ঢাকা , সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
ব্যাংক লুট করে আর ফিরে আসার সুযোগ নেই: এস আলম গ্রুপের পুনঃপ্রবেশের আইনি পথ বন্ধ বাজেটে স্বপ্ন দেখানো হয়, পরে সারা বছর সেই স্বপ্নভঙ্গের ফল ভোগ করতে হয়: রুমিন ফারহানা দুস্থ নারীদের আত্মনির্ভরশীল করতে বহুমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে সরকার: মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের কর্মকাণ্ডও দুদকের মাধ্যমে তদন্তের আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বন থেকে আবাসিক এলাকায় বাড়ইপাড়া বন বিট: সরকারি জমি কেটে খাল নির্মাণ, প্রভাবশালীদের দখলের ক্ষমতার ভাগের সংস্কার নয়, স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার নিয়ে কথা বলুন: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী সংসদে ১ হাজার ও ৫০০ টাকার নোট বাতিলের প্রস্তাব,ব্যাংকের সংখ্যা কমানোরও আহ্বান মাহবুব উদ্দিন খোকনের মাদক অপরাধ দমনে ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান রেখে সংসদে বিল, সাইবার নিরাপত্তা আইনের ২০ ধারা বিলুপ্তির প্রস্তাব বিধ্বস্ত অর্থনীতির ওপর ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার দুঃসাহসী বাজেট’: সংসদে আলতাফ হোসেন চৌধুরী যুব উদ্যোক্তা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ঈদ পুনর্মিলনী ও উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত

ব্যাংক লুট করে আর ফিরে আসার সুযোগ নেই: এস আলম গ্রুপের পুনঃপ্রবেশের আইনি পথ বন্ধ

জেটিভি নিউজ বাংলা

ছবি সংগৃহীত তারিখ: ২৯ জুন ২০২৬ ইং,সময়: রাত ০৯:০৮ মিনিট। 

ব্যাংক লুট করে আর ফিরে আসার সুযোগ নেই: এস আলম গ্রুপের পুনঃপ্রবেশের আইনি পথ বন্ধ

অবশেষে ব্যাংক খাতে বহুল আলোচিত এস আলম গ্রুপের পুনঃপ্রবেশের আইনি পথও বন্ধ হয়ে গেল। দীর্ঘ বিতর্ক, সমালোচনা এবং বিভিন্ন অংশীজনের আপত্তির পর ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এর বহুল আলোচিত ১৮(ক) ধারা বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এর ফলে রেজল্যুশন বা একীভূত হওয়া কোনো দুর্বল ব্যাংকের আগের মালিকরা আর আইনগতভাবে সেই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ বা নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ পাবেন না। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি আইনি সংশোধন নয়; বরং ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং অতীতে ব্যাংক থেকে অর্থ আত্মসাৎকারীদের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, "অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে সরকার ১৮(ক) ধারা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।" তিনি আরও বলেন, "আমাদের বার্তা স্পষ্ট—যারা জনগণের সম্পদ লুট করেছে, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। একইসঙ্গে আমানতকারীদের অর্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।"

কেন এত বিতর্ক?

গত ১০ এপ্রিল অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করার সময় শেষ মুহূর্তে ১৮(ক) নামে একটি নতুন ধারা যুক্ত করা হয়। ওই ধারায় বলা হয়েছিল, রেজল্যুশনের আওতায় যাওয়ার আগে যারা কোনো ব্যাংকের শেয়ারধারী ছিলেন, তারা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে পরবর্তীকালে আবার সেই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করতে পারবেন। সরকারের যুক্তি ছিল, আবেদনকারী যদি সরকারের দেওয়া অর্থ ফেরত দেন, নতুন মূলধন বিনিয়োগ করেন, আমানতকারীদের দায় পরিশোধ করেন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত শর্ত পূরণ করেন, তাহলে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ কমবে এবং ব্যাংক পুনরুদ্ধার সহজ হবে। তবে আইনটি সংসদে পাস হওয়ার পরপরই দেশজুড়ে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়।

কেন এস আলমকে ঘিরে বিতর্ক?

