ঢাকা , রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
নোয়াখালীতে ছাত্রদল-আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সংঘর্ষ, মোটরসাইকেল ও কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ; আহত অন্তত ৬ যুদ্ধবিরতি কাগজে-কলমে, যুদ্ধ চলছে মাঠে: আন্তর্জাতিক আইন কি ব্যর্থ? ২৪ ঘণ্টায় হামে আরও ৩ জনের মৃত্যু, নতুন উপসর্গ শনাক্ত ১ হাজার ৩২ জনের কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগে সর্বোচ্চ গুরুত্ব, নতুন বাজেটে অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর বড় পরিকল্পনা বাংলাদেশ–তুরস্ক সম্পর্ক জোরদার, প্রতিরক্ষা ও আইসিটি খাতে যৌথ কাজের ঘোষণা পদ্মা নদী থেকে উদ্ধার করা হলো ঢাকাগামী ‘এসবি সুপার ডিলাক্স’ বাস, নেই কোনো প্রাণহানির খবর প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ঠ জনজীবন, বাড়ছে অসুস্থতা বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবনে ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন করছে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশ্বখ্যাত গ্রাফিক নভেল ‘পার্সেপোলিস’-এর স্রষ্টা মারজান সাত্রাপি আর নেই ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত করতে প্রতিনিধি পরিষদে প্রস্তাব পাস

পর্দার আড়ালের অদৃশ্য শক্তি নাকি রাজনৈতিক বাস্তবতা? বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নতুন বিতর্ক

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ০৮:৩০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬
  • ১১ বার পড়া হয়েছে

জেটিভি নিউজ বাংলা

তারিখ: ২৯ মে ২০২৬ ইং, সময়: সকাল ৮:৩০ মিনিট।  

ডিপ স্টেট: পর্দার আড়ালের অদৃশ্য শক্তি নাকি রাজনৈতিক বাস্তবতা? বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নতুন বিতর্ক

দেশ-বিদেশের রাজনীতিতে বহুল আলোচিত ও রহস্যঘেরা একটি শব্দ— ‘ডিপ স্টেট’ বা গুপ্ত শক্তি। এমন এক অদৃশ্য ক্ষমতাকাঠামো, যাকে অনেকেই রাজনীতির পর্দার আড়ালের খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনা করেন। বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলোতে সামরিক, বেসামরিক আমলা, গোয়েন্দা সংস্থা ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই শক্তি নিজ দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও প্রভাব বিস্তার করে বলে ধারণা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও ‘ডিপ স্টেট’ শব্দটি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। টেলিভিশন টকশো, সেমিনার এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দৃশ্যমান রাষ্ট্রকাঠামো ও নির্বাচিত সরকারের আড়ালে থেকে কাজ করা প্রভাবশালী, স্বার্থান্বেষী ও গোপন নেটওয়ার্কই হলো ‘ডিপ স্টেট’।

পর্দার আড়ালের ক্ষমতার কেন্দ্র

আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান কিংবা নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তিত হয়, সংসদে আসে নতুন নেতৃত্ব, বদলে যায় প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, নতুন সরকার পুরোনো ক্ষমতাকাঠামোর বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারে না। বিশ্লেষকদের মতে, এই অদৃশ্য শক্তিগুলোই অনেক সময় নির্ধারণ করে দেয় কোন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হবে এবং কোনটি প্রশাসনিক ফাইলে আটকে থাকবে। তাদের দাবি, নিজেদের কায়েমি স্বার্থ ও প্রভাব ধরে রাখতে এসব গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় নীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। কোনও সরকার এই ব্যবস্থার বাইরে যেতে চাইলে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র কিংবা দেশি-বিদেশি প্রভাবশালী সংস্থার অদৃশ্য বাধার মুখে পড়তে পারে। তখনই সামনে আসে প্রশ্ন— রাষ্ট্রের প্রকৃত ক্ষমতা কি নির্বাচিত সরকারের হাতে, নাকি পর্দার আড়ালের কোনও শক্তির কাছে? তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ডিপ স্টেট তত্ত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে তখনই, যখন তারা ক্ষমতার বাইরে থাকে। বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, চব্বিশের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনেও দেশি-বিদেশি ডিপ স্টেটের সমীকরণ কাজ করেছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ডিপ স্টেটের ভিন্ন বাস্তবতা

