জেটিভি নিউজ বাংলা
তারিখ ২৫ জুন ২০২৬ ইং | রাত ৯:৪১ মিনিট।শ্যামলীর এক ফ্লোরে তিন হাসপাতাল, শিশুমৃত্যুর ঘটনার পর সামনে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য
রাজধানীর শ্যামলীতে অক্সিজেন লাইনে লিকেজের ঘটনায় এক শিশুর মৃত্যুর অভিযোগের পর সামনে এসেছে নতুন এক বিস্ময়কর তথ্য। যে ভবনে ঘটনাটি ঘটেছে, সেই ভবনের একই ফ্লোরে কাঁচের দেয়াল দিয়ে আলাদা কক্ষ তৈরি করে পাশাপাশি পরিচালিত হচ্ছে তিনটি জেনারেল হাসপাতাল। বিষয়টি হাসপাতাল পরিচালনার নীতিমালা, সেবার মান এবং তদারকি ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর মিরপুর রোডসংলগ্ন ‘রূপায়ণ শেলফোর্ড’ নামের ২০ তলা ভবনের সপ্তম তলায় পাশাপাশি কার্যক্রম চালাচ্ছে শ্যামলী বেবি কেয়ার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল, হাই কেয়ার অর্থোপেডিক্স অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল এবং সিটি কেয়ার জেনারেল হাসপাতালের একটি ওয়ার্ড। মঙ্গলবার (২৩ জুন) বিকেলে শ্যামলী বেবি কেয়ার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে অক্সিজেন লাইনে লিকেজের ঘটনায় একটি শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে। এরপর থেকেই হাসপাতালটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। একই ফ্লোরে তিন হাসপাতাল সপ্তম তলায় লিফট থেকে নামতেই দেখা যায় শ্যামলী বেবি কেয়ার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের প্রবেশদ্বার। ভেতরে রয়েছে হাসপাতালটির রিসেপশন। এর পাশেই আরেকটি দরজা দিয়ে প্রবেশ করা যায় হাই কেয়ার অর্থোপেডিক্স অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে। দুটি হাসপাতালকে আলাদা করেছে শুধু কাঁচের দেয়াল। একই ফ্লোরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টভাবে পরিচালিত হচ্ছে সিটি কেয়ার জেনারেল হাসপাতালের রোগী ওয়ার্ডও। বর্তমানে শ্যামলী বেবি কেয়ার হাসপাতালে কোনো রোগী না থাকলেও অন্য দুটি হাসপাতালে রোগী ভর্তি রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এভাবে গাদাগাদি করে হাসপাতাল পরিচালনা সেবার মান ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। তবে স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, হাসপাতাল স্থাপনের অনুমোদন দেওয়ার দায়িত্ব মূলত সিটি করপোরেশন, রাজউক ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার। একবার অনুমোদন পেয়ে কার্যক্রম শুরু করলে পরে তা বন্ধ করা আইনগতভাবে জটিল হয়ে পড়ে। কী ঘটেছিল শ্যামলী বেবি কেয়ারে হাসপাতালে ‘গ্যাস লিকেজ’ বা ‘অক্সিজেন সিলিন্ডার বিস্ফোরণ’-এর গুঞ্জন ছড়ালেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে। হাসপাতালটির রিসেপশনিস্ট সোহান শেখ জানান, ঘটনার সময় সেখানে মোট ছয়জন শিশু রোগী ছিল। তাদের মধ্যে তিনজন হাম আক্রান্ত ছিল। মারা যাওয়া শিশুটিও হাম আক্রান্ত ছিল এবং আগে থেকেই তার শারীরিক অবস্থা গুরুতর ছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে অক্সিজেন সরবরাহের জন্য কয়েকটি পৃথক লাইন ছিল, যার মধ্যে একটি লাইনে ছিদ্র বা লিকেজ দেখা দেয়। এর ফলে উচ্চচাপের কারণে শব্দ সৃষ্টি হয় এবং রোগীর স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তিনি বলেন, “এটি কোনো অক্সিজেন সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা নয়। লাইনে লিকেজ থেকে শব্দ হয়েছিল। পরে রোগীদের নিরাপত্তার জন্য অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়।” সোহান শেখ আরও জানান, ঘটনার পর স্বাস্থ্য অধিদফতরের একটি টিম হাসপাতালটি পরিদর্শন করেছে এবং কিছু নির্দেশনা দিয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে পুনরায় কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। একই ফ্লোরে একাধিক হাসপাতালের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “একই ফ্লোরে