ঢাকা , শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনতার যুদ্ধ, গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম: হাফিজ উদ্দিন বৃষ্টির প্রভাব কাটতেই সবজির বাজারে স্বস্তি, তবে মাছ-মাংস-ডিমের ঊর্ধ্বমূল্যে বিপাকে ক্রেতারা স্ত্রী যদি বলেন—‘সংসার করবো না, সম্মান করবো না, ডিভোর্সও দেব না’; আইন ও পারিবারিক দৃষ্টিভঙ্গি কী বলে? জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে অভ্যন্তরীণ অভিবাসন: শহরগুলো কতটা প্রস্তুত  ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: ২০ আগস্ট ভোট, তফসিল ঘোষণা ইসির গ্যাস সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে চট্টগ্রামে তীব্র লোডশেডিং, নগরের চেয়ে গ্রামে দুর্ভোগ বেশি রাষ্ট্র সংস্কারের সম্ভাবনা রাজনৈতিক-আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধের হাতে জিম্মি’— ড. ইফতেখারুজ্জামান জুলাই আন্দোলনের দুই বছর: কতটা পূরণ হলো প্রত্যাশা, কতটা রয়ে গেল অপূর্ণ? বিমানবন্দর নিরাপত্তায় ১৭ সদস্যের জাতীয় কমিটি পুনর্গঠন, আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিতের উদ্যোগ দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে দুই তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ: ৬ যুবকের আমৃত্যু কারাদণ্ড, প্রত্যেককে ১ লাখ টাকা জরিমানা

মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনতার যুদ্ধ, গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম: হাফিজ উদ্দিন

মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনতার যুদ্ধ, গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম: হাফিজ উদ্দিন

জেটিভি নিউজ বাংলা | ঢাকা |০৮ আগস্ট ২০২৬ ইং , শনিবার,সময় :সকাল ০৯:৫৭ মিনিট।  ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনতার যুদ্ধ, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ এবং মানুষের ভোটাধিকার, মানবিক মর্যাদা ও সম-অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। এটি কোনো রাজনৈতিক দলের যুদ্ধ ছিল না; বরং জনগণের রায়কে অগ্রাহ্য করে গণতন্ত্রকে পদদলিত করার ফলেই মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। শুক্রবার (৭ আগস্ট) ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবে বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার কোর্সেস ফাউন্ডেশন আয়োজিত বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার কোর্সেসের ৫৪তম কমিশনিং ও ফেলোশিপ ডে উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, স্বাধীনতার পর যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছিলেন, তাদের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরতে চাননি। ফলে স্বাধীনতা যুদ্ধের অসংখ্য ঘটনা, ত্যাগ ও বীরত্বগাথা এখনো যথাযথভাবে ইতিহাসে স্থান পায়নি। এসব ঘটনা এখনো সাধারণ মানুষের কাছে অজানা রয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করে তা জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়েছে যে, কেবল কয়েকটি ভাষণের মাধ্যমেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। অথচ প্রকৃত বাস্তবতা হলো—অসংখ্য তরুণ, সাধারণ পরিবারের সন্তান এবং সৈনিক জীবন উৎসর্গ করে দেশকে স্বাধীন করেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল গণতন্ত্র, মানবিক মর্যাদা, সম-অধিকার ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানার আহ্বান জানিয়ে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, কীভাবে দেশ স্বাধীন হয়েছে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন কী ছিল, তা নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করে একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।

‘দেশে আর কোনো স্বৈরশাসনের সৃষ্টি হওয়া উচিত নয়’

হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, দেশে আর কোনো স্বৈরশাসনের সৃষ্টি হওয়া উচিত নয়। সরকার ভুল করলে জনগণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তা সংশোধন করবে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা উচিত নয়। মুক্তিযুদ্ধকালীন বিভিন্ন ঘটনা স্মরণ করে তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি বলেন, শারীরিক যোগ্যতার কারণে অনেককে যুদ্ধে নেওয়া সম্ভব না হলে তারা কান্নায় ভেঙে পড়তেন। দেশের জন্য লড়াই করার সুযোগ চেয়ে কেউ কেউ নিজের গাড়ির সামনে পর্যন্ত শুয়ে পড়তেন, যাতে তাদের যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এসব দৃশ্য এক অনন্য ও গৌরবময় অধ্যায়।

