জামায়াত-বিএনপির সম্পর্ক নিয়ে নতুন আলোচনা, সরকার ও বিরোধী দলে ‘সমন্বয়’ দেখছেন বিশ্লেষকদের একাংশ
জেটিভি নিউজ বাংলা
তারিখ: ১৮ মে ২০২৬ ইং| সময়: ১০:০৩ মিনিট নির্বাচনের আগে বিভিন্ন ইস্যুতে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাদের মধ্যে তীব্র বিরোধিতা দেখা গেলেও সরকার গঠনের পর ভিন্ন চিত্র সামনে এসেছে। সরকার ও বিরোধী আসনে অবস্থান করলেও বেশ কিছু বিষয়ে দুই দলের মধ্যে এক ধরনের ‘বোঝাপড়া’ বা সমন্বয় রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের একটি অংশ। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি এবং আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাখার প্রশ্নে দুই দলের মধ্যে অঘোষিত ঐক্যের ইঙ্গিত দেখছেন তারা। বিশ্লেষকদের মতে, সরকারপ্রধান ও বিরোধীদলীয় নেতার বৈঠক, জ্বালানি সংকট মোকাবিলা, বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের এলাকায় উন্নয়ন কার্যক্রম, স্থানীয় পর্যায়ের বিচার-সালিশ এবং হাঁট-বাজারের ইজারা—এসব ক্ষেত্রেও দুই পক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের ছাপ রয়েছে। তাদের ভাষ্য, প্রকাশ্যে রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকলেও ভেতরে ভেতরে দুই দলের মধ্যে এক ধরনের ঐক্য কাজ করছে। ক্ষমতাসীন বিএনপি ও প্রধান বিরোধী দল জামায়াতের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। গত দুই দশকে রাজপথ থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পরিচালনার নানা পর্যায়ে দুই দলের ঘনিষ্ঠতা ছিল দৃশ্যমান। তবে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাদের রাজনৈতিক পথ আলাদা হয়ে যায়। বিশেষ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণায় দুই দলের শীর্ষ নেতারা একে অপরকে লক্ষ্য করে কড়া বক্তব্য দেন। বিএনপির পক্ষ থেকে জামায়াতকে ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ বলা হয়, অন্যদিকে জামায়াতের নেতারা বিএনপিকে ‘চাঁদাবাজ’ আখ্যা দেন। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। তবে নির্বাচনের পর সেই উত্তেজনার চিত্র অনেকটাই বদলে যায়। সম্প্রতি বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা করবো না। সরকারের ভালো কাজেরও প্রশংসা করবো।’ তার এ বক্তব্যের পর সরকার ও বিরোধী দলের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে। তবে কেউ কেউ এই সমন্বয়কে সময়োপযোগী বলেও মনে করছেন। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সভাপতি আবু সালেহ আকন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতসহ সামগ্রিক অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে, পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটও রয়েছে। তাই দেশের স্বার্থে সরকার ইতিবাচক বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নিলে বিরোধী দলের সহযোগিতা থাকা উচিত। আওয়ামী লীগ প্রশ্নেও দুই পক্ষের বোঝাপড়া প্রয়োজন বলে মত দেন তিনি। তার মতে, অতীতে উভয় পক্ষই নির্যাতনের শিকার হয়েছে এবং দেশের প্রয়োজনেই সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে ঐক্য জরুরি।জ্বালানি সংকটে শুরু সমন্বয়ের আলোচনা
ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে গত ফেব্রুয়ারি থেকেই দেশে জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। বিভিন্ন পাম্পে দীর্ঘ লাইন ও অচলাবস্থার মধ্যে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সহযোগিতার একটি ক্ষেত্র তৈরি হয়। গত ২৪ এপ্রিল সংসদের ২০তম অধিবেশনে এ সংকট নিরসনে দুই পক্ষের অংশগ্রহণে একটি কমিটি গঠন করা হয়। বিরোধীদলীয় নেতার পক্ষ থেকে সরকারকে সহযোগিতার প্রস্তাব দেওয়া হলে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতিবাচক সাড়া দেন। স্পিকারের কাছে বক্তব্য দেওয়ার আগ্রহ জানিয়ে তিনি ১০ সদস্যের একটি যৌথ কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন। পরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে প্রধান করে সরকার দলের পাঁচ সদস্যের নাম ঘোষণা করা হয়। অন্যদিকে বিরোধী দল থেকেও পাঁচ সদস্যের নাম চাওয়া হলে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এতে সম্মতি দেন এবং তালিকা জমা দেন। দুই পক্ষের দাবি, এ কমিটির কার্যক্রমের ফলে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে।আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের প্রশ্নে কাছাকাছি অবস্থান
