জেটিভি নিউজ বাংলা
তারিখ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ ইং সময়: ১০:১৩ পূর্বাহ্নজলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে অভ্যন্তরীণ অভিবাসন: শহরগুলো কতটা প্রস্তুত
খুলনা শহরে এসে রিকশা চালানোর কোনো পরিকল্পনাই ছিল না আবদুল রহিমের। খুলনার একটি উপকূলীয় গ্রামের বাসিন্দা তিনি। কৃষিকাজ করেই চলত সংসার। কিন্তু একের পর এক জলবায়ুজনিত দুর্যোগ এবং কৃষি থেকে আয় কমে যাওয়ায় ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে তার জীবিকা। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে গ্রাম ছেড়ে খুলনা শহরে চলে আসেন। এখন রিকশা চালিয়েই পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করছেন। বরগুনার নওরীন আক্তারের গল্পও ভিন্ন নয়। তার ভাষ্য, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠা জীবনযাত্রার কারণে ঢাকায় চলে আসা ছাড়া সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না। বর্তমানে তিনি রাজধানীতে গৃহকর্মীর কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। আবদুল রহিম ও নওরীনের গল্প আসলে বাংলাদেশের হাজারো মানুষের বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। জলবায়ু পরিবর্তন এখন শুধু পরিবেশগত সংকট নয়; এটি মানুষের জীবিকা বদলে দিচ্ছে, গ্রাম থেকে শহরমুখী মানুষের স্রোত বাড়াচ্ছে এবং দেশের শহরগুলোর ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন শুধু কত মানুষ জলবায়ুর কারণে ঘরছাড়া হচ্ছে, সেই হিসাব করলেই চলবে না। বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই মানুষদের গ্রহণ ও পুনর্বাসনের জন্য বাংলাদেশের শহরগুলো কতটা প্রস্তুত? বিশ্বব্যাংকের গ্রাউন্ডসওয়েল প্রতিবেদনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৯৯ লাখ মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের অভ্যন্তরেই স্থানান্তরিত হতে পারে। এদিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বাধিক অভ্যন্তরীণ জলবায়ুজনিত অভিবাসীর দেশগুলোর একটি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর ২০২৫ সালের যৌথ মূল্যায়ন অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশের ভেতরেই বাস্তুচ্যুত হয়ে বসবাস করছেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সংখ্যা দিয়ে এই সংকটের প্রকৃত চিত্র বোঝা সম্ভব নয়। কারণ মানুষ সাধারণত একটিমাত্র কারণে ঘর ছাড়ে না। জলবায়ুর প্রভাবের পাশাপাশি কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং পারিবারিক সম্পর্ক—সবকিছু মিলিয়েই তারা নতুন স্থানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে কাউকে শুধু ‘জলবায়ু অভিবাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করাও সহজ নয়। এ কারণেই আন্তর্জাতিকভাবে এখনো ‘জলবায়ু অভিবাসী’ শব্দটির কোনো সর্বজনস্বীকৃত সংজ্ঞা গড়ে ওঠেনি। প্রথমে উপজেলা, পরে বড় শহরে আশ্রয় জলবায়ুর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অধিকাংশ মানুষ প্রথমে পাশের উপজেলা বা জেলা শহরে আশ্রয় নেন। পরে তাদের অনেকেই ঢাকাসহ খুলনা, চট্টগ্রামের মতো বড় শহরে চলে আসেন। কিন্তু শহরে এলেই যে নিরাপদ জীবন নিশ্চিত হয়, তা নয়। অনেক পরিবার বস্তি বা অনানুষ্ঠানিক বসতিতে থাকতে বাধ্য হয়। সেখানে পর্যাপ্ত বাসস্থান, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা শিক্ষার সুযোগ সীমিত। আবার অনেকেই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ পান, যেখানে আয় অনিশ্চিত এবং সামাজিক নিরাপত্তা প্রায় অনুপস্থিত। আবদুল রহিম শহরে এসে রোজগারের সুযোগ পেলেও হারিয়েছেন তার পুরোনো জীবন। নওরীন আক্তারের আয় কিছুটা বাড়লেও নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা এখনো অধরাই। তাদের অভিজ্ঞতা স্পষ্ট করে যে, জলবায়ুজনিত অভিবাসন শুধু গ্রামের সংকট নয়; এটি বাংলাদেশের শহরগুলোর ভবিষ্যৎও বদলে দিচ্ছে। ‘অভিবাসী নয়, শহরকে প্রস্তুত করতে হবে’ সুইসকন্ট্যাক্ট বাংলাদেশের টিম লিডার, নৃবিজ্ঞানী ও সুশাসন বিশেষজ্ঞ মো. আবুল বাসার মনে করেন, এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত শহরগুলোকে প্রস্তুত করা। তার ভাষায়, জলবায়ুজনিত স্থানান্তরকে শুধু মানবিক সংকট হিসেবে দেখলে হবে না; এটি নগর ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় অর্থনীতি এবং জনসেবা নিশ্চিত করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি বলেন, কোনো শহরে যদি সাশ্রয়ী আবাসন, কর্মসংস্থান, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে কাউকে ‘জলবায়ু অভিবাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করার তেমন অর্থ থাকে না। তার বক্তব্য, “মূল বিষয় হলো কে জলবায়ুর কারণে এসেছে, সেটা নয়; বরং আমাদের শহরগুলো ক্রমবর্ধমান মানুষের চাপ সামাল দেওয়ার মতো প্রস্তুত কিনা।” নীতিমালা আছে, বাস্তবায়ন দুর্বল অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ২০২১ সালে জাতীয় কৌশল গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি জলবায়ু অভিযোজন, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং অভিবাসন ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশেষ করে স্থানীয় সরকার পর্যায়ে এসব উদ্যোগের বাস্তবায়ন এখনো দুর্বল। অধিকাংশ পৌরসভার অর্থ ও জনবল সীমিত। এরই মধ্যে অবকাঠামো ও জনসেবার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া দ্বিতীয় সারির শহরগুলো ভবিষ্যতের এই জনস্রোত সামাল দিতে হিমশিম খেতে পারে। মানুষকে নয়, শহরকেও প্রস্তুত করতে হবে বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক দশকে জলবায়ুজনিত অভিবাসন বাংলাদেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন-চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে। তাই শুধু কত মানুষ স্থানান্তরিত হচ্ছে, সেই হিসাব রাখলেই হবে না; নগর পরিকল্পনা, আবাসন, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, নিরাপদ পানি এবং স্যানিটেশন—সব ক্ষেত্রেই বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে পুরোনো বাসিন্দা ও নতুন আসা মানুষ উভয়েই নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন গড়ে তুলতে পারেন। আবদুল রহিম ও নওরীন আক্তারের গল্প মনে করিয়ে দেয়, জলবায়ুজনিত অভিবাসন এখন আর শুধু উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের সমস্যা নয়; এটি বাংলাদেশের শহরগুলোর বর্তমান বাস্তবতা। সবশেষে প্রশ্ন একটাই—কত মানুষ জলবায়ুর কারণে ঘর ছাড়ছে, সেটি নয়; বরং যারা ইতোমধ্যে শহরে চলে আসছেন, তাদের জন্য আমাদের শহরগুলো কতটা প্রস্তুত?জেটিভি নিউজ বাংলা
দেশ ও দশের কথা বলে....

ডেস্ক রিপোর্ট 


















