ঢাকা , শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
দরিদ্রদের চাল ব্যবসায়ীর গুদামে! নাটোরে ৭৩ বস্তা সরকারি চাল জব্দ রাজধানীতে অতিরিক্ত কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ডিএমপি ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর হামের পর এবার ডেঙ্গুর প্রকোপে বিপর্যস্ত ময়মনসিংহ, হাসপাতালে রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম সরকারি অর্থ সাশ্রয় করে ৪০ লাখ ৮০ হাজার টাকা ফেরত, শাহরাস্তিতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি খাল খনন আফতাবনগর প্রকল্পের ভেতরে ২১ কোটি টাকার সরকারি খাস জমি উদ্ধার দেশকে অস্থিতিশীল করতে গুজব ও উসকানি ছড়ানো হচ্ছে: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অপরাধ অনেক নিয়ন্ত্রণে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গাড়িবহর ছাড়াই সচিবালয় থেকে হেঁটে অনুষ্ঠানস্থলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের ভর্তুকির সার সাগরপথে নিয়মিত মিয়ানমারে পাচার, দুই মাসে জব্দ ৩ হাজার ৩১০ বস্তা

ডলারের বিকল্প খুঁজছে বাংলাদেশ? সিআইপিএস ও পান্ডা বন্ড নিয়ে চীনের প্রস্তাবে ইতিবাচক বাংলাদেশ ব্যাংক

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ১১:৩১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
  • ৩৬ বার পড়া হয়েছে

জেটিভি নিউজ বাংলা

তারিখ: ১০ জুন ২০২৬ ইং,সময়: সকাল ১১:৩১ মিনিট। ফাইল ছবি

ডলারের বিকল্প খুঁজছে বাংলাদেশ? সিআইপিএস ও পান্ডা বন্ড নিয়ে চীনের প্রস্তাবে ইতিবাচক বাংলাদেশ ব্যাংক

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত এক্সিম ব্যাংকের প্রস্তাবের পর দেশটির ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম (সিআইপিএস) এবং পান্ডা বন্ডের মাধ্যমে অর্থায়নের সুযোগ নিয়ে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মঙ্গলবার, ৯ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে চীনা প্রতিনিধি দলের এক বৈঠকে বিষয় দুটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, দেশের কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক সিআইপিএস প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগতভাবে কোনো আপত্তি নেই। একইসঙ্গে চীনের অভ্যন্তরীণ বন্ড বাজারে পান্ডা বন্ড ইস্যুর সম্ভাবনাও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন, ডলারের আধিপত্য নিয়ে বিতর্ক এবং বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থার চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুযোগ হতে পারে। তবে এর প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং আর্থিক সম্পর্ক কতটা গভীর হয় তার ওপর।

কী এই সিআইপিএস?

সিআইপিএস বা ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম হলো চীনের কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থা, যা ২০১৫ সালে চালু হয়। এর মূল লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনে চীনা মুদ্রা রেনমিনবি (আরএমবি) বা ইউয়ানের ব্যবহার বৃদ্ধি করা। বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন সুইফট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। তবে রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির কারণে অনেক দেশ বিকল্প পেমেন্ট অবকাঠামোর দিকে ঝুঁকছে। সেই প্রেক্ষাপটে সিআইপিএসকে সুইফটের বিকল্প কিংবা পরিপূরক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সিআইপিএস মূলত একটি আন্তর্জাতিক পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যত বেশি লেনদেনের চ্যানেল থাকবে, ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগও তত বাড়বে। কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক চাইলে নিজস্ব উদ্যোগে এই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হতে পারবে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সিআইপিএসে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো নিয়ন্ত্রক বাধা বা অতিরিক্ত অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তা বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরে আসেনি। তবে কোনো ব্যাংক বাস্তবে সংযুক্তির উদ্যোগ নিলে তখন প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো আরও পরিষ্কার হবে। কেন গুরুত্ব পাচ্ছে সিআইপিএস? বাংলাদেশের আমদানির সবচেয়ে বড় উৎস দেশ চীন। প্রতি বছর বাংলাদেশ প্রায় ২০ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য চীন থেকে আমদানি করে। অন্যদিকে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। বর্তমানে এই বাণিজ্যের অধিকাংশ নিষ্পত্তি হয় মার্কিন ডলারে। সিআইপিএসের মাধ্যমে ভবিষ্যতে ইউয়ানভিত্তিক লেনদেন বৃদ্ধি পেলে ডলারের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমতে পারে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার বাজারের ওপর চাপ কমানোরও সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করেন, শুধুমাত্র নতুন একটি পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়াই যথেষ্ট নয়। এর কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইউয়ানের ব্যবহার কতটা বাড়ছে তার ওপর। এক কর্মকর্তা বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আরএমবির ব্যবহার যত বাড়বে, সিআইপিএসের গুরুত্বও তত বৃদ্ধি পাবে। তাৎক্ষণিক সুফল কতটা? অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশ তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের সুবিধা নাও পেতে পারে। কারণ, বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য ভারসাম্যহীন। আমদানির পরিমাণ অনেক বেশি হলেও রপ্তানি সীমিত। ফলে ইউয়ানে লেনদেনের জন্য পর্যাপ্ত মুদ্রা প্রবাহ তৈরি হয় না। গবেষণা প্রতিষ্ঠান র‌্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সিআইপিএস দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিকল্প হতে পারে। তবে শুধুমাত্র ইউয়ানভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করলেই বড় সুবিধা মিলবে না। তার মতে, চীনা বিনিয়োগ, অবকাঠামো ঋণ, শিল্প খাতে অর্থায়ন এবং যৌথ প্রকল্প বৃদ্ধি পেলে ইউয়ানভিত্তিক আর্থিক প্রবাহ তৈরি হবে। তখন আন্তঃসীমান্ত লেনদেন আরও সহজ ও কার্যকর হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, অন্যথায় বাংলাদেশকে শেষ পর্যন্ত আবারও অধিকাংশ লেনদেনের জন্য ডলারের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। আলোচনায় পান্ডা বন্ডও বাংলাদেশ ব্যাংক ও চীনা প্রতিনিধি দলের বৈঠকে পান্ডা বন্ড ইস্যুর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। পান্ডা বন্ড হলো চীনের অভ্যন্তরীণ বন্ড বাজারে বিদেশি সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা অথবা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ইস্যু করা ইউয়ানভিত্তিক ঋণপত্র। এর মাধ্যমে বিদেশি সরকার বা প্রতিষ্ঠান সরাসরি চীনা বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। বাংলাদেশ ভবিষ্যতে পান্ডা বন্ড ইস্যু করলে চীনের বিশাল বন্ড বাজার থেকে ইউয়ানে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে বৈদেশিক অর্থায়নের উৎস আরও বহুমুখী হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চ সুদের ঋণের বিকল্প উৎস পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত মূলত সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনা ও অর্থায়ন কৌশলের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় অর্থ মন্ত্রণালয়ই এ বিষয়ে নেতৃত্ব দেবে। প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংক মতামত ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করবে। চীনের পুরোনো আগ্রহ, নতুন গতি বাংলাদেশকে সিআইপিএস নেটওয়ার্কে যুক্ত করার বিষয়ে চীনের আগ্রহ নতুন নয়। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন তৎকালীন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় বিকল্প নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার প্রবণতা এবং বিভিন্ন দেশের ডলার নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগের কারণে বাংলাদেশও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।