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাখার বিষয়েও সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বড় ধরনের মতভেদ দেখা যায়নি। জুলাইয়ের সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত কোনও সত্তার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ জাতীয় সংসদ অনুমোদন করে। গত ৯ এপ্রিল সংসদে ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল’ পাস হয় এবং অধ্যাদেশের মূল বিষয়বস্তু অপরিবর্তিত রাখা হয়। নতুন আইনে কোনও ব্যক্তি বা সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি তাদের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা যুক্ত হয়। এর ফলে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর ওপর বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে। এ বিষয়ে জামায়াতের আমির সংসদে আলোচনার পক্ষে মত দিলেও সরকারপক্ষ তাতে বিশেষ আগ্রহ দেখায়নি। আবার বিরোধী দলও বিষয়টি নিয়ে জোরালো আপত্তি তোলেনি।যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যচুক্তি নিয়েও প্রশ্ন
নির্বাচনের তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া বাণিজ্যচুক্তি নিয়েও সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে এক ধরনের ঐক্যের আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে সংসদে বা রাজপথে এ নিয়ে জামায়াতের উল্লেখযোগ্য আপত্তি বা আন্দোলন না থাকায় বিভিন্ন মহলে এ প্রশ্ন উঠেছে। বিরোধী দল সংসদে বিষয়টি আলোচনায় না আনলেও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা আলোচনা করতে চাইলে সরকারপক্ষ তাকে সুযোগ দেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও চুক্তির সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে জামায়াত। সর্বশেষ ১৬ মে রংপুরে এক দলীয় কর্মসূচিতে এ বিষয়ে কথা বলেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমি অত্যন্ত দায়িত্ব নিয়ে বলছি, তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে কোনও একজন মানুষও এ বিষয় নিয়ে আমাদের সঙ্গে একটি শব্দ উচ্চারণ করেনি। এটাই হচ্ছে আমাদের ওপিনিয়ন।’ এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-এর সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তথাকথিত বিরোধী দল যতই সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ততা অস্বীকার করুক, জনগণ বিষয়টি বুঝতে পারছে। তার ভাষায়, ‘তারা মূলত আমরা আর মামুরা টাইপের সরকার চালাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, বাণিজ্যচুক্তিতে দুই পক্ষেরই সম্মতি ছিল বলে তাদের বিশ্বাস এবং এ বিষয়ে জবাবদিহি না থাকলে বিরোধী শক্তিগুলোকেই রাজপথে ভূমিকা রাখতে হবে।দুই ধরনের ব্যাখ্যা রাজনৈতিক অঙ্গনে
সরকার ও বিরোধী দল বাস্তবে লিয়াজোঁ বা সমন্বয়ের মাধ্যমে চলছে কিনা—এ প্রশ্নে রাজনৈতিক মহলে রয়েছে ভিন্নমত। বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর সহ-সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন মনে করেন, বর্তমান সরকার ও বিরোধী দল একে অপরের সহযোগী হলেও বাইরে বিরোধিতার চিত্র তুলে ধরছে। এতে জনগণের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। অন্যদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, জনগণের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তারা সরকারকে ছাড় দিচ্ছেন না। তবে ইতিবাচক কাজের প্রশংসা করলেও অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংসদ ও রাজপথে তাদের অবস্থান অব্যাহত থাকবে। এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, সরকার তার নিজস্ব গতিতে চলছে এবং এখন পর্যন্ত জনগণের স্বার্থবিরোধী কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। বিরোধী দল কখন কোন অবস্থান নেবে, সেটি তাদের নিজস্ব বিষয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।জেটিভি নিউজ বাংলা
সত্য প্রকাশে অঙ্গিকারবদ্ধ....

ডেস্ক রিপোর্ট 




















