এনসিপিতে ভাঙন, বহিষ্কার ও নতুন মঞ্চের আভাস—চলে যাওয়া নেতারা এখন কোথায়?
জেটিভি নিউজ বাংলা
তারিখ: ২১ মে ২০২৬ ইং| সময়: রাত ০১:৪৪ মিনিট। জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠা রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-তে যুক্ত অধিকাংশ নেতাকর্মীই তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনেও রাজপথে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। প্রতিষ্ঠার এক বছরের মধ্যেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রত্যাশার বাইরে সাফল্য অর্জন করে দলটি। ২৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৬টিতে জয় এবং ২টি সংরক্ষিত আসনসহ সংসদে সরব উপস্থিতি নিশ্চিত করে এনসিপি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দলটির ভেতরে অস্থিরতা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা বাড়ছে। বহিষ্কার ও পদত্যাগের ধারাবাহিক ঘটনা প্রশ্ন তুলেছে—দল ছাড়ার পেছনে কারণ কী, আর যারা সরে গেছেন তারা এখন কী করছেন? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিপির কয়েকজন নেতা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে ও পরে যারা দল ছেড়েছেন, তাদের একটি অংশ নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠনের চিন্তায় রয়েছেন। তাদের মতে, মূলত মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব থেকেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। একইসঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে—দলত্যাগী নেতাদের ফিরিয়ে আনার কোনও উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না এবং তাদের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান কী। এ বিষয়ে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন বলেন, দল থেকে সরে যাওয়া নেতাদের বিষয়ে ব্যাখ্যা দলীয় হাইকমান্ড দেবে। তাদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ আছে কি না, সেটিও হাইকমান্ডই জানাতে পারবে। তবে তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অনেকে নির্দিষ্ট আদর্শ নিয়ে দলে এলেও পরে সেই আদর্শের বিচ্যুতি দেখতে পেলে তাদের জন্য দলে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি আরও বলেন, কেউ কেউ মতাদর্শগত কারণে সরে গেছেন, আবার কেউ হয়তো ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে এসেছিলেন, যা পূরণ না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেননি।পদত্যাগ ও বহিষ্কারের ধারাবাহিকতা
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আগেই এনসিপিতে বড় ধরনের পদত্যাগের ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের সিদ্ধান্তের পর কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত পদত্যাগের হিড়িক পড়ে। অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতাদর্শগত কারণ উল্লেখ করে দল ছাড়ার ঘোষণা দেন। কেউ কেউ দলে থাকলেও কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন এবং নির্বাচনের পরও একই কারণ দেখিয়ে সরে যান। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে পদত্যাগকারীদের মধ্যে রয়েছেন যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. তাজনূভা জাবিন, ডা. খালেদ সাইফুল্লাহ, হাসান আলী; যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা ও মুশফিক উস সালেহীন; যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালীন; আইসিটি সেলের প্রধান ফরহাদ আলম ভূঁইয়া; সদস্য আল আমিন আহমেদ টুটুল; দক্ষিণাঞ্চলের যুগ্ম প্রধান সংগঠক ইমান সৈয়দ; কৃষক বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আজাদ খান ভাসানী এবং সর্বশেষ ১৮ মে ঢাকা মহানগর উত্তরের সদস্য সচিব সর্দার আমিরুল ইসলাম। যদিও মধ্যরাতে দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে তাকে বহিষ্কারের কথা জানানো হয়। অন্যদিকে ১৫ মে চট্টগ্রাম মহানগর আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণার মাত্র দেড় ঘণ্টার মাথায় সংবাদ সম্মেলন করে চার শীর্ষ নেতা পদত্যাগ করেন। তারা শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে পদ বাণিজ্য, মামলা বাণিজ্য ও নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগ তোলেন। পরদিন আরও ১৮ জনসহ মোট ২২ জন একই সিদ্ধান্তের কথা জানান। এর আগে ৯ মার্চ দলের আদর্শিক অবস্থানের সঙ্গে মতের অমিলের কথা উল্লেখ করে রাঙামাটির জুরাছড়ি উপজেলা এনসিপির আহ্বায়ক অসিম চাকমাসহ ৮৭ নেতাকর্মী পদত্যাগ করেন। এছাড়াও বিভিন্ন জেলার নেতারাও দল ছাড়ার ঘোষণা দেন। পদত্যাগের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠার ১৫ মাসে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বেশ কয়েকজন নেতাকে বহিষ্কারও করেছে এনসিপি। ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর কেন্দ্রীয় সংগঠক মুনতাসীর মাহমুদকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। সর্বশেষ ১৬ মে চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মনজুর এলাহী কাশ্মিরকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও সংবেদনশীল তথ্য গোপনের অভিযোগে বহিষ্কার করা হয়। জেলা, মহানগর ও উপজেলা পর্যায়েও বহিষ্কারের ঘটনা ঘটেছে।দল ছাড়ার পর কে কী করছেন?