পশ্চিমা বিশ্ব বা পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশে সামরিক-বেসামরিক গোয়েন্দা বা করপোরেট জোটের একক আধিপত্য সবসময় দৃশ্যমান না হলেও, সংশ্লিষ্টদের মতে দেশের প্রেক্ষাপটে ডিপ স্টেটের একটি নিজস্ব চরিত্র রয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ডিপ স্টেট বলতে কোনও একক সংস্থাকে বোঝায় না। বরং দলীয়করণ হওয়া আমলাতন্ত্র, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, রাজনৈতিক সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী বা অলিগার্ক এবং বিচার বিভাগের একটি প্রভাবশালী অংশের গোপন সমন্বয়কে বোঝানো হয়। এই গোষ্ঠী দৃশ্যমান সরকারের আড়ালে থেকে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে বলে অভিযোগ রয়েছে। ‘ওয়ান ইলেভেন’-এর দুই বছর এবং আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে এই শক্তি রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর গভীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক। তাদের মতে, ভোট ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বাইরে থেকেও দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রব্যবস্থা সচল রাখতে এই প্রভাবশালী কাঠামো কার্যকর ছিল। তারা আরও বলেন, আওয়ামী লীগের শাসনামল সরাসরি সামরিক শাসন না হলেও আমলাতন্ত্র, পুলিশ, র‌্যাব, গোয়েন্দা সংস্থা, নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগের দলীয়করণের ফলে অনির্বাচিত কর্মকর্তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় সরকারের পক্ষে কাজ করেছে। বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনগুলোও এই কাঠামোর যৌথ প্রভাবের ফল।

গণঅভ্যুত্থান ও ডিপ স্টেটের প্রতিরোধের অভিযোগ

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকেই ‘ডিপ স্টেট’ শব্দটির ব্যবহার সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে। সরকার বিভিন্ন খাতে সংস্কার কার্যক্রম শুরু করলে প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে থেকে প্রতিরোধের অভিযোগ ওঠে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ধীরগতি, ফাইল আটকে রাখা এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির মতো ঘটনাকে অনেকে ‘ডিপ স্টেটের প্রতিরোধ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকিং খাত, বিদ্যুৎ খাত এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণকারী অর্থনৈতিক সিন্ডিকেটও ডিপ স্টেটের অংশ হিসেবে কাজ করতে পারে। অর্থপাচারকারী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর প্রভাব ধরে রাখে বলে অভিযোগ রয়েছে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়া এবং প্রশাসনে একাধিক রদবদল সত্ত্বেও নিচের স্তরে স্থবিরতা তৈরি হওয়াকে অনেকেই প্রাতিষ্ঠানিক সিন্ডিকেটের গভীর শিকড়ের প্রমাণ হিসেবে দেখছেন।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সামরিক-বেসামরিক ডিপ স্টেটের গোড়াপত্তন ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সালের দীর্ঘ সামরিক শাসনামলে। সে সময় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের তুলনায় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ও সিভিল আমলারা রাষ্ট্র পরিচালনায় অধিক প্রভাবশালী ছিল। ১৯৯০ সালের পর গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ফিরলেও রাজনৈতিক দলগুলোর কায়েমি স্বার্থের কারণে সেই কাঠামো পুরোপুরি ভাঙেনি। বরং সময়ের সঙ্গে এটি আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং এতে যুক্ত হয়েছে অর্থপাচারকারী ও লুটেরা গোষ্ঠী। বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক লুট বা মেগা প্রকল্পের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত কিছু বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী রাজনৈতিক ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে এবং সরকারের নীতিকে প্রভাবিত করার সক্ষমতা রাখে।

সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের বক্তব্য

গত ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় দলটির মুখপাত্র ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ‘ডিপ স্টেট’ প্রসঙ্গে বক্তব্য দেন। তিনি দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের শুরুর দিকে কিছু প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান ও দেশি-বিদেশি শক্তি এমন প্রস্তাব দিয়েছিল। আসিফ মাহমুদ বলেন, এই ‘ডিপ স্টেট’ কোনও একক গোষ্ঠী নয়; বরং দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন শক্তির সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রভাববলয়। তবে তিনি নির্দিষ্ট কোনও গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করেননি। তার এই বক্তব্য পরবর্তীতে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের মূল্যায়ন

