জেটিভি নিউজ বাংলা
তারিখ: ০৪ জুন ২০২৬ ইং,সময়: রাত ১১:০৫ মিনিটবন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবনে ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন করছে বাংলাদেশ ব্যাংক
দেশের বন্ধ ও অর্ধ-সচল শিল্প এবং সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবার উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বৃহস্পতিবার (৪ জুন) এ বিষয়ে একটি সার্কুলার জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, দেশে বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র কার্যকরী মূলধনের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে অথবা সীমিত পরিসরে পরিচালিত হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে স্বল্পসুদে অর্থায়নের মাধ্যমে পুনরায় উৎপাদনে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।তিন বছর মেয়াদি ঘূর্ণায়মান তহবিল
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তাবিত ‘ক্লোজড ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড সার্ভিস সেক্টর ফ্যাসিলিটেশন রিফাইন্যান্স স্কিম’-এর আওতায় তিন বছর মেয়াদি একটি ঘূর্ণায়মান (রিভলভিং) তহবিল গঠন করা হবে। তহবিলের মোট আকার হবে ২০ হাজার কোটি টাকা। এই তহবিলের অর্থ ব্যবহার করে বন্ধ বা আংশিকভাবে সচল শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকরী মূলধন সরবরাহ করা হবে, যাতে তারা পুনরায় উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করতে পারে।কেন নেওয়া হলো এই উদ্যোগ?
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় সংকট হলো কার্যকরী মূলধনের ঘাটতি। নগদ অর্থের অভাবে অনেক প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দিতে পারছে না, কাঁচামাল কিনতে পারছে না এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ প্রয়োজনীয় বিল পরিশোধেও ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে উৎপাদন কমে যাচ্ছে, কারখানা বন্ধ হয়ে পড়ছে এবং কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, অনেক ক্ষেত্রে কারখানার যন্ত্রপাতি ও উৎপাদন সক্ষমতা অক্ষুণ্ন থাকলেও শুধুমাত্র অর্থের সংকটের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রয়েছে। সাময়িক এই তারল্য সংকট দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ও কর্মসংস্থান সংকটে রূপ নিচ্ছে। নতুন তহবিল সেই পরিস্থিতি মোকাবিলার লক্ষ্যেই গঠন করা হচ্ছে।কারা পাবেন ঋণ সুবিধা?
এই স্কিমের আওতায় সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কার্যকরী মূলধনের অভাবে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে না পারা প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় শিল্পনীতির আওতাভুক্ত সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ সুবিধা পাবে। তবে রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ডিমড এক্সপোর্টার এবং বন্ধ কারখানা অধিগ্রহণ বা লিজ নিয়ে পুনরায় চালু করতে আগ্রহী বিনিয়োগকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।ঋণের শর্ত ও সুবিধা
এই তহবিল থেকে দেওয়া ঋণের সুদের হার সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংককে ৪ শতাংশ হারে সুদ পরিশোধ করবে। একজন ঋণগ্রহীতা বা একটি গ্রুপ সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবে। ঋণের মেয়াদ হবে এক বছর। তবে ব্যবসার অগ্রগতি সন্তোষজনক হলে ঋণ নবায়নের সুযোগ থাকবে। এছাড়া ছয় মাসের গ্রেস পিরিয়ড রাখা হয়েছে, ফলে ঋণ গ্রহণের পরপরই কিস্তি পরিশোধের চাপ তৈরি হবে না।ঋণের অর্থ কোথায় ব্যয় করা যাবে?
বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এই অর্থ শুধুমাত্র উৎপাদন ও ব্যবসা পুনরুদ্ধারের কাজে ব্যবহার করা যাবে। ঋণের অর্থ দিয়ে শ্রমিক-কর্মচারীদের সর্বোচ্চ চার মাসের বেতন-ভাতা পরিশোধ, কাঁচামাল ক্রয়, বিদ্যুৎ-গ্যাস ও অন্যান্য ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন এবং উৎপাদনসংক্রান্ত অন্যান্য ব্যয় মেটানো যাবে। তবে এই অর্থ কোনো বিদ্যমান ঋণ পরিশোধ, পুনঃতফসিল বা সমন্বয়ের কাজে ব্যবহার করা যাবে না। একই সঙ্গে ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান এবং সিআইবি তালিকাভুক্ত গ্রাহকরা এই সুবিধার বাইরে থাকবে।কর্মসংস্থান রক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব
এই স্কিমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে অগ্রাধিকার দেওয়া। ঋণের অর্থ থেকে সর্বোচ্চ চার মাসের বেতন সরাসরি শ্রমিকদের ব্যাংক হিসাব অথবা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টে পাঠানো হবে। নগদ অর্থ প্রদানের সুযোগ রাখা হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ধারণা, এর ফলে বন্ধ বা সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা দ্রুত উপকৃত হবে এবং কর্মসংস্থান সুরক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।অপব্যবহার রোধে কঠোর তদারকি
অতীতের বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচির অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে এই স্কিমে কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ঋণ অনুমোদনের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত উৎপাদন সক্ষমতা, বন্ধ হওয়ার কারণ এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই করা হবে। পাশাপাশি এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ অথবা সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠনের মাধ্যমে উৎপাদন সক্ষমতার প্রত্যয়ন গ্রহণ করতে হবে। ঋণের অর্থের ব্যবহার পর্যবেক্ষণের জন্য এসক্রো বা বিশেষ রাজস্ব হিসাবের মাধ্যমে অর্থ প্রবাহ তদারকি করা হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মিত বিক্রয় প্রতিবেদন জমা দিতে হবে এবং প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি পরিদর্শন করতে পারবে। অর্থের অপব্যবহার প্রমাণিত হলে জরিমানাসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশের শিল্প খাতের প্রধান সমস্যা নতুন বিনিয়োগের অভাব নয়, বরং বিদ্যমান উৎপাদন সক্ষমতার অপূর্ণ ব্যবহার। অনেক কারখানা বন্ধ অথবা সীমিত উৎপাদনে পরিচালিত হচ্ছে। তাদের মতে, নতুন শিল্প স্থাপনের তুলনায় বিদ্যমান শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় সচল করা হলে দ্রুত ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব। সফল বাস্তবায়ন হলে এই তহবিলের মাধ্যমে বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় চালু হবে, উৎপাদন বাড়বে, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাবে এবং হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান সুরক্ষিত হবে। একই সঙ্গে সরবরাহ শৃঙ্খলে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হয়ে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সাময়িক তারল্য সংকটে থাকা প্রকৃত সক্ষম প্রতিষ্ঠানগুলোকে সঠিকভাবে নির্বাচন করতে না পারলে এই উদ্যোগের সুফল সীমিত হতে পারে। তাই স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কঠোর তদারকি নিশ্চিত করাই হবে এই কর্মসূচির সাফল্যের প্রধান শর্ত। সব মিলিয়ে, ২০ হাজার কোটি টাকার এই পুনঃঅর্থায়ন তহবিলকে শিল্প পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান রক্ষা এবং রপ্তানি খাতকে চাঙা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় উদ্যোগটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে নতুন গতি সঞ্চার হতে পারে।জেটিভি নিউজ বাংলা
সত্য প্রকাশে অঙ্গিকারবদ্ধ.....

ডেস্ক রিপোর্ট 



















