ঢাকা , রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
নোয়াখালীতে ছাত্রদল-আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সংঘর্ষ, মোটরসাইকেল ও কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ; আহত অন্তত ৬ যুদ্ধবিরতি কাগজে-কলমে, যুদ্ধ চলছে মাঠে: আন্তর্জাতিক আইন কি ব্যর্থ? ২৪ ঘণ্টায় হামে আরও ৩ জনের মৃত্যু, নতুন উপসর্গ শনাক্ত ১ হাজার ৩২ জনের কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগে সর্বোচ্চ গুরুত্ব, নতুন বাজেটে অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর বড় পরিকল্পনা বাংলাদেশ–তুরস্ক সম্পর্ক জোরদার, প্রতিরক্ষা ও আইসিটি খাতে যৌথ কাজের ঘোষণা পদ্মা নদী থেকে উদ্ধার করা হলো ঢাকাগামী ‘এসবি সুপার ডিলাক্স’ বাস, নেই কোনো প্রাণহানির খবর প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ঠ জনজীবন, বাড়ছে অসুস্থতা বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবনে ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন করছে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশ্বখ্যাত গ্রাফিক নভেল ‘পার্সেপোলিস’-এর স্রষ্টা মারজান সাত্রাপি আর নেই ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত করতে প্রতিনিধি পরিষদে প্রস্তাব পাস

মৃত্যুতে উল্লাস নাকি মানবিকতার মৃত্যু? কারিনা কায়সারকে ঘিরে সোশ্যাল মিডিয়ার নির্মমতা নিয়ে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ১০:৪২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬
  • ৯ বার পড়া হয়েছে

জেটিভি নিউজ বাংলা

তারিখ: ২৫ মে ২০২৬ ইং | সময়: সোমবার, ১০:৪২ মিনিট।

মৃত্যুতে উল্লাস নাকি মানবিকতার মৃত্যু? কারিনা কায়সারকে ঘিরে সোশ্যাল মিডিয়ার নির্মমতা নিয়ে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