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও চিন্তক ফরহাদ মজহার বিভিন্ন বক্তব্যে বলেন, ডিপ স্টেট হলো এমন এক স্থায়ী বন্দোবস্ত, যা সংবিধান, আমলাতন্ত্র, করপোরেট পুঁজি এবং বিদেশি শক্তির সমন্বয়ে গঠিত। তার মতে, বাংলাদেশ নতুন সাংবিধানিক কাঠামো বা নতুন গণপরিষদের মাধ্যমে পুরোনো বন্দোবস্ত ভেঙে না ফেললে সরকার পরিবর্তন হলেও ক্ষমতার প্রকৃত চাবিকাঠি ডিপ স্টেটের হাতেই থেকে যাবে। অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল বলেন, সরকার বদলালেও রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী অদৃশ্য শক্তিগুলো প্রায়শই অপরিবর্তিত থাকে। কখনও তারা প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, কখনও আমলাতন্ত্র, কখনও শক্তিশালী মিডিয়া বা আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে কাজ করে। তার ভাষায়, “ডিপ স্টেট ধারণাটি শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের প্রায় সব দেশেই কোনও না কোনওভাবে বিদ্যমান।” মাসুদ কামালের মতে, ডিপ স্টেট মানেই সরকার নয়; বরং সরকারের বাইরে থেকেও যারা রাষ্ট্র পরিচালনা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তাদের একটি অদৃশ্য শক্তি বা কাঠামো। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে ডিপ স্টেটের চরিত্র আরও বহুমাত্রিক। এখানে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, বড় ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন ক্ষমতাকেন্দ্র অনেক সময় নেপথ্যে থেকে সরকার গঠন ও পরিচালনায় প্রভাব বিস্তার করে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ইউনূস সরকারের উত্থান কিংবা আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পেছনেও বিভিন্ন ধরনের অদৃশ্য শক্তির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

ডিপ স্টেট— বাস্তবতা নাকি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব?

বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, ডিপ স্টেট কোনও কাল্পনিক বিষয় নয় এবং অনেক ক্ষেত্রে এর বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। যেকোনও দেশের স্থায়ী আমলাতন্ত্র ও গোয়েন্দা সংস্থার নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ থাকে। তারা দীর্ঘমেয়াদি নীতি, বিশেষ করে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতি বজায় রাখতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। তবে এর বিপরীত মতও রয়েছে। সমালোচকদের মতে, অনেক সময় ব্যর্থ বা জনতুষ্টিবাদী রাজনীতিকরা নিজেদের ভুল নীতি, অযোগ্যতা কিংবা রাজনৈতিক ব্যর্থতা আড়াল করতে ‘ডিপ স্টেট’ তত্ত্বকে ব্যবহার করেন। জনগণের সহানুভূতি অর্জন কিংবা দায় এড়াতেও এই শব্দটি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়— ডিপ স্টেট কি সত্যিই রাষ্ট্রের পর্দার আড়ালের ক্ষমতাকাঠামো, নাকি অনেক ক্ষেত্রে এটি কেবল রাজনৈতিক বয়ানের অংশ? সেই বিতর্কই এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।    

 জেটিভি নিউজ বাংলা

সত্য প্রকাশে অঙ্গিকারবদ্ধ....

ট্যাগস

জনপ্রিয় সংবাদ

নোয়াখালীতে ছাত্রদল-আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সংঘর্ষ, মোটরসাইকেল ও কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ; আহত অন্তত ৬

পর্দার আড়ালের অদৃশ্য শক্তি নাকি রাজনৈতিক বাস্তবতা? বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নতুন বিতর্ক

আপডেট সময় ০৮:৩০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬

জেটিভি নিউজ বাংলা

তারিখ: ২৯ মে ২০২৬ ইং, সময়: সকাল ৮:৩০ মিনিট।  

ডিপ স্টেট: পর্দার আড়ালের অদৃশ্য শক্তি নাকি রাজনৈতিক বাস্তবতা? বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নতুন বিতর্ক

দেশ-বিদেশের রাজনীতিতে বহুল আলোচিত ও রহস্যঘেরা একটি শব্দ— ‘ডিপ স্টেট’ বা গুপ্ত শক্তি। এমন এক অদৃশ্য ক্ষমতাকাঠামো, যাকে অনেকেই রাজনীতির পর্দার আড়ালের খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনা করেন। বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলোতে সামরিক, বেসামরিক আমলা, গোয়েন্দা সংস্থা ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই শক্তি নিজ দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও প্রভাব বিস্তার করে বলে ধারণা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও ‘ডিপ স্টেট’ শব্দটি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। টেলিভিশন টকশো, সেমিনার এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দৃশ্যমান রাষ্ট্রকাঠামো ও নির্বাচিত সরকারের আড়ালে থেকে কাজ করা প্রভাবশালী, স্বার্থান্বেষী ও গোপন নেটওয়ার্কই হলো ‘ডিপ স্টেট’।

