জেটিভি নিউজ বাংলা
তারিখ: ০১ মে ২০২৬ ইং | সময়: ১০:৫০ মিনিট‘ব্ল্যাকলিস্টিং’ থেকে মুক্তি মিলছে না শ্রমিকদের, ব্যক্তিগত তথ্য নিয়েও শঙ্কা
সাভারের পোশাক খাতে দীর্ঘদিন কাজ করেও ‘ব্ল্যাকলিস্টিং’-এর বেড়াজালে আটকে পড়েছেন বহু শ্রমিক। তাদেরই একজন মো. মাইনুদ্দিন। প্রায় ১৫ বছর ধরে সাভারের বিভিন্ন পোশাক কারখানায় কাজ করার পর সর্বশেষ আশুলিয়ার স্কাই লাইন পোশাক কারখানায় কর্মরত ছিলেন তিনি। ২০২৪ সালের অক্টোবরে শ্রমিক আন্দোলনের পর চাকরি হারানোর পর তার নাম উঠে যায় বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)-এর একটি তথ্যভান্ডারে, যা শ্রমিকদের কাছে ‘কালো তালিকা’ বা ব্ল্যাকলিস্ট নামে পরিচিত। এরপর থেকে একাধিক কারখানায় চেষ্টা করেও আর চাকরি পাননি তিনি। শুধু মাইনুদ্দিনই নন, একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন আরও অনেক শ্রমিক। দীর্ঘদিন অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তথ্যভান্ডারে নাম থাকার কারণে তারা কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ। শ্রমিকদের দাবি ও আন্দোলনের মুখে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই তথ্যভান্ডার বাতিল করে অধ্যাদেশ জারি করে, যা পরে বিএনপি সরকার আইনে রূপ দেয়। তবে বাস্তবে এর প্রভাব খুব একটা পড়েনি বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। অন্যদিকে বিজিএমইএ দাবি করছে, বর্তমানে এ ধরনের কোনও ব্ল্যাকলিস্ট বা তথ্যভান্ডার পরিচালনা করা হচ্ছে না। তবে শ্রমিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতাদের মতে, নাম বদলে বা ভিন্ন পদ্ধতিতে এখনও ব্ল্যাকলিস্টিং কার্যক্রম চালু রয়েছে।শ্রম আইনে ব্ল্যাকলিস্টিং কী
বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী, কোনও প্রতিষ্ঠান বা মালিকদের সংগঠন যদি এমন কোনও তালিকা বা ডাটাবেজ তৈরি করে যার মাধ্যমে কোনও শ্রমিককে ভবিষ্যতে চাকরির অযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, সেটিই ব্ল্যাকলিস্টিং। আইনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, চাকরি শেষ হওয়ার পর কোনও শ্রমিককে এভাবে তালিকাভুক্ত করা যাবে না। ২০২১ সালে বিজিএমইএ একটি বায়োমেট্রিক তথ্যভান্ডার চালু করে, যেখানে শ্রমিকদের আঙুলের ছাপ, পরিচয়, রক্তের গ্রুপ এবং কর্মসংস্থানের তথ্য সংরক্ষণ করা হতো। অভিযোগ রয়েছে, এই তথ্যভান্ডারের মাধ্যমে অনেক শ্রমিককে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করা হয়, যার ফলে তারা অন্য কারখানায় চাকরি পাননি। যদিও পরবর্তীতে এই ব্যবস্থা বাতিল করা হয়।‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে তালিকা
ভুক্তভোগী শ্রমিকদের মতে, এই তালিকা এখন তাদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাইনুদ্দিন জানান, সম্প্রতি সাভারের কলমা, জামগড়া ও অন্যান্য এলাকার বিভিন্ন কারখানায় চাকরির জন্য গেলেও তাকে নেওয়া হয়নি। পুরোনো চাকরি হারানোর কারণ দেখিয়েই তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন আশুলিয়ার ইউনিকর্ন সোয়েটার্স কারখানার সাবেক শ্রমিক মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম। অসুস্থতার কারণে অনুপস্থিত থাকার সময় কারখানায় আন্দোলন চলছিল, পরে গিয়ে দেখেন তিনি ছাঁটাই তালিকায়। এরপর দুই বছর ধরে স্থায়ী কোনও চাকরি পাননি। কখনও সাব-কন্ট্রাক্ট কারখানা, কখনও দোকানে কাজ করে দিন কাটাচ্ছেন। শ্রমিকনেতাদের অভিযোগ শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, ব্ল্যাকলিস্টিং এখনও বন্ধ হয়নি। