নির্বাচনী উচ্ছ্বাসের আড়ালে অর্থনীতির নীরব অস্থিরতা
স্টাফ রিপোর্টার | JTV NEWS বাংলা
২৭ জানুয়ারি ২০২৬ ইংরেজি, ৬:৪০ পিএম।।
নির্বাচনের সময় এলেই কেন বাজারে অস্থিরতা বাড়ে? কেন বড় বিনিয়োগকারীরা নতুন প্রকল্পে হাত দিতে চান না? কেন ভোটের আগে অর্থনীতিতে হঠাৎ চাঙাভাব দেখা যায়, আর ভোট শেষ হলেই শুরু হয় কঠোর বাস্তবতা—এই প্রশ্নগুলো নতুন নয়।
অর্থনীতিবিদরা এই প্রবণতাকে ‘পলিটিক্যাল বিজনেস সাইকেল’ নামে চিহ্নিত করেন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, নির্বাচনের আগে সরকার জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে অর্থনীতিতে কৃত্রিম চাঙাভাব তৈরি করে, আর নির্বাচনের পর বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে কঠোর নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়।
নির্বাচনের সময় অর্থনীতির সাধারণ চিত্র
নির্বাচনী সময় ঘিরে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই কিছু অভিন্ন অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়।
১. সরকারি ব্যয়ের বৃদ্ধি
নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন সরকারগুলো সাধারণত জনসমর্থন বাড়াতে:
অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের চেষ্টা করে,
সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা ও সরকারি সহায়তা বাড়ায়,
প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বাজারে অর্থের সরবরাহ বাড়ায়, যা অনেক সময় মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি করে।
২. শেয়ার বাজারে অস্থিরতা ও বিনিয়োগ স্থবিরতা
নির্বাচনের ফলাফল ও ভবিষ্যৎ নীতি নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা সতর্ক হয়ে ওঠেন।
শেয়ার বাজারে হঠাৎ বড় ওঠানামা দেখা যায়,
দেশি ও বিদেশি বড় বিনিয়োগকারীরা ‘অপেক্ষা করো ও দেখো’ নীতি গ্রহণ করেন,
ফলে বেসরকারি বিনিয়োগের গতি সাময়িকভাবে কমে যায়।
৩. মূল্যস্ফীতি ও ভোগব্যয়ের চাপ
নির্বাচনী প্রচারণার সময় বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ বাজারে প্রবাহিত হয়। এর ফলে:
পণ্য ও সেবার চাহিদা বেড়ে যায়,
খাদ্যদ্রব্য, পরিবহন ও মুদ্রণ খাত সাময়িকভাবে চাঙা হয়,
অতিরিক্ত অর্থ প্রবাহের কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
৪. মুদ্রা পাচার ও ক্যাপিটাল ফ্লাইট
বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নির্বাচনী অনিশ্চয়তার সুযোগে:
প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীরা সম্পদ বিদেশে সরিয়ে নিতে পারেন,
এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও স্থানীয় মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি হয়।
৫. নির্বাচনের পর কঠোর অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত
ভোট শেষ হলে সরকারকে নির্বাচনের আগে নেওয়া অতিরিক্ত ব্যয়ের ভার সামাল দিতে হয়। তখন অনেক সময়:
কর বাড়ানো হয়,
ভর্তুকি কমানো হয়,
কঠোর আর্থিক সংস্কার গ্রহণ করা হয়।
দেশে দেশে নির্বাচনী অর্থনীতির ভিন্ন চিত্র
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, নির্বাচনী অর্থনীতি দেশভেদে ভিন্ন রূপ নেয়।
যুক্তরাষ্ট্রে, নির্বাচনের সময় পুঁজিবাজার সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। করনীতি ও বাণিজ্যনীতির পরিবর্তনের আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ খাতে ঝুঁকেন।
ভারতে, বিপুল নির্বাচনী ব্যয়ের কারণে সাময়িকভাবে ভোগব্যয় ও প্রবৃদ্ধি বাড়ে, তবে নির্বাচনের পর রাজস্ব ঘাটতি সামাল দিতে কঠোর নীতির প্রয়োজন দেখা দেয়।
বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতিতে, নির্বাচনকালীন অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ ও ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটলে নিত্যপণ্যের দামও বেড়ে যায়।
নির্বাচনের পর কী হয়?
অর্থনীতিবিদদের মতে, নির্বাচন শেষে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলে বিনিয়োগ আবার গতি পায়। নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তই মূলত পরবর্তী কয়েক বছরের প্রবৃদ্ধির গতিপথ নির্ধারণ করে।
সহজভাবে বলা যায়, নির্বাচন মানেই অর্থনীতির স্থায়ী অস্থিরতা নয়। তবে নির্বাচনকালীন কৃত্রিম চাঙাভাবের আড়ালে লুকিয়ে থাকে অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি। টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ ও দায়িত্বশীল নীতিনির্ধারণ।
জেটিভি নিউজ বাংলা
সত্য প্রকাশে অঙ্গিকারবদ্ধ....