ঢাকা , রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
নোয়াখালীতে ছাত্রদল-আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সংঘর্ষ, মোটরসাইকেল ও কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ; আহত অন্তত ৬ যুদ্ধবিরতি কাগজে-কলমে, যুদ্ধ চলছে মাঠে: আন্তর্জাতিক আইন কি ব্যর্থ? ২৪ ঘণ্টায় হামে আরও ৩ জনের মৃত্যু, নতুন উপসর্গ শনাক্ত ১ হাজার ৩২ জনের কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগে সর্বোচ্চ গুরুত্ব, নতুন বাজেটে অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর বড় পরিকল্পনা বাংলাদেশ–তুরস্ক সম্পর্ক জোরদার, প্রতিরক্ষা ও আইসিটি খাতে যৌথ কাজের ঘোষণা পদ্মা নদী থেকে উদ্ধার করা হলো ঢাকাগামী ‘এসবি সুপার ডিলাক্স’ বাস, নেই কোনো প্রাণহানির খবর প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ঠ জনজীবন, বাড়ছে অসুস্থতা বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবনে ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন করছে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশ্বখ্যাত গ্রাফিক নভেল ‘পার্সেপোলিস’-এর স্রষ্টা মারজান সাত্রাপি আর নেই ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত করতে প্রতিনিধি পরিষদে প্রস্তাব পাস

শেরপুরের নবীনগরে ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী পৌষ মেলা: ইতিহাস, জনশ্রুতি আর গ্রামবাংলার উৎসব

  • Reporter Name
  • আপডেট সময় ১২:২০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬
  • ৩০ বার পড়া হয়েছে

জেটিভি নিউজ বাংলা

তারিখ : ১৪ এপ্রিল ২০২৬ ইং| শেরপুর,সময় :১২:২০ মিনিট।

শেরপুরের নবীনগরে ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী পৌষ মেলা: ইতিহাস, জনশ্রুতি আর গ্রামবাংলার উৎসব

