বাংলাদেশ কি ঋণের ফাঁদে পড়ছে? বাড়ছে সরকারি ঋণ, চাপে অর্থনীতি — সতর্ক করছেন অর্থনীতিবিদরা
জেটিভি নিউজ বাংলা |
তারিখ :০৭ মে ২০২৬ ইং: সময়: ৩:৩৪ মিনিট। বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক জটিল ও সংবেদনশীল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ, রাজস্ব ঘাটতি, উচ্চ সুদ পরিশোধ এবং সীমিত উন্নয়ন ব্যয়ের কারণে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ‘ঋণের ফাঁদের’ দিকে এগিয়ে যেতে পারে। ৯ মাসেই ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ৮ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অথচ পুরো অর্থবছরের জন্য ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের আগেই ঋণের সীমা অতিক্রম করেছে সরকার। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়েছে ৭৮ হাজার ৪৯ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়েছে ৩০ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা। পরবর্তীতে কিছু ঋণ পরিশোধ করায় বর্তমানে নিট ঋণের পরিমাণ প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় না হওয়ায় সরকারকে বেতন-ভাতা, ভর্তুকি, ঋণের সুদ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে নতুন টাকা ছাপিয়েও অর্থ জোগানের পথ নিতে হয়েছে।দ্রুত বাড়ছে সরকারি ঋণের বোঝা
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের মোট সরকারি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। মাত্র দেড় বছরের ব্যবধানে ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা। এর আগে ২০২৪ সালের জুন শেষে মোট ঋণ ছিল প্রায় ১৮ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা, আর ২০২২ সালের জুনে ছিল ১৩ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ঋণের এই অস্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় সতর্ক সংকেত।২ লাখ কোটি থেকে ২২ লাখ কোটি
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার সময় দেশের সরকারি ঋণ ছিল প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা। সময়ের ব্যবধানে তা ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ২০২৪ সালের জুন শেষে ১৮ লাখ ৮৮ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকায় পৌঁছে। পরবর্তীতে বৈদেশিক ঋণ নতুন বিনিময় হারে পুনর্মূল্যায়ন করায় আরও ৫৬ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা যুক্ত হয়। ফলে ডিসেম্বর শেষে সরকারি ঋণের পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে সরকারি ঋণ কাঠামো বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ অর্থবছরে বাজেট সহায়তা হিসেবে সরকার ৩৪৪ কোটি ডলার ঋণ নিয়েছে, যা আগের অর্থবছরের ২০০ কোটি ডলারের তুলনায় অনেক বেশি। দেড় বছরের ব্যবধানে বৈদেশিক ঋণ ৮ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৯ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ ঋণও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকায়।প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মন্তব্য
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্বল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছে বর্তমান সরকার। তিনি জানান, প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকার ঋণের বোঝা নিয়ে সরকারকে কাজ শুরু করতে হয়েছে। রাজধানীর ওসমানি স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত “ডিসি সম্মেলন-২০২৬” উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আড়াই মাসে কিছুটা উন্নতি হলেও অর্থনীতির পরিস্থিতি এখনও সন্তোষজনক নয়।অভ্যন্তরীণ ঋণের দিকে ঝুঁকছে সরকার
বর্তমানে মোট সরকারি ঋণের প্রায় ৫৭ শতাংশই অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া। বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি কমাতে সরকার অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়া হলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ কমে যেতে পারে। এতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।রাজস্ব ঘাটতি বাড়ছে
চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে। অথচ সরকারকে উন্নয়ন ও পরিচালন ব্যয়ের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নয়ন ব্যয়ের পাশাপাশি এখন পরিচালন ব্যয় মেটাতেও ঋণ নিতে হচ্ছে, যা একটি অস্বাভাবিক এবং উদ্বেগজনক প্রবণতা। সুদ পরিশোধেই যাচ্ছে বড় অংশ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই সরকারের মোট ব্যয়ের প্রায় ২৬ শতাংশ ব্যয় হয়েছে শুধু ঋণের সুদ পরিশোধে। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদের হার দ্রুত বাড়ায় বাজেটের বড় অংশ এখন ঋণ পরিষেবায় চলে যাচ্ছে। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো খাতগুলোতে ব্যয় সংকোচনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।উন্নয়ন ব্যয় কমলেও কমেনি ঋণ
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এডিপি বাস্তবায়ন গত সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। তবুও ঋণের পরিমাণ কমানো সম্ভব হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, পুরোনো ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ, পরিচালন ব্যয়ের উচ্চ চাপ এবং দুর্বল রাজস্ব ব্যবস্থার কারণেই ঋণের বোঝা বাড়ছে। টাকা ছাপিয়ে ঋণ নেওয়ার ঝুঁকি সরকার যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়, তখন অনেক সময় নতুন টাকা ছাপিয়ে অর্থ সরবরাহ করা হয়। এতে বাজারে অর্থের প্রবাহ বেড়ে গিয়ে মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। অন্যদিকে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়া হলে বেসরকারি খাতে ঋণ সংকট তৈরি হতে পারে, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশ এখনো সরাসরি ঋণ সংকটে পড়েনি। তবে ঋণনির্ভরতা, সুদ ব্যয়ের চাপ এবং দুর্বল রাজস্ব কাঠামো একসঙ্গে অর্থনীতিকে ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, দেশি ও বৈদেশিক ঋণের বোঝা দ্রুত বাড়ছে এবং সুদ পরিশোধ এখন জাতীয় বাজেটের অন্যতম বড় ব্যয়খাতে পরিণত হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।কেন তৈরি হচ্ছে ‘ঋণের ফাঁদ’?
বিশ্লেষকদের মতে কয়েকটি কাঠামোগত দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। এর মধ্যে রয়েছে— সীমিত করজাল ও কর ফাঁকি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলার অভাব রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে ভর্তুকির চাপ বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে স্থবিরতা ফলে রাজস্ব আয় বাড়ছে না, কিন্তু ব্যয় কমছেও না। তাই ঋণই হয়ে উঠছে সরকারের প্রধান ভরসা।উত্তরণের পথ কী?
অর্থনীতিবিদরা পরিস্থিতি সামাল দিতে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপের পরামর্শ দিয়েছেন— করজাল সম্প্রসারণ ও এনবিআরের সক্ষমতা বৃদ্ধি অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো সাশ্রয়ী বৈদেশিক ঋণ ও বিকল্প অর্থায়ন বৃদ্ধি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সংস্কার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা বিশেষজ্ঞদের মতে, সময় থাকতে আর্থিক শৃঙ্খলা ও কাঠামোগত সংস্কার নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে ঋণের চাপই বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে।জেটিভি নিউজ বাংলা
সত্য প্রকাশে অঙ্গিকারবদ্ধ....

ডেস্ক রিপোর্ট 




















