‘সুগার ড্যাডি’ চক্র দমনে আইনি নোটিশ
বিশেষ প্রতিনিধি | জেটিভি নিউজ বাংলা
২৫ নভেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে এক ভয়াবহ সামাজিক, নৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে—যা সাধারণভাবে ‘সুগার ড্যাডি’ প্রবণতা নামে পরিচিত। সমাজের কিছু ধনী, ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী ব্যক্তির অবৈধ প্রলোভন, আর্থিক লেনদেন ও শোষণের মাধ্যমে অসংখ্য তরুণী—বিশেষ করে আর্থিকভাবে দুর্বল বা ঝুঁকিপূর্ণ মেয়েরা—অনৈতিক সম্পর্ক, শারীরিক নির্যাতন, মানসিক নিপীড়ন এবং ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইলের ফাঁদে আটকা পড়ছেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় বিষয়টি এখন জাতীয় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতির অবনতির প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার (২৫ নভেম্বর) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. মাহমুদুল হাসান সরকারের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের কাছে রেজিস্ট্রি ডাক ও ই-মেইলের মাধ্যমে একটি আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন। নোটিশটি দেওয়া হয়েছে—
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব,
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান, এবং
ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি)—এর কাছে।
অবৈধ অর্থ ও শোষণের জালে তরুণীরা
নোটিশে উল্লেখ করা হয়, তথাকথিত ‘সুগার ড্যাডি’ চক্র তরুণীদের জীবনে চরম বিপর্যয় তৈরি করছে। প্রলোভন, আর্থিক সংকট কিংবা পারিবারিক চাপে অনেক মেয়ে এমন এক মানসিক অস্থিরতার মধ্যে জড়াচ্ছে, যেখান থেকে বের হওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিভিন্ন প্রতিবেদন বলছে—এই তরুণীদের দেওয়া হচ্ছে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ, দামি ফোন-আইফোন, ব্র্যান্ডেড পোশাক, স্বর্ণালংকার, গাড়ি, বিদেশ ভ্রমণের সুবিধা ও বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। এসব টাকার বেশিরভাগই কর নথিতে প্রদর্শিত হয় না; অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো আসছে কালো টাকা, অবৈধ লেনদেন ও মানিলন্ডারিংয়ের সূত্রে।
এর ফলে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি, কর প্রশাসন ও আর্থিক শৃঙ্খলা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
ব্ল্যাকমেইল, ভিডিও ধারণ ও ডিজিটাল নিপীড়ন
নোটিশে আরও বলা হয়েছে—অনেক তরুণীকে ভয়ভীতি, মানসিক চাপ বা প্রলোভনের মাধ্যমে গোপনে ব্যক্তিগত ছবি-ভিডিও ধারণ করে পরবর্তী সময়ে সেগুলো ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল ও যৌন শোষণের ঘটনা বাড়ছে।
এর ফলে ভুক্তভোগীরা সামাজিক লাঞ্ছনা, নিরাপত্তাহীনতা, পারিবারিক অস্থিরতা ও ভবিষ্যৎ ধ্বংসের ঝুঁকিতে পড়ছে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—বিভিন্ন অভিযোগে উঠে এসেছে, এই তরুণীদের ব্যবহার করে দেশের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা, কূটনীতিক, বিদেশি নাগরিকসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরও ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা চলছে।
এটি কেবল নৈতিক অপরাধ নয়—বরং জাতীয় নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তথ্য সুরক্ষা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের জন্যও সরাসরি হুমকি।
পরিবারব্যবস্থায় ভয়াবহ প্রভাব
নোটিশে বলা হয়েছে—এই চক্রের কারণে বহু পরিবারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। অনেক সুগার ড্যাডির স্ত্রী ও সন্তানরা মানসিক চাপ, অবহেলা, নির্যাতন ও অপমানের শিকার হচ্ছেন। এর প্রভাবে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদ, পারিবারিক ভাঙন ও সামাজিক অস্থিরতা—যা বাংলাদেশের পরিবারব্যবস্থা ও সামাজিক মূল্যবোধে গভীর আঘাত হানছে।
অ্যাডভোকেট মাহমুদুল হাসান তার নোটিশে সরাসরি সরকারের কাছে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তিনি প্রস্তাব করেছেন—
- স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ, সিআইডি, স্পেশাল ব্রাঞ্চ, সাইবার ক্রাইম ইউনিট ও এনবিআর-এর সমন্বয়ে জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন
- তরুণীদের কাছে প্রবাহিত অস্বাভাবিক অর্থের উৎস তদন্ত
- আর্থিক অপরাধ ও মানিলন্ডারিং শনাক্তকরণ
- ব্ল্যাকমেইল ভিডিও-ছবি অপসারণ
- সংশ্লিষ্ট সুগার ড্যাডিদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা
নোটিশে আরও বলা হয়েছে—
৭ কার্যদিবসের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট করা হয়েছে।