শেরপুর পৌরসভার নবীনগর এলাকায় প্রতি বছরই বসে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পৌষ মেলা। প্রায় ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে পৌষ সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হয়ে আসা এই মেলাটি স্থানীয়দের কাছে শুধু একটি আয়োজন নয়, বরং ইতিহাস ও বিশ্বাসের এক জীবন্ত নিদর্শন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বোরো আবাদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে আগেভাগেই মেলার আয়োজন করা হচ্ছে। তবুও এর ঐতিহ্য ও গুরুত্ব একটুও কমেনি। স্থানীয়দের মুখে মুখে প্রচলিত রয়েছে এই মেলার শুরুর এক রহস্যময় কাহিনি। জনশ্রুতি অনুযায়ী, নবীনগরের প্রায় তিন একর জমির ওপর গড়ে ওঠে ছাওয়াল পীরের দরগা। সেই দরগাকেই কেন্দ্র করে শুরু হয় এই পৌষ মেলার যাত্রা। নবীনগরের বাসিন্দা, প্রবীণ আইনজীবী ও সাংবাদিক ফকির আকতারুজ্জামান জানান, “আমার বয়স এখন ৮০ বছর। ঠিক কবে বা কীভাবে এই মেলার শুরু, তা নির্দিষ্ট করে বলতে পারি না। তবে পূর্ব-পুরুষদের কাছ থেকে শুনেছি, ছাওয়াল পীরের আগমন ঘিরেই এই মেলার সূচনা।” ছাওয়াল পীরকে ঘিরে রয়েছে আরও একটি বিস্ময়কর ঘটনা। জানা যায়, তিনি মূলত ঈশ্বরগঞ্জের বাসিন্দা ছিলেন। মৃত্যুর পর তার অনুসারীরা মরদেহ নবীনগরে নিয়ে আসেন। কবর দেওয়ার সময় নানা বাধার মুখে পড়তে হয় তাদের। উত্তর-দক্ষিণ দিকে কবর দিতে গেলে বারবার মাটি ধসে পড়ে। পরে পূর্ব-পশ্চিম দিকে কবর খুঁড়লে আর কোনো সমস্যা হয়নি। সেই জায়গাতেই সমাধিস্থ করা হয় ছাওয়াল পীরকে। পরবর্তীতে তার দরগাকে ঘিরেই শুরু হয় এই মেলা। এছাড়াও স্থানীয়দের মধ্যে আরেকটি কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। শেরপুর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের লাইব্রেরিয়ান মো. শহীদুজ্জমান শহীদ জানান, এক কৃষক মাঠে কাজ করার সময় বারবার মইয়ের রশি ছিঁড়ে যাওয়ায় মানত করেন—সমস্যা সমাধান হলে তিনি পীরের মাজারে শিন্নি দেবেন। পরে আর রশি না ছিঁড়লেও তিনি মানত পূরণ করতে ভুলে যান। এক রাতে স্বপ্নে পীর তাকে স্মরণ করিয়ে দেন। এরপর মানত পূরণ করলে তার সব কাজ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়। এরপর থেকেই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ মানত নিয়ে এখানে আসতে শুরু করে, আর ধীরে ধীরে মেলাটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বর্তমানে ছাওয়াল পীরের দরগার পাশেই রোয়া বিলের তীরে বসে এই মেলা। এখানে পাওয়া যায় গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নানা খাবার—মুড়ি-মুড়কি, মোয়া, নিমকি, গজা, খোরমা, তিলের খাজা, কটকটি, চানাচুরসহ আরও অনেক কিছু। পাশাপাশি মৃৎশিল্পীদের হাতে তৈরি খেলনা ও তৈজসপত্র, শিশুদের খেলনা, নারীদের প্রসাধনী ও চুড়ি-মালার দোকানও বসে। এক সময় এই মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিল ঘোড়দৌড় ও গাঙ্গি খেলা। আশপাশের জেলা থেকে ঘোড়সওয়াররা এসে অংশ নিতেন প্রতিযোগিতায়, যা দর্শকদের জন্য ছিল বিশেষ আকর্ষণ। স্থানীয়দের মতে, পৌষ মেলা মানেই উৎসবের আমেজ। পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে পুরো এলাকা হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। তবে সময়ের সাথে সাথে সেই পুরনো জৌলুস কিছুটা কমে এসেছে বলে মনে করেন অনেকেই। তারা মনে করেন, একটি সুসংগঠিত আয়োজন কমিটি থাকলে এই ঐতিহ্য আরও সুন্দরভাবে সংরক্ষণ ও বিকাশ করা সম্ভব। প্রাচীন ঐতিহ্য, লোকবিশ্বাস আর গ্রামীণ সংস্কৃতির মেলবন্ধনে শেরপুরের নবীনগরের পৌষ মেলা আজও বয়ে চলেছে তার নিজস্ব ঐতিহ্যের ধারা।  

জেটিভি নিউজ বাংলা

সত্য প্রকাশে অঙ্গিকারবদ্ধ....

ট্যাগস

জনপ্রিয় সংবাদ

নোয়াখালীতে ছাত্রদল-আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সংঘর্ষ, মোটরসাইকেল ও কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ; আহত অন্তত ৬

শেরপুরের নবীনগরে ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী পৌষ মেলা: ইতিহাস, জনশ্রুতি আর গ্রামবাংলার উৎসব

আপডেট সময় ১২:২০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

জেটিভি নিউজ বাংলা

তারিখ : ১৪ এপ্রিল ২০২৬ ইং| শেরপুর,সময় :১২:২০ মিনিট।

শেরপুরের নবীনগরে ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী পৌষ মেলা: ইতিহাস, জনশ্রুতি আর গ্রামবাংলার উৎসব

