় দেশের সান্ধ্য পিক বা সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৯৩৫ মেগাওয়াট। ওই সময় উৎপাদন হয় ১৪ হাজার ২১৩ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৭২২ মেগাওয়াট। কিন্তু রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা প্রত্যাশিত মাত্রায় কমেনি। রাত ১টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট। এ সময় উৎপাদন নেমে আসে ১২ হাজার ৫০৫ মেগাওয়াটে। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে। ওই দিন এটিই ছিল সর্বোচ্চ লোডশেডিং। রাত ২টাতেও পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি। এ সময় ১৬ হাজার ১১৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন ছিল ১২ হাজার ৩৬৪ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৭৫১ মেগাওয়াট। রাত ৩টায় দেশের বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৭১ মেগাওয়াট। বিপরীতে উৎপাদন হয় ১২ হাজার ৪৩২ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬৩৯ মেগাওয়াটে। রাত ৪টায় চাহিদা কিছুটা কমে ১৫ হাজার ৭৪৩ মেগাওয়াটে এলেও উৎপাদনও কমিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় উৎপাদন ছিল ১২ হাজার ২৮০ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৪৬৩ মেগাওয়াট। ভোর ৫টায়ও বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৬৫১ মেগাওয়াট। বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১২ হাজার ২৭৯ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৩৭২ মেগাওয়াট

অটোরিকশা ও ইজিবাইকের রাতের চার্জিংয়ে বাড়ছে চাপ

বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাতের উচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদার সঙ্গে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকের ব্যাপক চার্জিংয়ের বিষয়টিও আলোচনায় আসছে। দিনের বেলায় রাস্তায় চলাচল করা বিপুলসংখ্যক ব্যাটারিচালিত যান সাধারণত রাতে চার্জে দেওয়া হয়। ফলে একই সময়ে বিপুলসংখ্যক ব্যাটারি চার্জে বসলে রাতের বিদ্যুতের চাহিদা কমার পরিবর্তে তা উচ্চ পর্যায়ে থাকার একটি কারণ হতে পারে। সারা দেশে কত অটোরিকশা ও ইজিবাইক রয়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে দেশের প্রায় সব এলাকাতেই ব্যাটারিচালিত এসব যান দিনে চলাচলের পর রাতে চার্জে দেওয়া হয়। ফলে মানুষের ঘুমিয়ে পড়ার পরও বিদ্যুতের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। আগে সন্ধ্যার পর থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত সময়কে মূলত পিক আওয়ার ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হতো। এখন রাত ১১টার পরও বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় একই থাকছে। এমনকি রাত ১২টা, ১টা, ২টা বা ৩টার সময়ও চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি থাকছে। অথচ এ সময়ে উৎপাদন কমে যাওয়ায় ঘাটতি বাড়ছে। ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি—ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামীম আহমেদ বলেন, বিদ্যুতের চাহিদা এমনিতেই আগের চেয়ে বেশি। অটোরিকশার কারণে বিদ্যুতের চাহিদা আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। তারা রাতের বেলায় মূলত চার্জ করে। তিনি জানান, ডেসকোর এলাকায় রেজিস্ট্রেশন করা অটোরিকশা রয়েছে প্রায় ৩ হাজার। এসব অটোরিকশা যাতে অফ-পিক আওয়ারে চার্জ করতে পারে, সেজন্য একটি পাইলট প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হয়েছে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামীম আহমেদ আরও বলেন, একদিকে রাতে বিদ্যুতের চাহিদা প্রত্যাশিত মাত্রায় কমছে না, অন্যদিকে সেই চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদনও বাড়ানো যাচ্ছে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে লোডশেডিংয়ে, বিশেষ করে গভীর রাতে ও গ্রামাঞ্চলে।

গ্রামের মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে

বিদ্যুতের এই সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে গ্রামাঞ্চলে। বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড—আরইবির সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অনেক এলাকায় তারা চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎও পাচ্ছে না। ফলে এলাকা ভেদে গড়ে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তা প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে চাইছেন না। বিদ্যুতের লোডশেডিং নিয়ে বক্তব্য দিলে তা সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা হিসেবে দেখা হতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে তাদের মধ্যে।

