জেটিভি নিউজ বাংলা
তারিখ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬ ইং | দুপুর ১২:২৭ মিনিট।এসএসসি পরীক্ষা ও শিক্ষানীতি নিয়ে প্রশ্ন—বাস্তবতার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে কি নীতিনির্ধারণ?
বাংলাদেশে এসএসসি পরীক্ষা শুধু একটি পাবলিক পরীক্ষা নয়; এটি সামাজিক বাস্তবতা, পারিবারিক প্রত্যাশা এবং একটি প্রজন্মের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। আগামী ২১ এপ্রিল শুরু হতে যাওয়া এই পরীক্ষাকে ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে উদ্বেগ, প্রত্যাশা ও প্রস্তুতির মিশ্র চিত্র দেখা যাচ্ছে। তবে এবারের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই প্রথম বড় পাবলিক পরীক্ষা। তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্য ও নীতিগত দিকনির্দেশনা ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মহলে কিছুটা বিভ্রান্তির জন্ম দিয়েছে বলে মতামত উঠে এসেছে। বিশেষ করে ‘নকল’ প্রতিরোধকে কেন্দ্র করে শিক্ষামন্ত্রীর জোরালো অবস্থান নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, একসময় পরীক্ষায় নকল একটি বড় সমস্যা ছিল এবং তা প্রতিরোধে কঠোর অবস্থান ইতিবাচক ফলও দিয়েছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমস্যার ধরন পরিবর্তিত হয়েছে। এখন প্রশ্নফাঁস, প্রযুক্তিনির্ভর অনিয়ম এবং মূল্যায়ন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা সংকট বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে কেবল পরীক্ষার হলভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ—যেমন সিসিটিভি স্থাপন, কঠোর শৃঙ্খলা আরোপ বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা—মূল সমস্যার সমাধান দিতে পারছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অনেকের মতে, সমস্যাটি এখন আরও কাঠামোগত এবং বহুমাত্রিক। শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে কারিকুলাম। গত এক দশকে একাধিক পরিবর্তনের ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে মত রয়েছে। কী শিখবে, কেন শিখবে এবং কীভাবে মূল্যায়ন হবে—এই মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে এখনও স্পষ্টতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর প্রভাব উচ্চশিক্ষা পর্যায়েও দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী ভালো ফলাফল অর্জন করলেও বাস্তব দক্ষতায় ঘাটতি থাকছে—যা শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। শিক্ষকদের মান, প্রণোদনা ও পেশাগত উন্নয়নের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। পর্যাপ্ত বেতন, সামাজিক মর্যাদা এবং প্রশিক্ষণের সুযোগের অভাবের কারণে এই পেশায় মেধাবীদের আগ্রহ কমছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে সামগ্রিক শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এদিকে সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত—যেমন পরীক্ষায় কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, দেরিতে এলে ফেল গণ্য করা বা কোচিং সেন্টার নিয়ন্ত্রণ—এসব পদক্ষেপ নিয়েও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের একাংশ মনে করছেন, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণমূলক দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা কখনোই ভয়ভিত্তিক হওয়া উচিত নয়। বরং এটি হওয়া উচিত শেখা, অনুসন্ধান ও সৃজনশীলতার একটি প্রক্রিয়া। শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক ও মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে শেখার প্রতি আগ্রহ বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব। নীতিনির্ধারণে সমন্বয়ের অভাবও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। পরীক্ষার সময়সূচি পরিবর্তন, সিলেবাস নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং বিভিন্ন শিক্ষাবোর্ড ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অসামঞ্জস্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে প্রভাব ফেলছে বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়া প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার নিয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বিশ্ব যখন দ্রুত ডিজিটাল শিক্ষার দিকে এগোচ্ছে, তখন প্রযুক্তিকে হুমকি হিসেবে নয়, বরং সম্ভাবনা হিসেবে কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ পরিস্থিতিতে শিক্ষামন্ত্রীর প্রতি প্রত্যাশা—তিনি মাঠপর্যায়ে গিয়ে বাস্তবতা পর্যবেক্ষণ করবেন, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করবেন এবং সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কার্যকর নীতি গ্রহণ করবেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, নকল প্রতিরোধ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়নের জন্য কারিকুলাম সংস্কার, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন পদ্ধতির আধুনিকীকরণ এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি—এসব বিষয়ের ওপর সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। সবশেষে প্রশ্ন উঠছে—শিক্ষার্থীদের কেবল শাস্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, নাকি তাদের সক্ষম করে তোলার দিকে জোর দেওয়া হবে? শিক্ষাবিদদের মতে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে দ্বিতীয় পথটিকেই অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। (সংকলিত/রূপান্তরিত: চিররঞ্জন সরকারের কলাম অবলম্বনে)জেটিভি নিউজ বাংলা
সত্য প্রকাশে অঙ্গিকারবদ্ধ.....

Reporter Name 






















