জেটিভি নিউজ বাংলা
তারিখ: ২৭ মে ২০২৬ ইং| সময়: রাত ১২:৩৫ মিনিট।কোরবানির বাজারে চাপ, বড় গরুতে আগ্রহ কম; তবু গ্রামীণ অর্থনীতিতে আশার আলো
নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে— এমন প্রত্যাশা ছিল ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে। তবে ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের অনিয়ম, খেলাপি ঋণের চাপ, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সেই প্রত্যাশা এখনো বাস্তবে রূপ নেয়নি। বরং এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কোরবানির বাজারে। রাজধানীর পশুর হাটগুলোতে পর্যাপ্ত পশুর সরবরাহ থাকলেও ক্রেতার উপস্থিতি তুলনামূলক কম। বিশেষ করে বড় গরুর বাজারে স্থবিরতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী,
এ বছর কোরবানির জন্য দেশে প্রস্তুত রয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার পশু। সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ১ লাখ। অর্থাৎ প্রায় ২২ লাখ পশু উদ্বৃত্ত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বাজার বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদদের অনেকেই মনে করছেন, বাস্তব চাহিদা সরকারি হিসাবের তুলনায় কম হতে পারে। গত বছর অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেই কোরবানি হয়েছিল প্রায় ৯১ লাখ পশু। অথচ ২০২৪ সালে বিক্রি হয়েছিল ১ কোটি ৪ লাখের বেশি পশু, যার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৬৯ হাজার কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে পশু বিক্রি অন্তত ১৩ লাখ কমে যাওয়ায় বাজারের আকারও নেমে আসে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ হাজার কোটি টাকায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে দেশের মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ। নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের পরিবারগুলো অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে দিচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ঈদকেন্দ্রিক ভোগব্যয়ে। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, মানুষের আর্থিক সক্ষমতা আগের মতো নেই। যারা আগে বড় গরু কোরবানি দিতেন তারা এখন মাঝারি গরুর দিকে ঝুঁকছেন। ছোট গরুর ক্রেতাদের কেউ ভাগে কোরবানি দেওয়ার চিন্তা করছেন, আবার কেউ ছাগল বা ভেড়ার দিকে যাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, খামারিরাও চাপে আছেন। পশুখাদ্য, ওষুধ ও পরিবহন খরচ বেড়েছে অনেক। অথচ বাজারে ক্রেতা কম থাকায় অনেককে কম লাভে কিংবা লোকসানে পশু বিক্রি করতে হতে পারে।বড় গরুর বাজারে ধসের শঙ্কা
রাজধানীর বিভিন্ন পশুর হাট ঘুরে দেখা গেছে, ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদা থাকলেও বড় গরুর বাজার অনেকটাই স্থবির। গত বছরের তুলনায় ছোট গরুর দামও বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। যে গরু গত বছর ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে, এবার তার দাম চাওয়া হচ্ছে ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা। জামালপুর থেকে খিলগাঁওয়ের শাহজাহানপুর হাটে সাতটি গরু নিয়ে আসা খামারি জামাল উদ্দিন বলেন, “৬০০ কেজির গরুর দাম ৫ লাখ টাকা চাচ্ছি, কিন্তু ক্রেতারা সাড়ে তিন লাখের বেশি বলতে চাইছে না। ট্রাক ভাড়াও গতবারের তুলনায় ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা বেড়েছে।” চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আমুলিয়া হাটে আসা ব্যাপারী মোবারক আলী জানান, কয়েক দিনে মাত্র ছয়টি গরু বিক্রি হয়েছে, তাও ছোট আকারের। বড় ও মাঝারি গরুর ক্রেতা খুবই কম। মেহেরপুরের খামারি রবিউল বলেন, “১৫টি গরু আনতে এবার ট্রাক ভাড়া পড়েছে ৪০ হাজার টাকা, যা গত বছরের তুলনায় ১০ হাজার টাকা বেশি।” চাপ শুধু পশুর বাজারে নয়, পুরো ঈদ অর্থনীতিতে বাংলাদেশে কোরবানিকেন্দ্রিক অর্থনীতির আকার এখন প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার বেশি বলে ধারণা করা হয়। এই অর্থনীতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে চামড়াশিল্প, মসলা, পরিবহন, রেফ্রিজারেটর, কোমল পানীয়, দই-মিষ্টি, কসাই, মৌসুমি শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসা। দেশে বছরে প্রায় ৩০ লাখ ইউনিট ফ্রিজ বিক্রি হয়, যার মধ্যে প্রায় ১২ লাখ ইউনিট বিক্রি