জ্বালানি সংকটে বাড়ছে না বিদ্যুৎ উৎপাদন

বিদ্যুৎ উৎপাদন কম থাকার মূল কারণগুলোর একটি হলো জ্বালানি সংকট। গ্যাসের সরবরাহ এখনও প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়েনি। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন পাওয়া যাচ্ছে না। ৯ আগস্ট দুপুর ১২টায় দিনের সর্বোচ্চ উৎপাদন বা ডে পিক পর্যায়ে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ১৪ হাজার ৭৬ মেগাওয়াট। এ সময় গ্যাস থেকে ৩ হাজার ৮৮৪ মেগাওয়াট, তরল জ্বালানি থেকে ১ হাজার ৫২০ মেগাওয়াট এবং কয়লা থেকে ৫ হাজার ৭১৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। একই সময়ে সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৬৪২ মেগাওয়াট, জলবিদ্যুৎ থেকে ২১৯ মেগাওয়াট এবং বায়ু থেকে কোনো বিদ্যুৎ পাওয়া যায়নি। ভারতীয় এইচভিডিসি থেকে ৯০১ মেগাওয়াট, ত্রিপুরা থেকে ১৫৬ মেগাওয়াট, আদানি থেকে ৮২২ মেগাওয়াট এবং নেপাল থেকে ৩৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাসের ঘাটতি না মেটানো পর্যন্ত গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব নয়। অপরদিকে, বেসরকারি উদ্যোক্তাদের পাওনা পরিশোধ না করে তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোও কঠিন। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের হাতেই দেশের বেশিরভাগ তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বেসরকারি উদ্যোক্তারা সরকারের কাছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা পাওনা রয়েছেন। এই পাওনা পরিশোধ না হওয়া এবং জ্বালানি সরবরাহের সংকটের কারণে উৎপাদন বাড়ানোর সক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়েছে।

অটোরিকশার চার্জিংয়ে নীতিমালার প্রস্তাব

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, অটোরিকশার কারণে মধ্যরাতেও বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকবে—এটি স্বাভাবিক। কারণ রাতেই তারা বেশি চার্জ দেয়। দিনের বেলায় রিকশা চালাতে হয়। তিনি বলেন, অটোরিকশায় ব্যবহৃত বিদ্যুৎকে সরকার চাইলে লাভজনক খাতে নিতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১৬ থেকে ১৮ টাকা হতে পারে। সরকার চাইলে পিক আওয়ারেও অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ করার সুযোগ দিতে পারে। তার মতে, সরকারের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা একেবারে কম নয়। তবে সবার আগে অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সরকারকে একটি নীতিমালা করে তার আওতায় এসব কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। এর পাশাপাশি এই সুযোগে সোলার চার্জিং স্টেশনের কাজও এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে। এতে মধ্যরাতে লোডশেডিং কমানো সম্ভব হবে, মানুষের ভোগান্তিও কমবে। একই সঙ্গে সরকার বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বিদ্যুৎ বিল আদায়ের মাধ্যমে লাভও করতে পারবে।

JTV News Bangla বিশ্লেষণ

বিদ্যুতের রাতের চাহিদার পরিবর্তিত ধরন এখন বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একদিকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকের সংখ্যা বাড়ছে এবং রাতের বেলায় তাদের চার্জিংয়ের চাপ তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে গ্যাস ও তরল জ্বালানির সংকটের কারণে প্রয়োজন অনুযায়ী উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছে না। ফলে রাতের বেলায় চাহিদা কমার পরিবর্তে তা উচ্চ পর্যায়ে থাকলেও উৎপাদন কমে যাওয়ায় ঘাটতি বাড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে লোডশেডিংয়ে, যার সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে গ্রামাঞ্চলের মানুষকে। বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাটারিচালিত যানবাহনের চার্জিং ব্যবস্থাপনা, অফ-পিক আওয়ারে চার্জিংয়ের সুযোগ, নির্দিষ্ট নীতিমালা এবং সোলার চার্জিং স্টেশন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া গেলে রাতের বিদ্যুতের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি একটি বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাও তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।   জেটিভি নিউজ বাংলা

দেশ ও দশের কথা বলে.....