ছবি সংগৃহীত মানুষের মৃত্যুতে মানুষ কাঁদবে—এটাই মানবতার চিরন্তন রূপ। মৃত ব্যক্তি আত্মীয় কিংবা বন্ধু না হলেও তার মৃত্যু মানুষকে ব্যথিত করে। এমনকি সম্পূর্ণ অপরিচিত কারও মৃত্যুসংবাদেও আমাদের অবচেতন মন থেকে উচ্চারিত হয়—‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’। দীর্ঘদিন ধরে এটাই ছিল সমাজের মানবিক রীতি ও সহমর্মিতার সংস্কৃতি। কিন্তু কোনো মৃত্যু যদি কারও আনন্দের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যদি একজন মানুষের চলে যাওয়া উল্লাসের উপলক্ষ হয়—তাহলে সেটি শুধু সামাজিক অবক্ষয় নয়, বরং গভীর মনস্তাত্ত্বিক সংকটেরও ইঙ্গিত দেয়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রবণতার নাম ‘শ্যাডনফ্রয়েড’ (Schadenfreude)। জার্মান শব্দ ‘শ্যাডন’ অর্থ ক্ষতি এবং ‘ফ্রয়েড’ অর্থ আনন্দ। অর্থাৎ অন্যের ক্ষতি, বিপদ কিংবা পতনে অবচেতনভাবে আনন্দ পাওয়া বা এক ধরনের তৃপ্তি অনুভব করাই হলো শ্যাডনফ্রয়েড। সহজভাবে বললে, কোনো জনপ্রিয় বা সফল ব্যক্তি বিতর্কে জড়ালে বা তার জীবনে বিপর্যয় নেমে এলে সাধারণ মানুষের মনে যে গোপন সন্তুষ্টি বা ‘বেশ হয়েছে’ ধরনের অনুভূতি তৈরি হয়, সেটিই এই মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা। সামাজিক মনোবিজ্ঞানী ড. রিচার্ড এইচ. স্মিথের মতে, এই অনুভূতির পেছনে কাজ করে সামাজিক তুলনা এবং আত্মমর্যাদার ঘাটতি। মানুষ যখন নিজের জীবন নিয়ে অসন্তুষ্ট থাকে বা হীনম্মন্যতায় ভোগে, তখন অন্যের পতন তার মনে সাময়িক স্বস্তি আনে। অবচেতন মন তখন মনে করে—‘যাক, সে-ও আর আমার চেয়ে ভালো অবস্থানে নেই।’ তবে পরিস্থিতি শুধু শ্যাডনফ্রয়েডে সীমাবদ্ধ নেই। মনোবিজ্ঞানে আরও একটি কঠোর ধারণা রয়েছে—‘স্যাডিজম’। শ্যাডনফ্রয়েডে মানুষ দূর থেকে অন্যের কষ্ট দেখে আনন্দ পায়, কিন্তু স্যাডিজমে মানুষ নিজেই সক্রিয়ভাবে কষ্ট দেওয়ার মধ্য দিয়ে বিকৃত আনন্দ লাভ করে। অপমান, নির্যাতন কিংবা মানসিক আঘাত দেওয়া—এসবই এর অংশ। কারিনা কায়সারের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে যেসব ট্রল, কটূক্তি এবং প্রকাশ্য উল্লাস দেখা গেছে, তা নতুন করে এই প্রশ্ন তুলেছে—আমরা কি শুধু শ্যাডনফ্রয়েডে আক্রান্ত, নাকি ধীরে ধীরে স্যাডিস্টিক আচরণের দিকেও এগিয়ে যাচ্ছি? এই মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ শুরু হয়েছিল কারিনা কায়সার অসুস্থ হওয়ার পর থেকেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাকে এবং তার পরিবারকে নিয়ে চলতে থাকে নির্মম মন্তব্য ও আক্রমণ। মৃত্যুর পরও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি; বরং অনেকেই প্রকাশ্যে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ লিখে নিজেদের খুশির প্রকাশ করেছেন। তবে প্রশ্ন উঠছে—কারিনা কায়সারের অপরাধ কী ছিল? একটি পক্ষের দাবি, তিনি জুলাই আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন, তাই রাজনৈতিক মতবিরোধ থেকেই তার বিরুদ্ধে এই আক্রোশ। অসুস্থ হওয়ার পর ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে তাকে প্রাণবন্ত ও হাসিখুশি হিসেবেই দেখা যায়। তার মা এক ভিডিওতে ব্যাখ্যা করেছিলেন, আন্দোলনের সময় গণভবনের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় তারা হাতে থাকা সাধারণ ব্যাগ ও গয়না দেখিয়ে মজা করে বলেছিলেন—এসব যেন গণভবন থেকে নেওয়া হয়েছে। সেটি ছিল নিছক রসিকতা, বাস্তবে কোনো লুটপাটের ঘটনা নয়। