জেটিভি নিউজ বাংলা
তারিখ: ০৭ মে ২০২৬ ইং | সময়: সকাল ১১:৪৭ মিনিটজেলা প্রশাসনের নির্দেশনা অমান্য করে সরকারি খাস জমি ব্যক্তি মালিকানায় নামজারি, কুড়িগ্রাম সদরের এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ
কুড়িগ্রাম সদরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা উপেক্ষা করে সরকারি খাস জমি ব্যক্তি মালিকানায় নামজারি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এতে সদর উপজেলার আরাজি পলাশবাড়ি মৌজার অন্তত ৭২ একর সরকারি খাস জমি বেহাত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। একই সঙ্গে গুচ্ছগ্রামে বসবাসরত শতাধিক ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবার উচ্ছেদের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে। জানা গেছে, আরাজি পলাশবাড়ি গুচ্ছগ্রামের সরকারি খাস জমি বিভিন্ন ব্যক্তির নামে ‘ভ্রমাত্মক রেকর্ডভুক্ত’ হওয়ায় গুচ্ছগ্রামবাসী রেকর্ড সংশোধনের আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন নির্দেশ দেয়, আরএস রেকর্ড সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত এসএ ২০০১, ২০৭৩ ও ২০৭৪ দাগের জমির সব কার্যক্রম এসএ রেকর্ড অনুযায়ী পরিচালনা করতে হবে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে সরকারি জমি ব্যক্তি মালিকানায় নামজারি করা হচ্ছে। গুচ্ছগ্রামবাসীর দাবি, অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা, সার্ভেয়ার এবং ভূমি অফিসের কয়েকজন কর্মচারীর যোগসাজশে এই কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন এসিল্যান্ড। অনুসন্ধানে সরকারি খাস জমি ব্যক্তি মালিকানায় খারিজ করে দেওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। সরকারের পুনর্বাসন প্রকল্প নিয়েই চক্রান্তের অভিযোগ জেলা প্রশাসনের আরএম শাখা সূত্রে জানা যায়, আরাজি পলাশবাড়ি মৌজার এসএ দাগ ২০০১, ২০৭৩ ও ২০৭৪ নম্বরের খাস জমিতে সরকারের উদ্যোগে গুচ্ছগ্রাম আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা হয়। ১৯৮৯ সালে রেজিস্ট্রিকৃত কবুলিয়তের মাধ্যমে ১৫টি ভূমিহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়। পরে ১৯৯৯ সালে আরও ২০টি পরিবার এবং ২০২১ সালে নতুন পাকা ঘর নির্মাণ করে আরও ২৪টি পরিবারকে সেখানে বসবাসের সুযোগ দেওয়া হয়। এসব পরিবারের মধ্যে ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাও রয়েছেন। এছাড়া ২০০৯ সালে বীরপ্রতীক তারামন বিবিকেও একই মৌজার এসএ ২০৭৪ দাগে ১ একর খাস জমিতে বাড়ি নির্মাণ করে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, একটি প্রভাবশালী চক্র ভূমি অফিসের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহায়তায় এসব সরকারি খাস জমি বিভিন্ন ব্যক্তির নামে রেকর্ডভুক্ত করে। এরপর থেকেই গুচ্ছগ্রামবাসীকে উচ্ছেদের চেষ্টা শুরু হয়। জেলা প্রশাসনের নির্দেশনাকেও উপেক্ষার অভিযোগ ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে জেলা প্রশাসন লিখিত নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে জানায়, আরএস রেকর্ড সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত সরকারি ভূমি উন্নয়ন করসহ সব কার্যক্রম এসএ রেকর্ড অনুযায়ী চলবে। কিছুদিন তা অনুসরণ করা হলেও ২০২৪ সালের মে মাসে বর্তমান এসিল্যান্ড আরিফুল ইসলাম দায়িত্ব নেওয়ার পর আবারও ব্যক্তি