পর্দার আড়ালের ক্ষমতার কেন্দ্র

আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান কিংবা নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তিত হয়, সংসদে আসে নতুন নেতৃত্ব, বদলে যায় প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, নতুন সরকার পুরোনো ক্ষমতাকাঠামোর বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারে না। বিশ্লেষকদের মতে, এই অদৃশ্য শক্তিগুলোই অনেক সময় নির্ধারণ করে দেয় কোন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হবে এবং কোনটি প্রশাসনিক ফাইলে আটকে থাকবে। তাদের দাবি, নিজেদের কায়েমি স্বার্থ ও প্রভাব ধরে রাখতে এসব গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় নীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। কোনও সরকার এই ব্যবস্থার বাইরে যেতে চাইলে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র কিংবা দেশি-বিদেশি প্রভাবশালী সংস্থার অদৃশ্য বাধার মুখে পড়তে পারে। তখনই সামনে আসে প্রশ্ন— রাষ্ট্রের প্রকৃত ক্ষমতা কি নির্বাচিত সরকারের হাতে, নাকি পর্দার আড়ালের কোনও শক্তির কাছে? তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ডিপ স্টেট তত্ত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে তখনই, যখন তারা ক্ষমতার বাইরে থাকে। বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, চব্বিশের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনেও দেশি-বিদেশি ডিপ স্টেটের সমীকরণ কাজ করেছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ডিপ স্টেটের ভিন্ন বাস্তবতা

পশ্চিমা বিশ্ব বা পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশে সামরিক-বেসামরিক গোয়েন্দা বা করপোরেট জোটের একক আধিপত্য সবসময় দৃশ্যমান না হলেও, সংশ্লিষ্টদের মতে দেশের প্রেক্ষাপটে ডিপ স্টেটের একটি নিজস্ব চরিত্র রয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ডিপ স্টেট বলতে কোনও একক সংস্থাকে বোঝায় না। বরং দলীয়করণ হওয়া আমলাতন্ত্র, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, রাজনৈতিক সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী বা অলিগার্ক এবং বিচার বিভাগের একটি প্রভাবশালী অংশের গোপন সমন্বয়কে বোঝানো হয়। এই গোষ্ঠী দৃশ্যমান সরকারের আড়ালে থেকে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে বলে অভিযোগ রয়েছে। ‘ওয়ান ইলেভেন’-এর দুই বছর এবং আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে এই শক্তি রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর গভীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক। তাদের মতে, ভোট ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বাইরে থেকেও দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রব্যবস্থা সচল রাখতে এই প্রভাবশালী কাঠামো কার্যকর ছিল। তারা আরও বলেন, আওয়ামী লীগের শাসনামল সরাসরি সামরিক শাসন না হলেও আমলাতন্ত্র, পুলিশ, র‌্যাব, গোয়েন্দা সংস্থা, নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগের দলীয়করণের ফলে অনির্বাচিত কর্মকর্তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় সরকারের পক্ষে কাজ করেছে। বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনগুলোও এই কাঠামোর যৌথ প্রভাবের ফল।

গণঅভ্যুত্থান ও ডিপ স্টেটের প্রতিরোধের অভিযোগ

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকেই ‘ডিপ স্টেট’ শব্দটির ব্যবহার সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে। সরকার বিভিন্ন খাতে সংস্কার কার্যক্রম শুরু করলে প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে থেকে প্রতিরোধের অভিযোগ ওঠে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ধীরগতি, ফাইল আটকে রাখা এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির মতো ঘটনাকে অনেকে ‘ডিপ স্টেটের প্রতিরোধ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকিং খাত, বিদ্যুৎ খাত এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণকারী অর্থনৈতিক সিন্ডিকেটও ডিপ স্টেটের অংশ হিসেবে কাজ করতে পারে। অর্থপাচারকারী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর প্রভাব ধরে রাখে বলে অভিযোগ রয়েছে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়া এবং প্রশাসনে একাধিক রদবদল সত্ত্বেও নিচের স্তরে স্থবিরতা তৈরি হওয়াকে অনেকেই প্রাতিষ্ঠানিক সিন্ডিকেটের গভীর শিকড়ের প্রমাণ হিসেবে দেখছেন।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সামরিক-বেসামরিক ডিপ স্টেটের গোড়াপত্তন ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সালের দীর্ঘ সামরিক শাসনামলে। সে সময় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের তুলনায় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ও সিভিল আমলারা রাষ্ট্র পরিচালনায় অধিক প্রভাবশালী ছিল। ১৯৯০ সালের পর গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ফিরলেও রাজনৈতিক দলগুলোর কায়েমি স্বার্থের কারণে সেই কাঠামো পুরোপুরি ভাঙেনি। বরং সময়ের সঙ্গে এটি আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং এতে যুক্ত হয়েছে অর্থপাচারকারী ও লুটেরা গোষ্ঠী। বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক লুট বা মেগা প্রকল্পের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত কিছু বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী রাজনৈতিক ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে এবং সরকারের নীতিকে প্রভাবিত করার সক্ষমতা রাখে।

সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের বক্তব্য

গত ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় দলটির মুখপাত্র ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ‘ডিপ স্টেট’ প্রসঙ্গে বক্তব্য দেন। তিনি দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের শুরুর দিকে কিছু প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান ও দেশি-বিদেশি শক্তি এমন প্রস্তাব দিয়েছিল। আসিফ মাহমুদ বলেন, এই ‘ডিপ স্টেট’ কোনও একক গোষ্ঠী নয়; বরং দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন শক্তির সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রভাববলয়। তবে তিনি নির্দিষ্ট কোনও গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করেননি। তার এই বক্তব্য পরবর্তীতে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের মূল্যায়ন

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও চিন্তক ফরহাদ মজহার বিভিন্ন বক্তব্যে বলেন, ডিপ স্টেট হলো এমন এক স্থায়ী বন্দোবস্ত, যা সংবিধান, আমলাতন্ত্র, করপোরেট পুঁজি এবং বিদেশি শক্তির সমন্বয়ে গঠিত। তার মতে, বাংলাদেশ নতুন সাংবিধানিক কাঠামো বা নতুন গণপরিষদের মাধ্যমে পুরোনো বন্দোবস্ত ভেঙে না ফেললে সরকার পরিবর্তন হলেও ক্ষমতার প্রকৃত চাবিকাঠি ডিপ স্টেটের হাতেই থেকে যাবে। অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল বলেন, সরকার বদলালেও রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী অদৃশ্য শক্তিগুলো প্রায়শই অপরিবর্তিত থাকে। কখনও তারা প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, কখনও আমলাতন্ত্র, কখনও শক্তিশালী মিডিয়া বা আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে কাজ করে। তার ভাষায়, “ডিপ স্টেট ধারণাটি শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের প্রায় সব দেশেই কোনও না কোনওভাবে বিদ্যমান।” মাসুদ কামালের মতে, ডিপ স্টেট মানেই সরকার নয়; বরং সরকারের বাইরে থেকেও যারা রাষ্ট্র পরিচালনা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তাদের একটি অদৃশ্য শক্তি বা কাঠামো। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে ডিপ স্টেটের চরিত্র আরও বহুমাত্রিক। এখানে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, বড় ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন ক্ষমতাকেন্দ্র অনেক সময় নেপথ্যে থেকে সরকার গঠন ও পরিচালনায় প্রভাব বিস্তার করে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ইউনূস সরকারের উত্থান কিংবা আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পেছনেও বিভিন্ন ধরনের অদৃশ্য শক্তির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

ডিপ স্টেট— বাস্তবতা নাকি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব?

বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, ডিপ স্টেট কোনও কাল্পনিক বিষয় নয় এবং অনেক ক্ষেত্রে এর বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। যেকোনও দেশের স্থায়ী আমলাতন্ত্র ও গোয়েন্দা সংস্থার নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ থাকে। তারা দীর্ঘমেয়াদি নীতি, বিশেষ করে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতি বজায় রাখতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। তবে এর বিপরীত মতও রয়েছে। সমালোচকদের মতে, অনেক সময় ব্যর্থ বা জনতুষ্টিবাদী রাজনীতিকরা নিজেদের ভুল নীতি, অযোগ্যতা কিংবা রাজনৈতিক ব্যর্থতা আড়াল করতে ‘ডিপ স্টেট’ তত্ত্বকে ব্যবহার করেন। জনগণের সহানুভূতি অর্জন কিংবা দায় এড়াতেও এই শব্দটি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়— ডিপ স্টেট কি সত্যিই রাষ্ট্রের পর্দার আড়ালের ক্ষমতাকাঠামো, নাকি অনেক ক্ষেত্রে এটি কেবল রাজনৈতিক বয়ানের অংশ? সেই বিতর্কই এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।    

 জেটিভি নিউজ বাংলা

সত্য প্রকাশে অঙ্গিকারবদ্ধ....