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার আদালত সেই মুহূর্তকেই চূড়ান্ত রায়ে পরিণত করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্য একটি ভিডিওতে কারিনা কায়সার গণভবন লুট, মেট্রোরেলে আগুন, সংসদ ভবনে ভাঙচুর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যুরাল ধ্বংসের সমালোচনা করে বলেছিলেন—এসব দেশের সম্পদ, এগুলো নষ্ট করা উচিত হয়নি। নতুন দেশ গড়ার স্বপ্নের সঙ্গে এমন ধ্বংসযজ্ঞ সাংঘর্ষিক বলেও তিনি মন্তব্য করেছিলেন। সমালোচকদের দাবি, তার এই বক্তব্যের ইতিবাচক দিক উপেক্ষিত হয়েছে, অথচ একটি বিতর্কিত মুহূর্তই তাকে ঘিরে প্রধান আলোচনায় পরিণত হয়েছে। এই প্রসঙ্গে উঠে আসে অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফার একটি সাক্ষাৎকারের কথাও। প্রয়াত অভিনেতা হুমায়ুন ফরিদীকে নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন—‘আমি তার সমালোচনা করবো না। কারণ এখানে ওর হয়ে কথা বলার কেউ নেই।’ বিচ্ছেদের পরও তিনি প্রয়াত ফরিদীকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেননি, কারণ মৃত্যুর পর একজন মানুষের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকে না। সমালোচকদের মতে, বর্তমান সমাজে সেই অনুপস্থিতিকেই অনেক সময় সবচেয়ে বড় সুযোগ হিসেবে দেখা হয়। মানুষ মনে করে—যিনি আর নেই, তাকে নিয়ে এখন যা খুশি বলা যায়। এই প্রবণতা শুধু মৃত ব্যক্তিকেই নয়, তার পরিবারকেও গভীর মানসিক আঘাতের মুখে ঠেলে দেয়। কারিনা কায়সারকে ঘিরে আরেকটি আলোচনার বিষয় ছিল তার সিনেমা ‘৩৬ ২৪ ৩৬’। সিনেমাটি মূলত ‘বডি শেমিং’ বা শারীরিক গঠন নিয়ে সামাজিক কটূক্তির বিরুদ্ধে ইতিবাচক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে বলে জানা যায়। কারিনা নিজেও কিছুটা স্থূলকায় ছিলেন এবং বাস্তব জীবনেও তাকে কম ট্রল বা বুলিংয়ের মুখোমুখি হতে হয়নি বলে অনেকে মনে করেন। তিনি ছিলেন সাবেক জাতীয় ফুটবলার কায়সার হামিদের মেয়ে এবং দাবার কিংবদন্তি রানী হামিদের নাতনি। পারিবারিক পরিচয়ের পাশাপাশি নিজস্ব চেষ্টায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর, ইউটিউবার ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবে তিনি পরিচিতি গড়ে তুলেছিলেন। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, অনেক সময় অন্যের সাফল্য, জনপ্রিয়তা কিংবা সামাজিক অবস্থানও ঈর্ষা ও পরশ্রীকাতরতার জন্ম দেয়, যা পরে বিদ্বেষে রূপ নিতে পারে। ড. রিচার্ড স্মিথের তত্ত্ব অনুযায়ী, এই ঈর্ষাই কখনও কখনও অন্যের পতনে আনন্দ পাওয়ার অনুভূতিতে রূপ নেয়। রাজনৈতিক বিভাজন, সামাজিক হিংসা ও ব্যক্তিগত হতাশা মিলিয়ে সমাজকে এক বিপজ্জনক মানসিক অবস্থার দিকে ঠেলে দিতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণায় মনোবিজ্ঞানীরা এ ধরনের আচরণের জন্য ‘এভরিডে স্যাডিজম’ শব্দটি ব্যবহার করছেন। তাদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আড়ালে থাকা অনেক ট্রলকারী ক্লিনিক্যাল অর্থে মানসিক রোগী না হলেও, সামাজিক ও নৈতিক বিচারে তারা এক ধরনের গভীর মানবিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকটের প্রতিফলন বহন করেন। মানুষের মৃত্যু কি সহমর্মিতা জাগাবে, নাকি বিভাজন আর বিদ্বেষের নতুন উৎস হবে—এই প্রশ্নই এখন সমাজের সামনে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তথ্যসূত্র: লেখক—সাইকোলোজিস্ট    