এনসিপি থেকে সরে যাওয়ার সময় অধিকাংশ নেতাই জানিয়েছিলেন, ভবিষ্যতে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে তাদের দেখা যাবে। সেই ধারাবাহিকতায় কেউ নতুন মঞ্চে সক্রিয় হয়েছেন, আবার কেউ নতুন রাজনৈতিক শক্তি গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. খালেদ সাইফুল্লাহ এবং তার স্ত্রী, সাবেক যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা এখনও কোনও রাজনৈতিক দলে যোগ দেননি। তাসনিম জারা ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে প্রায় অর্ধলাখ ভোট পেয়েছিলেন। নির্বাচনের পর ৭ মার্চ সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের উদ্যোগে ‘অলটারনেটিভস’ নামে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম আত্মপ্রকাশ করে। ১৭ সদস্যের ন্যাশনাল অর্গানাইজিং কমিটিতে স্থান পান এনসিপি থেকে পদত্যাগ করা তিন নেতা—তাজনূভা জাবিন, হাসান আলী এবং ইমান সৈয়দ। তাজনূভা জাবিন জানান, তারা অলটারনেটিভসকে সামনে রেখে কাজ করছেন এবং ইতোমধ্যে ২২টির বেশি জেলা কমিটি গঠন করা হয়েছে। অন্যদিকে বহিষ্কৃত কেন্দ্রীয় সংগঠক মুনতাসীর মাহমুদ দল ছাড়ার পর এনসিপি নেতৃত্বের সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেন এবং ‘তৃণমূল এনসিপি’ গঠনের ঘোষণা দেন। রাজধানীতে কয়েকটি মিছিলও করেন তিনি। যদিও উদ্যোগটি শেষ পর্যন্ত এগোয়নি। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ‘ছড়ি’ প্রতীক নিয়ে ঢাকা-১২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা থাকলেও তার দাবি, শেষ পর্যন্ত তিনি নির্বাচন না করে জামায়াতের বর্তমান এমপি সাইফুল আলম খান মিলনের পক্ষে কাজ করেছেন। গণমাধ্যমকে মাহমুদ বলেন, জুলাই আন্দোলনের প্রতিনিধিত্বকারী দল হিসেবে এনসিপির প্রতি মানুষের বড় প্রত্যাশা ছিল, কিন্তু নানা ক্ষেত্রে দলটি সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। তার অভিযোগ, নেতৃত্বের অনিয়ম-দুর্নীতির প্রতিবাদ করায় তাকে শোকজ করা হয়। ফলে দলে থাকার প্রয়োজনীয়তা আর অনুভব করেননি। বর্তমানে বাংলাদেশকে ধারণ করা তরুণদের নিয়ে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজ চলছে বলেও জানান তিনি। নির্বাচনের আগে ১ জানুয়ারি যুগ্ম সদস্য সচিব ও মিডিয়া সেলের সম্পাদক পদসহ দল ছাড়েন মুশফিক উস সালেহীন। জামায়াতের সঙ্গে জোটের প্রশ্নে মতাদর্শগত বিরোধ থেকেই তিনি সরে যান বলে জানা গেছে। তিনি বলেন, আপাতত কোনও রাজনৈতিক দলে যুক্ত নন, তবে দুই জোটের বাইরে বিকল্প রাজনৈতিক মঞ্চ তৈরির কাজ এগিয়েছে। তার ভাষায়, তরুণ ও ক্লিন ইমেজধারীদের নিয়েই নতুন পরিকল্পনা এগোচ্ছে এবং শিগগিরই এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।শীর্ষ নেতৃত্বের অবস্থান
এনসিপি থেকে চলে যাওয়া বা বহিষ্কৃত নেতাদের ফিরিয়ে আনার বিষয়েও আলোচনা রয়েছে। দলের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে থাকা নেতাদের চলে যাওয়া নিয়ে শীর্ষ নেতৃত্ব ভাবছে এবং এ বিষয়ে তুলনামূলক উদার মনোভাব রয়েছে। এ প্রসঙ্গে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট জাবেদ রাসিন বলেন, যারা ফিরে আসতে চান তাদের জন্য দলের দরজা খোলা রয়েছে। তবে কাউকে ফিরিয়ে আনার জন্য দলীয়ভাবে এখনও কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তরুণদের প্রত্যাশা ও মতাদর্শের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এনসিপির জন্য বর্তমান ভাঙন ও নেতৃত্ব সংকট ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। একইসঙ্গে দলত্যাগী নেতাদের নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ দেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণও তৈরি করতে পারেজেটিভি নিউজ বাংলা
সত্য প্রকাশে অঙ্গিকারবদ্ধ....

ডেস্ক রিপোর্ট 




