১৯৭০ সালের গণরায় উপেক্ষা করেই মুক্তিযুদ্ধের সূচনা

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী জনগণের ভোটের প্রতি কোনো সম্মান দেখায়নি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এ দেশের মানুষ ছয় দফার ভিত্তিতে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে রায় দিয়েছিল। কিন্তু সেই গণরায় উপেক্ষা করা হয়। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানি বাহিনী নিরস্ত্র মানুষের ওপর গণহত্যা চালায় এবং ভয়াবহ নির্যাতন শুরু করে। এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকে জনগণকে আশ্বস্ত করা বা দিকনির্দেশনা দেওয়ার মতো কার্যকর পরিস্থিতি না থাকায় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআরের বাঙালি সৈনিক ও কর্মকর্তারা বিদ্রোহ ঘোষণা করে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করেন। হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ১৯৭১ সালের মার্চে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআরের সদস্যরা যদি পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করতেন, তাহলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস অন্যরকম হতে পারত। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ব্যাটালিয়নগুলো প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সীমিত সংখ্যক সৈনিকের নেতৃত্বে হাজার হাজার ছাত্র ও যুবক মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।

প্রায় ৮০ হাজার তরুণ যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন

হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, প্রায় পাঁচ হাজার সৈনিকের আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রায় ৮০ হাজার তরুণ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। একপর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা প্রায় এক লাখে পৌঁছে যায়। এসব যোদ্ধাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআরের সৈনিক ও কর্মকর্তারা। মুক্তিযুদ্ধের এসব ইতিহাস সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। এ সময় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অবদান ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কথা উল্লেখ করে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, বিশেষ করে মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা জাতিকে উদ্দীপ্ত করেছিল। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষেও ঘোষণা দিয়েছিলেন।

দেশের অস্তিত্ব ও মানুষের সম্মান রক্ষায় অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা কোনো ব্যক্তিগত কৃতিত্ব অর্জনের জন্য যুদ্ধ করেননি। দেশের অস্তিত্ব, মানুষের জীবন এবং মা-বোনের সম্মান রক্ষার জন্যই তারা অস্ত্র হাতে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী মনে করেছিল বাঙালিরা যুদ্ধ করতে পারবে না। কিন্তু ১৯৭১ সালে বাঙালি সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধারা তাদের সাহস, দক্ষতা ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করেন। নিজের যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রধান সেনাপতির নির্দেশে নতুন একটি ব্যাটালিয়ন গঠনের জন্য তিনি বিভিন্ন ইয়ুথ ক্যাম্প থেকে তরুণদের নিয়োগ করেছিলেন। সীমান্ত এলাকার ক্যাম্পগুলোতে হাজার হাজার স্কুল-কলেজপড়ুয়া ছাত্র দেশের জন্য যুদ্ধ করতে অপেক্ষা করছিলেন। কঠোর জীবনযাপন, সীমিত খাবার এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ সত্ত্বেও তারা যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার জন্য এবং দেশের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করতে উদগ্রীব ছিলেন। এ সময় স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এ দেশের অকুতোভয় সামরিক ও বেসামরিক মানুষের অবদান ও আত্মত্যাগের বিভিন্ন ঘটনা সবিস্তারে তুলে ধরেন তিনি।

বিদেশি সামরিক প্রশিক্ষকরাও বিস্মিত হতেন

হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, স্বাধীনতার পর বিদেশে সামরিক প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার সময় তিনি কামালপুরসহ বিভিন্ন যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসিকতার বর্ণনা দিতেন। এসব শুনে বিদেশি সামরিক প্রশিক্ষকরা বিস্মিত হতেন। তারা মন্তব্য করতেন, এ ধরনের আক্রমণ কোনো পেশাদার বাহিনীর পক্ষেও সম্ভব নয়। কেবল যারা দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত, তারাই এমন অসাধারণ সাহসিকতা দেখাতে পারে।

‘মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি’

স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি উল্লেখ করে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে দেশের মানুষ যে গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়েছে, সেটিও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। একই সঙ্গে রাজনীতিকদের আত্মসমালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। বক্তব্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, চারবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বন্দি হয়েছিলেন। পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকা শহরে তাকে তন্ন তন্ন করে খুঁজে এক আত্মীয়ের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করেছিল। এ সময় তিনি তার স্ত্রী প্রয়াত দিলারা হাফিজের কথাও স্মরণ করেন।

