সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে প্রথম দিনেই ৭৯ হাজারের বেশি কাঁচা চামড়া, দর নিয়ে আক্ষেপ ও বাজারে মিশ্র চিত্র
জেটিভি নিউজ বাংলা
তারিখ: ২৮ মে ২০২৬ ইং | সময়: রাত০৯:৩৬ মিনিট। ঈদুল আজহার প্রথম দিনেই ঢাকার সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতেপ্রবেশ শুরু হয়েছে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়ার। বৃহস্পতিবার (২৮ মে) দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মোট ৩৪১টি ট্রাকে করে শিল্পনগরীতে এসেছে ৭৯ হাজার ২১৮টি কাঁচা চামড়া। এর মধ্যে গরু ও মহিষের চামড়া রয়েছে ৭৮ হাজার ৫১৫টি এবং ছাগল-ভেড়ার চামড়া ৭০৩টি। এ তথ্য জানিয়েছেন চামড়া শিল্পনগরীর বিসিক কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মেহরাজুল মাইয়ান। সরেজমিনে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত চামড়া শিল্পনগরী ঘুরে দেখা যায়, চামড়া প্রবেশ, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনায় কোনো দৃশ্যমান বিশৃঙ্খলা নেই। ঈদের অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে এবং চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে বিসিক, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় ও জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, আগামী দুই দিনে চামড়া সংগ্রহের পরিমাণ আরও বাড়বে। বিসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী মেহরাজুল মাইয়ান জানান, দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১৯২টি ট্রাকে করে শিল্পনগরীতে আসে ৪৩ হাজার ৮৬৭টি কাঁচা চামড়া। এর মধ্যে গরু ও মহিষের চামড়া ছিল ৪৩ হাজার ৫১৪টি এবং ছাগল-ভেড়ার চামড়া ৩৫৩টি। তিনি বলেন, শিল্পনগরীতে আসা চামড়াগুলো দ্রুত সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করার কাজ চলছে। পাশাপাশি পরিবহন ও ব্যবস্থাপনায় সব ধরনের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চামড়া প্রবেশের সংখ্যা আরও বাড়বে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অতিরিক্ত স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগসহ সব দফতরের সঙ্গে সমন্বয় অব্যাহত রয়েছে। শিল্পনগরীর প্রধান ফটকে দায়িত্বপালনরত কর্মীরা জানান, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সর্বপ্রথম কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে একটি গাড়ি শিল্পনগরীতে প্রবেশ করে। দিনের প্রথম ধাপে আসা অধিকাংশ চামড়াই ছিল রক্তমাখা। আড়ত ও ট্যানারিতে প্রবেশের পর শ্রমিকরা এসব চামড়ায় লবণ মাখিয়ে সংরক্ষণের কাজ শুরু করেন। তবে বিকাল ৫টা পর্যন্ত মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা এবং ট্যানারিতে সরাসরি চামড়া নিয়ে আসা মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে দর নিয়ে তেমন অভিযোগ না পাওয়া গেলেও শিল্পনগরী সংলগ্ন আড়তগুলোতে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। সেখানে চামড়া নিয়ে আসা অনেকেই দাম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। একাধিক মৌসুমি ব্যবসায়ীর অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত দামের অনুপাতে রক্তমাখা কাঁচা চামড়ার যে মূল্য হওয়া উচিত, আড়তদাররা তার চেয়ে অনেক কম দাম প্রস্তাব করছেন। তবে ট্যানারিতে চামড়া নিয়ে যাওয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার প্রতিনিধি এবং ব্যবসায়ীরা বলছেন, আড়তের তুলনায় ট্যানারিতে তারা তুলনামূলক ভালো দর পাচ্ছেন। অনেকেই পূর্ব পরিচিত ট্যানারিতে দরদাম ছাড়াই চামড়া লবণজাত করার জন্য রেখে যাচ্ছেন এবং পরে দর নির্ধারণের জন্য ট্যানারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবেন। তাদের দাবি, ট্যানারিতে দর নিয়ে জটিলতা তুলনামূলক কম হয়। বলিয়ারপুর এলাকার মৌসুমি ব্যবসায়ী পরেশ জানান, তিনি ৩০ পিস চামড়া নিয়ে আড়তে বিক্রি করতে এসে হতাশ হয়েছেন। তার ভাষায়, “৭০০ টাকা দরে যেই চামড়া কিনেছি, সেই চামড়ার দর আড়তে ৬০০ টাকা বলছে। লাভ তো দূরে থাক, এমন হলে তো গাড়ি ভাড়াও পকেট থেকে যাবে।” একই ধরনের অভিযোগ করেন টঙ্গীর গাজিপুরা এলাকার একটি মাদ্রাসা থেকে ২০০ পিস চামড়া নিয়ে আসা আরেক ব্যক্তি। তিনি বলেন, আড়তে খুব কম দাম বলা হচ্ছে, তাই তারা ট্যানারির ভেতরে চামড়া নিয়ে যাচ্ছেন এবং আশা করছেন সেখানে তুলনামূলক ভালো দাম মিলবে। অভিযোগের আংশিক সত্যতা স্বীকার করে হেমায়েতপুর চামড়ার আড়ত মালিক সমিতির সভাপতি আজিজুর রহমান বলেন, মূল সমস্যা অর্থসংকট। ট্যানারিগুলোর কাছে বিপুল পরিমাণ টাকা বকেয়া রয়েছে। নগদ প্রবাহ কম এবং ঋণসুবিধা না থাকায় বেশি চামড়া এলে কিনতে সমস্যা হয়। তবে তিনি দাবি করেন, আড়তদাররা সাধারণত সরকার নির্ধারিত মূল্যের অনুপাতেই দাম দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং চামড়ার আকার ও মানও মূল্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এদিকে বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই মৌসুমেও ট্যানারি মালিকদের মধ্যে চামড়া কেনার সেই আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না, যা একসময় ছিল। সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দরপতন, এলডাব্লিউজি সনদের অভাব এবং রফতানিতে অতিরিক্ত চীননির্ভরতা এর বড় কারণ। ট্যানারি মালিকরা বলছেন, একসময় কোরবানির মৌসুমে চামড়া কেনাবেচাকে ঘিরে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হলেও এখন সেই চিত্র অনেকটাই ম্লান। ব্যবসায়িক মন্দা, ধারাবাহিক দরপতন, একক বাজারনির্ভরতা ও লোকসানের কারণে বহু ব্যবসায়ী আর্থিক সংকটে পড়েছেন এবং কেউ কেউ ঋণখেলাপিও হয়েছেন। আজমীর লেদারের মালিক শহিদুল্লাহ জানান, এ বছর তাদের লক্ষ্য ২০ হাজার পিস চামড়া কেনা। ইতিমধ্যে প্রায় পাঁচ হাজার চামড়া এসেছে। তিনি বলেন, পুরোনো সম্পর্কের ভিত্তিতে যারা চামড়া নিয়ে আসছেন, তাদের কাছ থেকেই মূলত কেনা হচ্ছে। কারণ তার কারখানায় এখনও ৫০ হাজার পিসের বেশি চামড়া মজুত রয়েছে। ব্যবসার পরিবেশ উন্নত হলে তা সবার জন্যই ভালো হবে, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেকের মূলধন অর্ধেকে নেমে এসেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সাধারণ সম্পাদক এবং সমতা লেদারের মালিক মিজানুর রহমান জানান, এ বছর প্রায় এক কোটি পিস কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে। তিনি বলেন, বাজার পরিস্থিতি আপাতত ভালো রয়েছে। তবে বড় পরিসরের কেনাবেচা মূলত রাতেই হয়, আর রাতে দিনের মতো প্রতিটি চামড়া ভালোভাবে পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না। এ কারণে দর নিয়ে কিছু জটিলতা তৈরি হতে পারে। তারপরও এখন পর্যন্ত বাজার পরিস্থিতিকে ইতিবাচক বলেই মনে করছেন তিনি।জেটিভি নিউজ বাংলা
সত্য প্রকাশে অঙ্গিকারবদ্ধ.....

সাভার প্রতিনিধি 




