হয় কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, এবার বিক্রি প্রত্যাশার তুলনায় কম। মসলার বাজারেও ঈদের সময় বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুধু মসলা ও পোশাক মিলিয়েই এ সময় প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। বাংলাদেশ সুইট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে দই-মিষ্টির বাজার ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি। কোরবানির ঈদে এই খাতের বিক্রি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। পাশাপাশি কোমল পানীয়র বিক্রিও প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে। ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানীর শপিংমলগুলোতেও ভিড় কম। বড় ব্র্যান্ডগুলো ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিলেও ক্রেতা তুলনামূলক কম দেখা যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হান বলেন, “নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে মানুষ এখন শৌখিন কেনাকাটা কমিয়ে দিচ্ছে। প্রয়োজনীয় ব্যয়ই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মুবিনা খন্দকার বলেন, “এখন শুধু ছাড় দিয়ে বিক্রি বাড়ানো সম্ভব নয়। মানুষের ক্রয়ক্ষমতার পাশাপাশি ভোক্তা আচরণও বদলে গেছে।” গ্রামীণ অর্থনীতিতে নগদ অর্থের প্রবাহ অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও কোরবানির সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নগদ অর্থের প্রবাহ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এম কে মুজেরি বলেন, “কোরবানির সময় শহর থেকে বিপুল অর্থ গ্রামে যায়। পশুর দাম সরাসরি গ্রামের খামারি ও কৃষকের হাতে পৌঁছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙা করে।” বিশেষজ্ঞদের মতে, পশু পরিবহন, হাট ব্যবস্থাপনা, কসাই, চামড়া সংগ্রহ, পরিবহন শ্রমিক ও পশুখাদ্য ব্যবসাসহ বিভিন্ন খাতে লাখ লাখ মানুষের অস্থায়ী কর্মসংস্থান হয়। ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহেও বড় উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। চলতি মে মাসের প্রথম ২৩ দিনে দেশে এসেছে প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রবাসী আয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে রেমিট্যান্স এসেছে ২৯৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৬ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই প্রবৃদ্ধি ৪১ দশমিক ৩১ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, প্রবাসীদের বাড়তি অর্থ পাঠানোর প্রবণতাই এই ইতিবাচক ধারার প্রধান কারণ।চামড়াশিল্পে সম্ভাবনা, তবে ঋণ সংকট বড় বাধা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোরবানির সবচেয়ে বড় অপূর্ণ সম্ভাবনা এখনো চামড়াশিল্পে। একসময় চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়ালেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে ৮০০ থেকে ৯০০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে। অন্যদিকে, চামড়া খাতে ঋণ বিতরণেও সংকট দেখা দিয়েছে। প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ২ হাজার কোটি টাকা খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। ফলে নতুন ঋণ পেতে হিমশিম খাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। চলতি বছর চামড়া খাতে ২২৮ কোটি ৫০ লাখ টাকার ঋণ বিতরণের লক্ষ্য থাকলেও ঈদের আগ পর্যন্ত নামমাত্র ঋণ বিতরণ হয়েছে। ব্যাংক সূত্র বলছে, খেলাপি ঋণের কারণেই অনেক আবেদন আটকে আছে।শেষ মুহূর্তের বাজারেই নির্ধারণ হবে চিত্র
অর্থনীতিবিদদের মতে, শেষ পর্যন্ত কোরবানির বাজার কতটা প্রাণ ফিরে পাবে তা নির্ভর করবে শেষ মুহূর্তের ক্রেতা উপস্থিতির ওপর। তবে বড় গরুর বাজারে চাপ, সীমিত ক্রয়ক্ষমতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে আগের মতো গতি ফিরবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তারপরও কোরবানির ঈদ শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়— এটি গ্রামীণ আয়, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, ভোগব্যয়, মৌসুমি কর্মসংস্থান ও নগদ অর্থপ্রবাহের এক বিশাল অর্থনৈতিক চক্র, যা এখনো দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির অন্যতম বড় চালিকাশক্তি।— জেটিভি নিউজ বাংলা
সত্য প্রকাশে অঙ্গিকারবদ্ধ....

স্টাফ রিপোর্টার 




