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইন বিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টুর মতে, মূলত শ্রমিকদের তথ্যভান্ডার তৈরি একটি ভালো উদ্যোগ হলেও তা এখন অপব্যবহারের শিকার। বিভিন্ন মালিকদের মধ্যে শ্রমিকদের ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করা হচ্ছে, যা উদ্বেগজনক। তিনি আরও বলেন, সরাসরি ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ শব্দ ব্যবহার না করলেও ‘টার্মিনেশন’ বা অন্যান্য নেতিবাচক শব্দ ব্যবহার করে শ্রমিকদের সম্পর্কে খারাপ ধারণা তৈরি করা হচ্ছে, যা কার্যত ব্ল্যাকলিস্টিংয়ের সমান। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন জানান, অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের যথাযথ অব্যাহতির কাগজ দেওয়া হয় না। ফলে তারা অন্য কারখানায় যোগ দিতে গেলে সমস্যায় পড়েন। তার মতে, আইনে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বাস্তবে ফাঁকফোকরের কারণে এই প্রথা চালু রয়েছে। বিজিএমইএ’র অবস্থান বিজিএমইএ’র জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও অনন্ত গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইনামুল হক খান দাবি করেছেন, বর্তমানে কোনও ব্ল্যাকলিস্ট সিস্টেম নেই। অতীতে এমন কিছু থাকলেও তা এখন বন্ধ হয়ে গেছে। কেউ লিখিতভাবে অভিযোগ করলে তদন্ত করা হবে বলেও জানান তিনি। তার ভাষায়, অনেক সময় শ্রমিকদের দক্ষতার ঘাটতির কারণেও চাকরি পাওয়া যায় না। সেটিকে ব্ল্যাকলিস্টিং হিসেবে দেখানো ঠিক নয়। বর্তমানে দক্ষ শ্রমিকের অভাব রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।আইনজীবী ও বিশেষজ্ঞদের মত
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও ব্লাস্টের পরিচালক (আইন) মো. বরকত আলী বলেন, আইন প্রণয়ন করা হলেও এর বাস্তব প্রয়োগ এখনো দেখা যাচ্ছে না। বিষয়টি নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদের মতে, একটি শিল্পে চাকরি হারানোর কারণে অন্য কোথাও কাজ করতে না পারা অযৌক্তিক। এতে শ্রমিকদের মধ্যে হতাশা ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। তিনি বিষয়টি সমাধানে আলোচনার মাধ্যমে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে বাধা নতুন আইন অনুযায়ী ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের জন্য কারখানা কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়নপত্র প্রয়োজন হয়। শ্রমিকনেতাদের অভিযোগ, এই নিয়ম শ্রমিকদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ আগেই ইউনিয়ন গঠনের উদ্যোগ জানতে পেরে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের চাকরি থেকে বাদ দেয়। শ্রম আইন ২০০৬-এর ১৭৮ ধারা অনুযায়ী, শ্রমিকদের অনুরোধের ১০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের তথ্য সরবরাহ করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা সবসময় মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলোর মতে, এই প্রক্রিয়া শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার পথ কঠিন করে তুলছে এবং অনেকেই ভয় পেয়ে উদ্যোগ নিতে পারছেন না।এ বিষয়ে বিজিএমইএ বলছে,
সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণ থাকলে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সব মিলিয়ে, আইন থাকলেও বাস্তব প্রয়োগের ঘাটতি এবং তথ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে সাভার-আশুলিয়ার পোশাক খাতের বহু শ্রমিক এখনও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।জেটিভি নিউজ বাংলা
সত্য প্রকাশে অঙ্গিকারবদ্ধ....

Reporter Name 











