জেটিভি নিউজ বাংলা
তারিখ :২২ জুলাই ২০২৬ ইল,সময় :সকাল ০৯:৩৪ মিনিট।করোনা থেকে জুলাই আন্দোলন: ছয় বছরের শিখন ঘাটতিতে সংকটে শিক্ষা, কোচিং নির্ভরতা বেড়েছে; ২০২৭ সালের পরীক্ষা এগিয়ে আনার উদ্যোগ
স্টাফ রিপোর্টার | জেটিভি নিউজ বাংলা ২০২০ সালের ১৭ মার্চ করোনা অতিমারীর কারণে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। তখন থেকেই দেশের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি শুরু হয়। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চললেও পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি। শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ কমাতে সেই সময় সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়া হয়। এতে শিক্ষার্থীদের শিখনে বড় ঘাটতি থেকেই যায়। অতিরিক্ত ক্লাস নিয়ে সেই ঘাটতি কমানোর চেষ্টা করা হলেও ২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর থেকে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতায় আবারও দীর্ঘ শিখন ঘাটতিতে পড়ে শিক্ষার্থীরা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, করোনা অতিমারীর সময় ২০২০ সালের এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব না হওয়ায় সাবজেক্ট ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের ফল প্রকাশ করা হয়েছিল। এরপর ২০২৪ সালে পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল তৎকালীন সরকার। তবে চব্বিশের জুলাই আন্দোলনকে ঘিরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অস্থিরতা শুরু হয়, যা দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শিখন ঘাটতির কারণে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীরা অটোপাসের দাবিতে বাংলাদেশ সচিবালয়ে ঢুকে আন্দোলন করেন। পরে শিক্ষার্থীদের চাপের মুখে সরকার করোনাকালে অনুসৃত পদ্ধতি অনুসরণ করে তাদের ‘অটোপাস’ দেয়। শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনা অতিমারীর সময় এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব না হলেও সেই ব্যাচের পরীক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি তেমন একটা ছিল না। কারণ শ্রেণি পাঠ আগেই শেষ হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর শিখন ঘাটতি রেখেই গঠিত সরকার এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের অটোপাস দেয়। এরপর থেকে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশকেই নিয়মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানমুখী করা সম্ভব হয়নি। আর ২০২৫ সালের পুরো সময়জুড়েই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা অব্যাহত ছিল। তাদের মতে, জুলাই আন্দোলন ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মিলিয়ে গত দুই বছরে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা শ্রেণিপাঠ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম দুই মাসও ঠিকমতো লেখাপড়া হয়নি। চলতি বছরের শুরুতে সময়মতো পাঠ্যবই হাতে না পাওয়ায় শ্রেণিপাঠও ব্যাহত হয়। জাতীয় নির্বাচনের কারণে আরও তিন দিন ছুটি ছিল। ফলে জানুয়ারি থেকে ১৪ মে পর্যন্ত যে অংশের সিলেবাস শেষ হওয়ার কথা ছিল, তা শেষ করা সম্ভব হয়নি। এদিকে শিখন ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ না হলেও এসএসসি ও সমমান এবং এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার সময় এগিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা ৭ জানুয়ারি এবং এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা ৬ জুন শুরু হবে। গত ১৪ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান। শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২৭ সালের ৭ জানুয়ারি এসএসসি পরীক্ষা শুরুর উদ্যোগ ইতিবাচক। শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে ইতোমধ্যে অনেক সময় নষ্ট হয়েছে। বিশেষ ব্যবস্থায় শিখন ঘাটতি কাটিয়ে ঘোষিত সময়ে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হলে ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীরাই লাভবান হবে।শিখন ঘাটতির কারণে কোচিংমুখী শিক্ষার্থীরা
শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিখন ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে পূর্ণ সিলেবাস শেষ হবে কি না—এ নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগ থাকে। ফলে তারা সন্তানদের কোচিংয়ে পাঠাতে বাধ্য হন। শিক্ষার্থীরা এমনিতেই কোচিংয়ে যায় না, বাধ্য হয়েই যায়। আমাদের সন্তানের শ্রেণিকক্ষের ভেতরে পঠন-পাঠনের মানও খুব ভালো নয়। সময়ও কম পাবে। এ ছাড়া বেশিরভাগ শিক্ষকই চান শিক্ষার্থীরা কোচিংয়ে পড়ুক। তিনি বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত হাইকোর্টের নির্দেশনা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা, যেখানে বলা হয়েছে—কোনও শিক্ষক নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে কোচিং পরিচালনা করতে পারবেন না।শিখন ঘাটতি মেটানো জরুরি, তাড়াহুড়ো নয়
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ বলেন, নানা ধরনের বিশৃঙ্খলার কারণে পড়াশোনার ক্ষতি হয়েছে। তাই তাড়াহুড়ো না করে শিক্ষার্থীদের শেখার সুযোগ নিশ্চিত করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, স্কুলের মনিটরিং বাড়াতে হবে। পাবলিক পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হলেও পাঁচটি মূল বিষয়ে পরীক্ষা নিলেও মেধা মূল্যায়নে সমস্যা হবে না। তিনি আরও বলেন, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে ভর্তি ও বই বিতরণে বছরের গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হয়। উচ্চশিক্ষার মতো জুলাই-আগস্ট থেকে শিক্ষাবর্ষ শুরু করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।অস্থিরতার প্রভাব শিক্ষাঙ্গনজুড়ে
রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনের পর মব সন্ত্রাসের কারণে শিক্ষকরা তটস্থ হয়ে পড়েন। অনেক শিক্ষার্থী আন্দোলনের চেতনা থেকে সরে গিয়ে সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ের প্রবণতা তৈরি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অটোপাসের দাবিতে আন্দোলন সফল হয়। তবে এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। তার মতে, এসব ঘটনার প্রভাব শুধু শিক্ষার্থীদের ওপর নয়, পুরো শিক্ষাঙ্গনের ওপর পড়েছে। একই সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার, মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং সামাজিক অস্থিরতাও বেড়েছে।প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বাড়ানোর তাগিদ
শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক বলেন, শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার পাশাপাশি কোচিং, প্রাইভেট টিউশন, গাইড ও নোটবইয়ের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। তবে বিদ্যালয়ভিত্তিক উদ্যোগ বাড়ানো গেলে ব্যক্তিগত প্রস্তুতির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং বাণিজ্যিক কোচিং ব্যবস্থার প্রভাবও হ্রাস পাবে। তিনি বলেন, করোনাকালে সরকার 'এক্সিলারেটেড লার্নিং' ও 'রেমিডিয়াল লার্নিং' কর্মসূচি চালু করেছিল। বর্তমান সময়েও একই ধরনের উদ্যোগ নিয়ে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করা প্রয়োজন। বিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে কন্টাক্ট আওয়ার বাড়ানো, দশম শ্রেণিতে অতিরিক্ত এক ঘণ্টা ক্লাস চালু এবং প্রয়োজনে সাপ্তাহিক ছুটি কমানোরও পরামর্শ দেন তিনি।প্রাথমিক শিক্ষাতেও শিখন ঘাটতি উদ্বেগজনক
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, দেশের প্রাথমিক শিক্ষার কারিকুলামে অনেক ঘাটতি রয়েছে এবং তা শিশুদের জন্য বেশ কঠিন। তিনি সরেজমিনে বিদ্যালয় পরিদর্শন করে দেখেছেন, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির অনেক শিক্ষার্থীর জন্য পাঠ্যবই বুঝে পড়া কঠিন হয়ে পড়ছে। তার আশঙ্কা, সরকারি হিসাবের তুলনায় বাস্তবে আরও বেশি শিক্ষার্থী শিখনে পিছিয়ে রয়েছে। তিনি জানান, শিখন ঘাটতি কমাতে কারিকুলাম পুনর্বিন্যাস, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান, নিয়মিত তদারকি এবং রেমিডিয়াল শিক্ষা চালুর পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে মন্ত্রণালয়। — জেটিভি নিউজ বাংলাদেশ ও দশের কথা বলে

স্টাফ রিপোর্টার 





