ব্যাংক খাতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এস আলম গ্রুপ। কারণ, একীভূত হওয়া পাঁচটি সংকটাপন্ন শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের মধ্যে চারটিই একসময় এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এগুলো হলো—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক। অপরদিকে এক্সিম ব্যাংক ছিল নাসা গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে। অভিযোগ রয়েছে, আগের সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে এসব ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়া হয়। সেই ঋণের বড় অংশই পরে খেলাপিতে পরিণত হয়। ফলে ব্যাংকগুলো মারাত্মক তারল্য সংকট ও মূলধন ঘাটতিতে পড়ে। এই অবস্থায় ১৮(ক) ধারা বহাল থাকলে বিতর্কিত পুরোনো মালিকরা আবারও ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন—এমন আশঙ্কা থেকেই তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

পাঁচ ব্যাংকের ভয়াবহ চিত্র

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা, যা তাদের মোট ঋণের প্রায় ৭৯ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে ইউনিয়ন ব্যাংকে। এরপর রয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক। ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে এটিকে অন্যতম বড় আর্থিক সংকট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

সমালোচনার মুখে বদলে গেল সিদ্ধান্ত

১৮(ক) ধারা যুক্ত হওয়ার পর বিরোধী রাজনৈতিক দল ছাড়াও অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার, ব্যবসায়ী সংগঠন, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি), অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর বিরোধিতা করে। টিআইবি এই উদ্যোগকে ‘আত্মঘাতীমূলক’ আখ্যা দিয়ে বলেছিল, এতে ব্যাংক লুটেরাদের পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি হবে এবং ব্যাংক খাতে সংস্কারের উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। বিশ্বব্যাংকও ব্যাংক রেজল্যুশন আইনকে আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার ওপর গুরুত্ব দেয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, এই বিতর্ক সরকারের ব্যাংক খাত সংস্কার কর্মসূচিকে প্রশ্নের মুখে ফেলছিল।

সরকারের নতুন বার্তা

১৮(ক) ধারা বাতিলের ফলে এখন থেকে রেজল্যুশনের আওতায় থাকা কোনো দুর্বল ব্যাংকের আগের মালিক আর সেই ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবেন না। অর্থমন্ত্রী সংসদে আরও জানান, জনগণের অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলায় দেশে ও বিদেশে প্রায় ৭২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ বা ফ্রিজ করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, একীভূত পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। ব্যক্তিগত আমানতকারীরা চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত তুলতে পারছেন এবং অবশিষ্ট অর্থ ধাপে ধাপে পরিশোধ করা হবে।

সামনে কী?

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিতর্কিত ধারা বাতিল নিঃসন্দেহে ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে এটিই শেষ নয়। তাদের মতে, ব্যাংক খাতে টেকসই সংস্কারের জন্য খেলাপি ঋণ আদায়, অর্থ পাচারকারীদের বিচার, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পরিচালনা পর্ষদে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ, শুধু আইনের একটি ধারা বাতিল করলেই সংকটের সমাধান হবে না। বরং যারা ব্যাংক থেকে জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান বিচার এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে আর্থিকভাবে পুনরুদ্ধার করাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, ১৮(ক) ধারা বাতিলের মাধ্যমে সরকার একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—ব্যাংক লুট করে আবার সেই ব্যাংকের মালিক হওয়ার সুযোগ আর থাকবে না। এটি আমানতকারীদের আস্থা পুনর্গঠন এবং ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।  

জেটিভি নিউজ বাংলা

দেশ ও দশের কথা বলে.....

ট্যাগস

জনপ্রিয় সংবাদ

ব্যাংক লুট করে আর ফিরে আসার সুযোগ নেই: এস আলম গ্রুপের পুনঃপ্রবেশের আইনি পথ বন্ধ

ব্যাংক লুট করে আর ফিরে আসার সুযোগ নেই: এস আলম গ্রুপের পুনঃপ্রবেশের আইনি পথ বন্ধ

আপডেট সময় ৪ মিনিট আগে

জেটিভি নিউজ বাংলা

ছবি সংগৃহীত তারিখ: ২৯ জুন ২০২৬ ইং,সময়: রাত ০৯:০৮ মিনিট। 

ব্যাংক লুট করে আর ফিরে আসার সুযোগ নেই: এস আলম গ্রুপের পুনঃপ্রবেশের আইনি পথ বন্ধ

অবশেষে ব্যাংক খাতে বহুল আলোচিত এস আলম গ্রুপের পুনঃপ্রবেশের আইনি পথও বন্ধ হয়ে গেল। দীর্ঘ বিতর্ক, সমালোচনা এবং বিভিন্ন অংশীজনের আপত্তির পর ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এর বহুল আলোচিত ১৮(ক) ধারা বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এর ফলে রেজল্যুশন বা একীভূত হওয়া কোনো দুর্বল ব্যাংকের আগের মালিকরা আর আইনগতভাবে সেই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ বা নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ পাবেন না। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি আইনি সংশোধন নয়; বরং ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং অতীতে ব্যাংক থেকে অর্থ আত্মসাৎকারীদের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, "অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে সরকার ১৮(ক) ধারা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।" তিনি আরও বলেন, "আমাদের বার্তা স্পষ্ট—যারা জনগণের সম্পদ লুট করেছে, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। একইসঙ্গে আমানতকারীদের অর্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।"

কেন এত বিতর্ক?