মালিকানায় নামজারি শুরু হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এরপর গুচ্ছগ্রামবাসী আবার জেলা প্রশাসনের শরণাপন্ন হলে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে পুনরায় একই নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু অভিযোগ, এরপরও সরকারি খাস জমি ব্যক্তি মালিকানায় নামজারি অব্যাহত রয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রায় পৌনে ৩ একর খাস জমির ভূমি উন্নয়ন কর ব্যক্তি মালিকানায় আদায়ের নথিও পাওয়া গেছে। সেখানে এসএ ২০০১ ও ২০৭৪ দাগের জমি ব্যক্তি নামে নামজারির তথ্য উঠে এসেছে। উচ্ছেদ আতঙ্কে গুচ্ছগ্রামবাসী গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা দিনমজুর আজিম বলেন, “সরকার যখন জমি দিছে তখন ছিল খাল-পাগার। ভরাট করে আমরা বসবাস শুরু করছি। এখন শুনি অন্য মানুষকে সেই জমি দেওয়া হচ্ছে।” আরেক বাসিন্দা ফারুক অভিযোগ করে বলেন, “ডিসি অফিসের নির্দেশনার পরও এসএ অনুযায়ী খাজনা নেওয়া হচ্ছে না। শুনতেছি তলে তলে টাকা নিয়ে সরকারি জমি অন্যদের দিয়ে দিচ্ছেন এসিল্যান্ড।” প্রবীণ বাসিন্দা হাছেন আলী বলেন, “সরকার ঘর-জমি দেওয়ার পর এখন আবার কীভাবে অন্যদের নামে জমি যাচ্ছে বুঝতে পারছি না।” একই ধরনের অভিযোগ করেন গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা বীরমুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তারও। যা বলছেন তহশিলদার ও এসিল্যান্ড কুড়িগ্রাম পৌর ভূমি অফিসের ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা আব্দুল হাকিম শেখ প্রথমে বলেন, “চিঠির বিষয়ে আমার জানা নেই। প্রয়োজনে নামজারি বাতিল করা হবে।” তবে পরে তিনি বলেন, “আরএস গেজেট হওয়ার পর এসএ অনুযায়ী ভূমি উন্নয়ন কর নেওয়ার সুযোগ নেই।” এ বিষয়ে এসিল্যান্ড আরিফুল ইসলাম বলেন, “আরএস রেকর্ড অনুযায়ী নামজারি করা হচ্ছে। নামজারি করার সময় আমরা এসএ রেকর্ডও দেখি। সরকারি স্বার্থ থাকলে নামজারি স্থগিত রাখা হয়।” তবে সরকারি খাস জমি কীভাবে ব্যক্তি মালিকানায় নামজারি হচ্ছে—এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি তিনি। জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা না মানার বিষয়ে তার বক্তব্য, “এ ধরনের চিঠি আমি পাইনি। পেলেও বিধিসম্মত নয় জানিয়ে উত্তর দিতাম। আরএস গেজেট হওয়ার পর এসএ অনুযায়ী কার্যক্রম চালানোর সুযোগ নেই।” যদিও সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আরএস রেকর্ডের পরও সরকার এসএ রেকর্ড অনুসরণ করেই ওই খাস জমিতে গুচ্ছগ্রাম স্থাপন করেছিল। ‘অসদাচরণ’ বলে মন্তব্য আইনজীবীদের আইনজীবীদের মতে, জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা অমান্য করে এসিল্যান্ড আরিফুল ইসলাম অসদাচরণ করেছেন এবং এতে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সাবেক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আজিজুর রহমান দুলু বলেন, “সরকারি স্বার্থ রক্ষার দায়িত্বে থেকে যদি কেউ উল্টো রাষ্ট্রের ক্ষতি করেন, সেটি অবশ্যই অসদাচরণ। আরএস রেকর্ড থাকলেও জমিতে সরকারি স্বার্থ থাকলে নামজারি স্থগিত রেখে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা উচিত।” তিনি সরকারপক্ষ ও বন্দোবস্ত পাওয়া পরিবারগুলোকে আদালতের আশ্রয় নেওয়ারও পরামর্শ দেন।জেটিভি নিউজ বাংলা
সত্য প্রকাশে অঙ্গিকারবদ্ধ.....

রংপুর জেলার প্রতিনিধি 




















