জেটিভি নিউজ বাংলা
তারিখ :১৫ জুলাই ২০২৬ ইং,বুধবার, সমায়: সকাল ০৯:৪৪ মিনিট। ফাইল ছবি।সরকারি ব্যয়ে কড়াকড়ি আরও বাড়ছে: কর্মকর্তাদের গাড়ি ভাতা অর্ধেকে নামানোর প্রস্তাব, উচ্চশিক্ষায় মিলতে পারে শুধু শিক্ষা ছুটি
সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার। ব্যয় সংকোচনের ধারাবাহিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে এবার প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের মোটরযান রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা অর্ধেকে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে পূর্ণ স্কলারশিপ বা ফেলোশিপ নিয়ে দেশে কিংবা বিদেশে উচ্চশিক্ষায় যাওয়া কর্মকর্তাদের প্রেষণে (ডেপুটেশন) না পাঠিয়ে শিক্ষা ছুটি দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় আনা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ গত ৯ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে পাঠানো দুটি পৃথক চিঠিতে এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানিয়েছে। অর্থ বিভাগের মতে, সীমিত সরকারি সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।মাসিক গাড়ি ভাতা ৫০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকায় নামানোর প্রস্তাব
বর্তমানে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সুদমুক্ত ঋণে ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার পর ‘গাড়ি সেবা নগদায়ন’ কর্মসূচির আওতায় মাসে ৫০ হাজার টাকা মোটরযান রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা পান। নতুন প্রস্তাবে এই ভাতা কমিয়ে ২৫ হাজার টাকা করার কথা বলা হয়েছে। অর্থ বিভাগের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারি ব্যয়ে সংযম আনা এবং সীমিত সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে এই সুবিধা পুনর্বিবেচনার সুযোগ রয়েছে। এতে প্রধানমন্ত্রীর ব্যয় সংকোচনের নির্দেশনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এখন বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এর আগে উপসচিব ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের জন্য ৩০ লাখ টাকার সুদমুক্ত গাড়ি কেনার ঋণ সুবিধাও সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে সরকার। ফলে সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি-সংক্রান্ত সুবিধাগুলো ধীরে ধীরে সীমিত করার নীতি আরও স্পষ্ট হচ্ছে।উচ্চশিক্ষায় গেলে প্রেষণের বদলে শিক্ষা ছুটি
অর্থ বিভাগের অপর প্রস্তাবে সরকারি কর্মকর্তাদের উচ্চশিক্ষা-সংক্রান্ত সুবিধায় পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে কোনো কর্মকর্তা পূর্ণ স্কলারশিপ বা ফেলোশিপ নিয়ে দেশে কিংবা বিদেশে উচ্চশিক্ষায় গেলে অনেক ক্ষেত্রে তাকে প্রেষণে পাঠানো হয়। এতে তিনি স্কলারশিপের পাশাপাশি সরকারি চাকরির পূর্ণ বেতন-ভাতাও পান। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, যেহেতু স্কলারশিপের আওতায় শিক্ষা, আবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয় বহন করা হয়, তাই প্রেষণের পরিবর্তে শিক্ষা ছুটি দেওয়া যেতে পারে। এতে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় কমবে। এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা শিক্ষা ছুটির বিধান অনুযায়ী সীমিত আর্থিক সুবিধা পাবেন।কৃচ্ছ্রসাধনের ধারাবাহিক কর্মসূচি
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এসব উদ্যোগ আলাদা কোনো সিদ্ধান্ত নয়; বরং ২০২৬–২৭ অর্থবছরে ঘোষিত সরকারি কৃচ্ছ্রসাধন নীতির ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। ইতোমধ্যে সরকার নতুন সরকারি গাড়ি কেনা স্থগিত, অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর ও প্রশিক্ষণ বন্ধ, ভূমি অধিগ্রহণে কড়াকড়ি, নতুন ভবন নির্মাণ সীমিতকরণ, সভা-সেমিনারের আপ্যায়ন ব্যয় কমানো এবং জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও ভ্রমণ ব্যয়ে সাশ্রয়ের নির্দেশনা কার্যকর করেছে। এ ছাড়া সরকারি গাড়ির জ্বালানি ব্যবহার ৩০ শতাংশ কমানো, অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ ব্যয় অর্ধেকে নামানো এবং সরকারি অফিসে বিদ্যুৎ ও গ্যাস ব্যবহারে কঠোর সাশ্রয়ী নীতিও বাস্তবায়ন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ও বাজেট-পরবর্তী নৈশভোজ বাতিল, সরকারি গাড়ির পরিবর্তে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার এবং সরকারি গাড়ির বহর ছোট করার মতো পদক্ষেপ নিয়ে ব্যয় সংযমের বার্তা দিয়েছে।কেন এই কঠোরতা?
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, রাজস্ব আহরণে চাপ, উন্নয়ন ব্যয়, ঋণের সুদ পরিশোধ, ভর্তুকির বোঝা এবং মূল্যস্ফীতির মতো একাধিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারি ব্যয়ের প্রতিটি খাতে সাশ্রয় এখন সময়ের দাবি। তাই প্রশাসনিক ব্যয় কমানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ
ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আবু আহমেদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সরকারের কৃচ্ছ্রসাধনের উদ্যোগ যথাসময়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, অর্থনীতি পুরোপুরি স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত পরিচালন ব্যয়ে সর্বোচ্চ সংযম বজায় রাখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় নতুন প্রকল্প গ্রহণ এবং অতিরিক্ত আর্থিক দায় সৃষ্টি থেকেও সরকারকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন তিনি। অন্যদিকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, প্রশাসনিক ব্যয় কমানো ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও শুধু ভাতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের আর্থিক পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। তিনি উন্নয়ন প্রকল্পে অপচয় রোধ, সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন, সরকারি কেনাকাটায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং কর আদায় বৃদ্ধির ওপর সমান গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।জেটিভি নিউজ বাংলা এর বিশ্লেষণ
সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এখন অর্থনৈতিক নীতির অন্যতম অগ্রাধিকার। কর্মকর্তাদের গাড়ি-সংক্রান্ত সুবিধা সীমিত করা, উচ্চশিক্ষায় আর্থিক সুবিধা পুনর্বিন্যাস, নতুন গাড়ি ও ভবন নির্মাণে নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচালন ব্যয় কমানোর ধারাবাহিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সরকার নিজস্ব ব্যয়ও সংযত রাখার বার্তা দিতে চাইছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এই উদ্যোগের প্রকৃত সুফল পেতে হলে প্রশাসনিক ব্যয়ের পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্পের অপচয় রোধ ও রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কারেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। জেটিভি নিউজ বাংলাদেশ ও দশের কথা বলে.....

স্টাফ রিপোর্টার 






