গত ১০ এপ্রিল অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করার সময় শেষ মুহূর্তে ১৮(ক) নামে একটি নতুন ধারা যুক্ত করা হয়। ওই ধারায় বলা হয়েছিল, রেজল্যুশনের আওতায় যাওয়ার আগে যারা কোনো ব্যাংকের শেয়ারধারী ছিলেন, তারা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে পরবর্তীকালে আবার সেই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করতে পারবেন। সরকারের যুক্তি ছিল, আবেদনকারী যদি সরকারের দেওয়া অর্থ ফেরত দেন, নতুন মূলধন বিনিয়োগ করেন, আমানতকারীদের দায় পরিশোধ করেন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত শর্ত পূরণ করেন, তাহলে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ কমবে এবং ব্যাংক পুনরুদ্ধার সহজ হবে। তবে আইনটি সংসদে পাস হওয়ার পরপরই দেশজুড়ে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়।

কেন এস আলমকে ঘিরে বিতর্ক?

ব্যাংক খাতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এস আলম গ্রুপ। কারণ, একীভূত হওয়া পাঁচটি সংকটাপন্ন শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের মধ্যে চারটিই একসময় এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এগুলো হলো—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক। অপরদিকে এক্সিম ব্যাংক ছিল নাসা গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে। অভিযোগ রয়েছে, আগের সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে এসব ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়া হয়। সেই ঋণের বড় অংশই পরে খেলাপিতে পরিণত হয়। ফলে ব্যাংকগুলো মারাত্মক তারল্য সংকট ও মূলধন ঘাটতিতে পড়ে। এই অবস্থায় ১৮(ক) ধারা বহাল থাকলে বিতর্কিত পুরোনো মালিকরা আবারও ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন—এমন আশঙ্কা থেকেই তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

পাঁচ ব্যাংকের ভয়াবহ চিত্র

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা, যা তাদের মোট ঋণের প্রায় ৭৯ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে ইউনিয়ন ব্যাংকে। এরপর রয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক। ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে এটিকে অন্যতম বড় আর্থিক সংকট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

সমালোচনার মুখে বদলে গেল সিদ্ধান্ত

১৮(ক) ধারা যুক্ত হওয়ার পর বিরোধী রাজনৈতিক দল ছাড়াও অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার, ব্যবসায়ী সংগঠন, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি), অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর বিরোধিতা করে। টিআইবি এই উদ্যোগকে ‘আত্মঘাতীমূলক’ আখ্যা দিয়ে বলেছিল, এতে ব্যাংক লুটেরাদের পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি হবে এবং ব্যাংক খাতে সংস্কারের উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। বিশ্বব্যাংকও ব্যাংক রেজল্যুশন আইনকে আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার ওপর গুরুত্ব দেয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, এই বিতর্ক সরকারের ব্যাংক খাত সংস্কার কর্মসূচিকে প্রশ্নের মুখে ফেলছিল।

সরকারের নতুন বার্তা

১৮(ক) ধারা বাতিলের ফলে এখন থেকে রেজল্যুশনের আওতায় থাকা কোনো দুর্বল ব্যাংকের আগের মালিক আর সেই ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবেন না। অর্থমন্ত্রী সংসদে আরও জানান, জনগণের অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলায় দেশে ও বিদেশে প্রায় ৭২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ বা ফ্রিজ করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, একীভূত পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। ব্যক্তিগত আমানতকারীরা চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত তুলতে পারছেন এবং অবশিষ্ট অর্থ ধাপে ধাপে পরিশোধ করা হবে।

সামনে কী?

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিতর্কিত ধারা বাতিল নিঃসন্দেহে ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে এটিই শেষ নয়। তাদের মতে, ব্যাংক খাতে টেকসই সংস্কারের জন্য খেলাপি ঋণ আদায়, অর্থ পাচারকারীদের বিচার, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পরিচালনা পর্ষদে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ, শুধু আইনের একটি ধারা বাতিল করলেই সংকটের সমাধান হবে না। বরং যারা ব্যাংক থেকে জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান বিচার এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে আর্থিকভাবে পুনরুদ্ধার করাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, ১৮(ক) ধারা বাতিলের মাধ্যমে সরকার একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—ব্যাংক লুট করে আবার সেই ব্যাংকের মালিক হওয়ার সুযোগ আর থাকবে না। এটি আমানতকারীদের আস্থা পুনর্গঠন এবং ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।  

জেটিভি নিউজ বাংলা

দেশ ও দশের কথা বলে.....