জেটিভি নিউজ বাংলা

সত্য প্রকাশে অঙ্গিকারবদ্ধ....

ট্যাগস

জনপ্রিয় সংবাদ

নোয়াখালীতে ছাত্রদল-আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সংঘর্ষ, মোটরসাইকেল ও কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ; আহত অন্তত ৬

মৃত্যুতে উল্লাস নাকি মানবিকতার মৃত্যু? কারিনা কায়সারকে ঘিরে সোশ্যাল মিডিয়ার নির্মমতা নিয়ে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

আপডেট সময় ১০:৪২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬

জেটিভি নিউজ বাংলা

তারিখ: ২৫ মে ২০২৬ ইং | সময়: সোমবার, ১০:৪২ মিনিট।

মৃত্যুতে উল্লাস নাকি মানবিকতার মৃত্যু? কারিনা কায়সারকে ঘিরে সোশ্যাল মিডিয়ার নির্মমতা নিয়ে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

ছবি সংগৃহীত মানুষের মৃত্যুতে মানুষ কাঁদবে—এটাই মানবতার চিরন্তন রূপ। মৃত ব্যক্তি আত্মীয় কিংবা বন্ধু না হলেও তার মৃত্যু মানুষকে ব্যথিত করে। এমনকি সম্পূর্ণ অপরিচিত কারও মৃত্যুসংবাদেও আমাদের অবচেতন মন থেকে উচ্চারিত হয়—‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’। দীর্ঘদিন ধরে এটাই ছিল সমাজের মানবিক রীতি ও সহমর্মিতার সংস্কৃতি। কিন্তু কোনো মৃত্যু যদি কারও আনন্দের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যদি একজন মানুষের চলে যাওয়া উল্লাসের উপলক্ষ হয়—তাহলে সেটি শুধু সামাজিক অবক্ষয় নয়, বরং গভীর মনস্তাত্ত্বিক সংকটেরও ইঙ্গিত দেয়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রবণতার নাম ‘শ্যাডনফ্রয়েড’ (Schadenfreude)। জার্মান শব্দ ‘শ্যাডন’ অর্থ ক্ষতি এবং ‘ফ্রয়েড’ অর্থ আনন্দ। অর্থাৎ অন্যের ক্ষতি, বিপদ কিংবা পতনে অবচেতনভাবে আনন্দ পাওয়া বা এক ধরনের তৃপ্তি অনুভব করাই হলো শ্যাডনফ্রয়েড। সহজভাবে বললে, কোনো জনপ্রিয় বা সফল ব্যক্তি বিতর্কে জড়ালে বা তার জীবনে বিপর্যয় নেমে এলে সাধারণ মানুষের মনে যে গোপন সন্তুষ্টি বা ‘বেশ হয়েছে’ ধরনের অনুভূতি তৈরি হয়, সেটিই এই মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা। সামাজিক মনোবিজ্ঞানী ড. রিচার্ড এইচ. স্মিথের মতে, এই অনুভূতির পেছনে কাজ করে সামাজিক তুলনা এবং আত্মমর্যাদার ঘাটতি। মানুষ যখন নিজের জীবন নিয়ে অসন্তুষ্ট থাকে বা হীনম্মন্যতায় ভোগে, তখন অন্যের পতন তার মনে সাময়িক স্বস্তি আনে। অবচেতন মন তখন মনে করে—‘যাক, সে-ও আর আমার চেয়ে ভালো অবস্থানে নেই।’ তবে পরিস্থিতি শুধু শ্যাডনফ্রয়েডে সীমাবদ্ধ নেই। মনোবিজ্ঞানে আরও একটি কঠোর ধারণা রয়েছে—‘স্যাডিজম’। শ্যাডনফ্রয়েডে মানুষ দূর থেকে অন্যের কষ্ট দেখে আনন্দ পায়, কিন্তু স্যাডিজমে মানুষ নিজেই সক্রিয়ভাবে কষ্ট দেওয়ার মধ্য দিয়ে বিকৃত আনন্দ লাভ করে। অপমান, নির্যাতন কিংবা মানসিক আঘাত দেওয়া—এসবই এর অংশ। কারিনা কায়সারের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে যেসব ট্রল, কটূক্তি এবং প্রকাশ্য উল্লাস দেখা গেছে, তা নতুন করে এই প্রশ্ন তুলেছে—আমরা কি শুধু শ্যাডনফ্রয়েডে আক্রান্ত, নাকি ধীরে ধীরে স্যাডিস্টিক আচরণের দিকেও এগিয়ে যাচ্ছি? এই মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ শুরু হয়েছিল কারিনা কায়সার অসুস্থ হওয়ার পর থেকেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাকে এবং তার পরিবারকে নিয়ে চলতে থাকে নির্মম মন্তব্য ও আক্রমণ। মৃত্যুর পরও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি; বরং অনেকেই প্রকাশ্যে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ লিখে নিজেদের খুশির প্রকাশ করেছেন। তবে প্রশ্ন উঠছে—কারিনা কায়সারের অপরাধ কী ছিল? একটি পক্ষের দাবি, তিনি জুলাই আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন, তাই রাজনৈতিক মতবিরোধ থেকেই তার বিরুদ্ধে এই আক্রোশ। অসুস্থ হওয়ার পর ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে তাকে প্রাণবন্ত ও হাসিখুশি হিসেবেই দেখা যায়। তার মা এক ভিডিওতে ব্যাখ্যা করেছিলেন, আন্দোলনের সময় গণভবনের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় তারা হাতে থাকা সাধারণ ব্যাগ ও গয়না দেখিয়ে মজা করে বলেছিলেন—এসব যেন গণভবন থেকে নেওয়া হয়েছে। সেটি ছিল নিছক রসিকতা, বাস্তবে কোনো লুটপাটের ঘটনা নয়। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার আদালত সেই মুহূর্তকেই চূড়ান্ত রায়ে পরিণত করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্য একটি ভিডিওতে কারিনা কায়সার গণভবন লুট, মেট্রোরেলে আগুন, সংসদ ভবনে ভাঙচুর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যুরাল ধ্বংসের সমালোচনা করে বলেছিলেন—এসব দেশের সম্পদ, এগুলো নষ্ট করা উচিত হয়নি। নতুন দেশ গড়ার স্বপ্নের সঙ্গে এমন ধ্বংসযজ্ঞ সাংঘর্ষিক বলেও তিনি মন্তব্য করেছিলেন। সমালোচকদের দাবি, তার এই বক্তব্যের ইতিবাচক দিক উপেক্ষিত হয়েছে, অথচ একটি বিতর্কিত মুহূর্তই তাকে ঘিরে প্রধান আলোচনায় পরিণত হয়েছে। এই প্রসঙ্গে উঠে আসে অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফার একটি সাক্ষাৎকারের কথাও। প্রয়াত অভিনেতা হুমায়ুন ফরিদীকে নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন—‘আমি তার সমালোচনা করবো না। কারণ এখানে ওর হয়ে কথা বলার কেউ নেই।’ বিচ্ছেদের পরও তিনি প্রয়াত ফরিদীকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেননি, কারণ মৃত্যুর পর একজন মানুষের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকে না। সমালোচকদের মতে, বর্তমান সমাজে সেই অনুপস্থিতিকেই অনেক সময় সবচেয়ে বড় সুযোগ হিসেবে দেখা হয়। মানুষ মনে করে—যিনি আর নেই, তাকে নিয়ে এখন যা খুশি বলা যায়। এই প্রবণতা শুধু মৃত ব্যক্তিকেই নয়, তার পরিবারকেও গভীর মানসিক আঘাতের মুখে ঠেলে দেয়। কারিনা কায়সারকে ঘিরে আরেকটি আলোচনার বিষয় ছিল তার সিনেমা ‘৩৬ ২৪ ৩৬’। সিনেমাটি মূলত ‘বডি শেমিং’ বা শারীরিক গঠন নিয়ে সামাজিক কটূক্তির বিরুদ্ধে ইতিবাচক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে বলে জানা যায়। কারিনা নিজেও কিছুটা স্থূলকায় ছিলেন এবং বাস্তব জীবনেও তাকে কম ট্রল বা বুলিংয়ের মুখোমুখি হতে হয়নি বলে অনেকে মনে করেন। তিনি ছিলেন সাবেক জাতীয় ফুটবলার কায়সার হামিদের মেয়ে এবং দাবার কিংবদন্তি রানী হামিদের নাতনি। পারিবারিক পরিচয়ের পাশাপাশি নিজস্ব চেষ্টায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর, ইউটিউবার ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবে তিনি পরিচিতি গড়ে তুলেছিলেন। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, অনেক সময় অন্যের সাফল্য, জনপ্রিয়তা কিংবা সামাজিক অবস্থানও ঈর্ষা ও পরশ্রীকাতরতার জন্ম দেয়, যা পরে বিদ্বেষে রূপ নিতে পারে। ড. রিচার্ড স্মিথের তত্ত্ব অনুযায়ী, এই ঈর্ষাই কখনও কখনও অন্যের পতনে আনন্দ পাওয়ার অনুভূতিতে রূপ নেয়। রাজনৈতিক বিভাজন, সামাজিক হিংসা ও ব্যক্তিগত হতাশা মিলিয়ে সমাজকে এক বিপজ্জনক মানসিক অবস্থার দিকে ঠেলে দিতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণায় মনোবিজ্ঞানীরা এ ধরনের আচরণের জন্য ‘এভরিডে স্যাডিজম’ শব্দটি ব্যবহার করছেন। তাদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আড়ালে থাকা অনেক ট্রলকারী ক্লিনিক্যাল অর্থে মানসিক রোগী না হলেও, সামাজিক ও নৈতিক বিচারে তারা এক ধরনের গভীর মানবিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকটের প্রতিফলন বহন করেন। মানুষের মৃত্যু কি সহমর্মিতা জাগাবে, নাকি বিভাজন আর বিদ্বেষের নতুন উৎস হবে—এই প্রশ্নই এখন সমাজের সামনে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তথ্যসূত্র: লেখক—সাইকোলোজিস্ট    

জেটিভি নিউজ বাংলা

সত্য প্রকাশে অঙ্গিকারবদ্ধ....