‘১৯৭২ সালে সেনাবাহিনী ছিল ছোট, কিন্তু মনোবল ছিল বড় শক্তি’

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কীভাবে গঠিত হয়েছিল, তার বর্ণনা দিয়ে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ছিল ছোট। কিন্তু দেশের জন্য জীবন উৎসর্গের অদম্য মানসিকতাই ছিল সেই বাহিনীর সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, বর্তমান ও আগামী প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলবে।

অনুষ্ঠানে যারা ছিলেন

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন মেজর এ মতিন চৌধুরী। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন এবং নৌবাহিনী প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। সূত্র: বাসস   জেটিভি নিউজ বাংলা

দেশ ও দশের কথা বলে.....

ট্যাগস

জনপ্রিয় সংবাদ

মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনতার যুদ্ধ, গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম: হাফিজ উদ্দিন

মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনতার যুদ্ধ, গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম: হাফিজ উদ্দিন

আপডেট সময় ৬ মিনিট আগে

মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনতার যুদ্ধ, গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম: হাফিজ উদ্দিন

জেটিভি নিউজ বাংলা | ঢাকা |০৮ আগস্ট ২০২৬ ইং , শনিবার,সময় :সকাল ০৯:৫৭ মিনিট।  ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনতার যুদ্ধ, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ এবং মানুষের ভোটাধিকার, মানবিক মর্যাদা ও সম-অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। এটি কোনো রাজনৈতিক দলের যুদ্ধ ছিল না; বরং জনগণের রায়কে অগ্রাহ্য করে গণতন্ত্রকে পদদলিত করার ফলেই মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। শুক্রবার (৭ আগস্ট) ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবে বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার কোর্সেস ফাউন্ডেশন আয়োজিত বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার কোর্সেসের ৫৪তম কমিশনিং ও ফেলোশিপ ডে উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, স্বাধীনতার পর যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছিলেন, তাদের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরতে চাননি। ফলে স্বাধীনতা যুদ্ধের অসংখ্য ঘটনা, ত্যাগ ও বীরত্বগাথা এখনো যথাযথভাবে ইতিহাসে স্থান পায়নি। এসব ঘটনা এখনো সাধারণ মানুষের কাছে অজানা রয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করে তা জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়েছে যে, কেবল কয়েকটি ভাষণের মাধ্যমেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। অথচ প্রকৃত বাস্তবতা হলো—অসংখ্য তরুণ, সাধারণ পরিবারের সন্তান এবং সৈনিক জীবন উৎসর্গ করে দেশকে স্বাধীন করেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল গণতন্ত্র, মানবিক মর্যাদা, সম-অধিকার ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানার আহ্বান জানিয়ে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, কীভাবে দেশ স্বাধীন হয়েছে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন কী ছিল, তা নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করে একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।

‘দেশে আর কোনো স্বৈরশাসনের সৃষ্টি হওয়া উচিত নয়’

হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, দেশে আর কোনো স্বৈরশাসনের সৃষ্টি হওয়া উচিত নয়। সরকার ভুল করলে জনগণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তা সংশোধন করবে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা উচিত নয়। মুক্তিযুদ্ধকালীন বিভিন্ন ঘটনা স্মরণ করে তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি বলেন, শারীরিক যোগ্যতার কারণে অনেককে যুদ্ধে নেওয়া সম্ভব না হলে তারা কান্নায় ভেঙে পড়তেন। দেশের জন্য লড়াই করার সুযোগ চেয়ে কেউ কেউ নিজের গাড়ির সামনে পর্যন্ত শুয়ে পড়তেন, যাতে তাদের যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এসব দৃশ্য এক অনন্য ও গৌরবময় অধ্যায়।

১৯৭০ সালের গণরায় উপেক্ষা করেই মুক্তিযুদ্ধের সূচনা

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী জনগণের ভোটের প্রতি কোনো সম্মান দেখায়নি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এ দেশের মানুষ ছয় দফার ভিত্তিতে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে রায় দিয়েছিল। কিন্তু সেই গণরায় উপেক্ষা করা হয়। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানি বাহিনী নিরস্ত্র মানুষের ওপর গণহত্যা চালায় এবং ভয়াবহ নির্যাতন শুরু করে। এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকে জনগণকে আশ্বস্ত করা বা দিকনির্দেশনা দেওয়ার মতো কার্যকর পরিস্থিতি না থাকায় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআরের বাঙালি সৈনিক ও কর্মকর্তারা বিদ্রোহ ঘোষণা করে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করেন। হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ১৯৭১ সালের মার্চে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআরের সদস্যরা যদি পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করতেন, তাহলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস অন্যরকম হতে পারত। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ব্যাটালিয়নগুলো প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সীমিত সংখ্যক সৈনিকের নেতৃত্বে হাজার হাজার ছাত্র ও যুবক মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।