শেরপুর পৌরসভার নবীনগর এলাকায় প্রতি বছরই বসে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পৌষ মেলা। প্রায় ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে পৌষ সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হয়ে আসা এই মেলাটি স্থানীয়দের কাছে শুধু একটি আয়োজন নয়, বরং ইতিহাস ও বিশ্বাসের এক জীবন্ত নিদর্শন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বোরো আবাদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে আগেভাগেই মেলার আয়োজন করা হচ্ছে। তবুও এর ঐতিহ্য ও গুরুত্ব একটুও কমেনি। স্থানীয়দের মুখে মুখে প্রচলিত রয়েছে এই মেলার শুরুর এক রহস্যময় কাহিনি। জনশ্রুতি অনুযায়ী, নবীনগরের প্রায় তিন একর জমির ওপর গড়ে ওঠে ছাওয়াল পীরের দরগা। সেই দরগাকেই কেন্দ্র করে শুরু হয় এই পৌষ মেলার যাত্রা। নবীনগরের বাসিন্দা, প্রবীণ আইনজীবী ও সাংবাদিক ফকির আকতারুজ্জামান জানান, “আমার বয়স এখন ৮০ বছর। ঠিক কবে বা কীভাবে এই মেলার শুরু, তা নির্দিষ্ট করে বলতে পারি না। তবে পূর্ব-পুরুষদের কাছ থেকে শুনেছি, ছাওয়াল পীরের আগমন ঘিরেই এই মেলার সূচনা।” ছাওয়াল পীরকে ঘিরে রয়েছে আরও একটি বিস্ময়কর ঘটনা। জানা যায়, তিনি মূলত ঈশ্বরগঞ্জের বাসিন্দা ছিলেন। মৃত্যুর পর তার অনুসারীরা মরদেহ নবীনগরে নিয়ে আসেন। কবর দেওয়ার সময় নানা বাধার মুখে পড়তে হয় তাদের। উত্তর-দক্ষিণ দিকে কবর দিতে গেলে বারবার মাটি ধসে পড়ে। পরে পূর্ব-পশ্চিম দিকে কবর খুঁড়লে আর কোনো সমস্যা হয়নি। সেই জায়গাতেই সমাধিস্থ করা হয় ছাওয়াল পীরকে। পরবর্তীতে তার দরগাকে ঘিরেই শুরু হয় এই মেলা। এছাড়াও স্থানীয়দের মধ্যে আরেকটি কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। শেরপুর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের লাইব্রেরিয়ান মো. শহীদুজ্জমান শহীদ জানান, এক কৃষক মাঠে কাজ করার সময় বারবার মইয়ের রশি ছিঁড়ে যাওয়ায় মানত করেন—সমস্যা সমাধান হলে তিনি পীরের মাজারে শিন্নি দেবেন। পরে আর রশি না ছিঁড়লেও তিনি মানত পূরণ করতে ভুলে যান। এক রাতে স্বপ্নে পীর তাকে স্মরণ করিয়ে দেন। এরপর মানত পূরণ করলে তার সব কাজ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়। এরপর থেকেই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ মানত নিয়ে এখানে আসতে শুরু করে, আর ধীরে ধীরে মেলাটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বর্তমানে ছাওয়াল পীরের দরগার পাশেই রোয়া বিলের তীরে বসে এই মেলা। এখানে পাওয়া যায় গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নানা খাবার—মুড়ি-মুড়কি, মোয়া, নিমকি, গজা, খোরমা, তিলের খাজা, কটকটি, চানাচুরসহ আরও অনেক কিছু। পাশাপাশি মৃৎশিল্পীদের হাতে তৈরি খেলনা ও তৈজসপত্র, শিশুদের খেলনা, নারীদের প্রসাধনী ও চুড়ি-মালার দোকানও বসে। এক সময় এই মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিল ঘোড়দৌড় ও গাঙ্গি খেলা। আশপাশের জেলা থেকে ঘোড়সওয়াররা এসে অংশ নিতেন প্রতিযোগিতায়, যা দর্শকদের জন্য ছিল বিশেষ আকর্ষণ। স্থানীয়দের মতে, পৌষ মেলা মানেই উৎসবের আমেজ। পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে পুরো এলাকা হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। তবে সময়ের সাথে সাথে সেই পুরনো জৌলুস কিছুটা কমে এসেছে বলে মনে করেন অনেকেই। তারা মনে করেন, একটি সুসংগঠিত আয়োজন কমিটি থাকলে এই ঐতিহ্য আরও সুন্দরভাবে সংরক্ষণ ও বিকাশ করা সম্ভব। প্রাচীন ঐতিহ্য, লোকবিশ্বাস আর গ্রামীণ সংস্কৃতির মেলবন্ধনে শেরপুরের নবীনগরের পৌষ মেলা আজও বয়ে চলেছে তার নিজস্ব ঐতিহ্যের ধারা।  

জেটিভি নিউজ বাংলা

সত্য প্রকাশে অঙ্গিকারবদ্ধ....