হাসপাতালগুলো রয়েছে ঠিকই, তবে এনআইসিইউসহ কিছু বিশেষ ইউনিট ভবনের অন্য ফ্লোরে পরিচালিত হয়।” শিশুর বাবার অভিযোগ মারা যাওয়া শিশু ফারিসের বাবা মো. ফারুক বলেন, তার সাড়ে চার মাস বয়সী সন্তান নিউমোনিয়াজনিত সমস্যার কারণে হাসপাতালে ভর্তি ছিল এবং চিকিৎসার পর অবস্থার উন্নতিও হচ্ছিল। তিনি বলেন, “বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত আমার বাচ্চা ভালো ছিল। কিন্তু সন্ধ্যার দিকে হঠাৎ অক্সিজেন লাইনের দিক থেকে একটি বিকট শব্দ হয়। এরপর সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। রোগীর স্বজনরা চিৎকার শুরু করে এবং শিশুদের দ্রুত বাইরে নেওয়ার চেষ্টা করে।” তার অভিযোগ, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রথমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক বলে জানালেও পরে শিশুদের সপ্তম তলা থেকে অষ্টম তলায় স্থানান্তর করা হয়। সেই সময়ই তার সন্তানের অবস্থার অবনতি ঘটে এবং পরে মৃত্যু হয়। ফারুক আরও জানান, ঘটনার পর তিনি মোহাম্মদপুর থানায় বিষয়টি অবহিত করেন। পুলিশ এসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে এবং সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে চাইলেও তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ফুটেজ দিতে পারেনি। তিনি বলেন, “পুলিশ জানিয়েছিল মামলা করলে ময়নাতদন্ত করতে হবে। কিন্তু আমার সাড়ে চার মাস বয়সী সন্তানের ময়নাতদন্ত করতে আমি রাজি হইনি। তাই মামলা করিনি। পরে রাতেই শিশুটির মরদেহ নিয়ে বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে চলে যাই।” অন্য শিশুদের অবস্থা স্থিতিশীল ঘটনার পর হাসপাতালে থাকা শিশুদের সিটি কেয়ার জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সিটি কেয়ার জেনারেল হাসপাতালের রিসেপশন কর্মকর্তা সাগর কুমার মোদক জানান, পাঁচজন শিশুকে সেখানে স্থানান্তর করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে তিনজন ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে। তিনি বলেন, “বাকি দুই শিশুর অবস্থাও ভালো। তারা স্থিতিশীল রয়েছে এবং আগামী এক-দুই দিনের মধ্যেই ছাড়পত্র পেতে পারে।” স্বাস্থ্য অধিদফতর যা বলছে স্বাস্থ্য অধিদফতরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান জানিয়েছেন, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে এবং শ্যামলী বেবি কেয়ার হাসপাতালের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, “অক্সিজেন লাইনে লিকেজের বিষয়টি বায়োমেডিক্যাল ও মেকানিক্যাল প্রকৌশলীদের মাধ্যমে পরীক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাদের ছাড়পত্র না পাওয়া পর্যন্ত হাসপাতালটির কার্যক্রম পুনরায় চালুর অনুমতি দেওয়া হবে না।” একই ফ্লোরে একাধিক হাসপাতাল পরিচালনার বিষয়ে তিনি বলেন, “হাসপাতাল কোথায় স্থাপিত হবে, সে সিদ্ধান্ত সাধারণত সিটি করপোরেশন, রাজউক ও অন্যান্য অনুমোদনকারী সংস্থা নেয়। তবে একই ফ্লোরে একাধিক হাসপাতাল থাকা আদর্শ পরিস্থিতি নয়। একটি হাসপাতালের কার্যক্রম অন্যটির সেবাকে প্রভাবিত করছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে।” তিনি আরও বলেন, “আইনের একটি সীমাবদ্ধতা হলো—একবার কোনো প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেয়ে কার্যক্রম শুরু করলে সেটি বন্ধ করা বা স্থানান্তর করা সহজ নয়। বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। তারপরও বিষয়টি আমাদের নজরে রয়েছে এবং আমরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি।” ঘটনাটি ঘিরে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। শিশুটির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে তদন্তের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে রয়েছে সংশ্লিষ্ট সবাই।জেটিভি নিউজ বাংলা
দেশ ও দশের কথা বলে....

ডেস্ক রিপোর্ট 






