প্রায় ৮০ হাজার তরুণ যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন

হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, প্রায় পাঁচ হাজার সৈনিকের আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রায় ৮০ হাজার তরুণ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। একপর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা প্রায় এক লাখে পৌঁছে যায়। এসব যোদ্ধাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআরের সৈনিক ও কর্মকর্তারা। মুক্তিযুদ্ধের এসব ইতিহাস সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। এ সময় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অবদান ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কথা উল্লেখ করে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, বিশেষ করে মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা জাতিকে উদ্দীপ্ত করেছিল। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষেও ঘোষণা দিয়েছিলেন।

দেশের অস্তিত্ব ও মানুষের সম্মান রক্ষায় অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা কোনো ব্যক্তিগত কৃতিত্ব অর্জনের জন্য যুদ্ধ করেননি। দেশের অস্তিত্ব, মানুষের জীবন এবং মা-বোনের সম্মান রক্ষার জন্যই তারা অস্ত্র হাতে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী মনে করেছিল বাঙালিরা যুদ্ধ করতে পারবে না। কিন্তু ১৯৭১ সালে বাঙালি সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধারা তাদের সাহস, দক্ষতা ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করেন। নিজের যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রধান সেনাপতির নির্দেশে নতুন একটি ব্যাটালিয়ন গঠনের জন্য তিনি বিভিন্ন ইয়ুথ ক্যাম্প থেকে তরুণদের নিয়োগ করেছিলেন। সীমান্ত এলাকার ক্যাম্পগুলোতে হাজার হাজার স্কুল-কলেজপড়ুয়া ছাত্র দেশের জন্য যুদ্ধ করতে অপেক্ষা করছিলেন। কঠোর জীবনযাপন, সীমিত খাবার এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ সত্ত্বেও তারা যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার জন্য এবং দেশের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করতে উদগ্রীব ছিলেন। এ সময় স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এ দেশের অকুতোভয় সামরিক ও বেসামরিক মানুষের অবদান ও আত্মত্যাগের বিভিন্ন ঘটনা সবিস্তারে তুলে ধরেন তিনি।

বিদেশি সামরিক প্রশিক্ষকরাও বিস্মিত হতেন

হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, স্বাধীনতার পর বিদেশে সামরিক প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার সময় তিনি কামালপুরসহ বিভিন্ন যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসিকতার বর্ণনা দিতেন। এসব শুনে বিদেশি সামরিক প্রশিক্ষকরা বিস্মিত হতেন। তারা মন্তব্য করতেন, এ ধরনের আক্রমণ কোনো পেশাদার বাহিনীর পক্ষেও সম্ভব নয়। কেবল যারা দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত, তারাই এমন অসাধারণ সাহসিকতা দেখাতে পারে।

‘মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি’

স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি উল্লেখ করে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে দেশের মানুষ যে গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়েছে, সেটিও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। একই সঙ্গে রাজনীতিকদের আত্মসমালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। বক্তব্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, চারবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বন্দি হয়েছিলেন। পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকা শহরে তাকে তন্ন তন্ন করে খুঁজে এক আত্মীয়ের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করেছিল। এ সময় তিনি তার স্ত্রী প্রয়াত দিলারা হাফিজের কথাও স্মরণ করেন।

‘১৯৭২ সালে সেনাবাহিনী ছিল ছোট, কিন্তু মনোবল ছিল বড় শক্তি’

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কীভাবে গঠিত হয়েছিল, তার বর্ণনা দিয়ে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ছিল ছোট। কিন্তু দেশের জন্য জীবন উৎসর্গের অদম্য মানসিকতাই ছিল সেই বাহিনীর সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, বর্তমান ও আগামী প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলবে।

অনুষ্ঠানে যারা ছিলেন

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন মেজর এ মতিন চৌধুরী। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন এবং নৌবাহিনী প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। সূত্র: বাসস   জেটিভি নিউজ বাংলা

দেশ ও দশের কথা বলে.....