বিডার সঙ্গেও বৈঠক

চীনা এক্সিম ব্যাংকের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর বৈঠকও অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে সম্ভাব্য চীনা বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, অর্থায়ন এবং দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হবে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, যদি চীনা বিনিয়োগ ও প্রকল্পভিত্তিক অর্থায়ন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়, তাহলে সিআইপিএস ও পান্ডা বন্ড—উভয়ই বাংলাদেশের জন্য বাস্তব অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে আসতে পারে। বিশ্লেষণ: সুযোগ রয়েছে, তবে প্রস্তুতিও জরুরি বিশ্লেষকদের মতে, সিআইপিএস এবং পান্ডা বন্ড বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। একদিকে আন্তর্জাতিক লেনদেনে বিকল্প পেমেন্ট চ্যানেল তৈরি হবে, অন্যদিকে বৈদেশিক অর্থায়নের উৎস আরও বৈচিত্র্যময় হবে। তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু এখনও মার্কিন ডলার। ফলে ডলারের বিকল্প কোনো ব্যবস্থায় কার্যকর সুবিধা পেতে হলে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ঋণ ও আর্থিক সহযোগিতা আরও গভীর করতে হবে। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, সিআইপিএস বা পান্ডা বন্ড কোনো জাদুকরী সমাধান নয়। বরং এগুলো এমন আর্থিক অবকাঠামো, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হলে দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।

জেটিভি নিউজ বাংলা

দেশ ও দশের কথা বলে.....

ট্যাগস

জনপ্রিয় সংবাদ

দরিদ্রদের চাল ব্যবসায়ীর গুদামে! নাটোরে ৭৩ বস্তা সরকারি চাল জব্দ

ডলারের বিকল্প খুঁজছে বাংলাদেশ? সিআইপিএস ও পান্ডা বন্ড নিয়ে চীনের প্রস্তাবে ইতিবাচক বাংলাদেশ ব্যাংক

আপডেট সময় ১১:৩১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

জেটিভি নিউজ বাংলা

তারিখ: ১০ জুন ২০২৬ ইং,সময়: সকাল ১১:৩১ মিনিট। ফাইল ছবি

ডলারের বিকল্প খুঁজছে বাংলাদেশ? সিআইপিএস ও পান্ডা বন্ড নিয়ে চীনের প্রস্তাবে ইতিবাচক বাংলাদেশ ব্যাংক

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত এক্সিম ব্যাংকের প্রস্তাবের পর দেশটির ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম (সিআইপিএস) এবং পান্ডা বন্ডের মাধ্যমে অর্থায়নের সুযোগ নিয়ে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মঙ্গলবার, ৯ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে চীনা প্রতিনিধি দলের এক বৈঠকে বিষয় দুটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, দেশের কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক সিআইপিএস প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগতভাবে কোনো আপত্তি নেই। একইসঙ্গে চীনের অভ্যন্তরীণ বন্ড বাজারে পান্ডা বন্ড ইস্যুর সম্ভাবনাও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন, ডলারের আধিপত্য নিয়ে বিতর্ক এবং বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থার চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুযোগ হতে পারে। তবে এর প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং আর্থিক সম্পর্ক কতটা গভীর হয় তার ওপর।

কী এই সিআইপিএস?

সিআইপিএস বা ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম হলো চীনের কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থা, যা ২০১৫ সালে চালু হয়। এর মূল লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনে চীনা মুদ্রা রেনমিনবি (আরএমবি) বা ইউয়ানের ব্যবহার বৃদ্ধি করা। বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন সুইফট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। তবে রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির কারণে অনেক দেশ বিকল্প পেমেন্ট অবকাঠামোর দিকে ঝুঁকছে। সেই প্রেক্ষাপটে সিআইপিএসকে সুইফটের বিকল্প কিংবা পরিপূরক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সিআইপিএস মূলত একটি আন্তর্জাতিক পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যত বেশি লেনদেনের চ্যানেল থাকবে, ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগও তত বাড়বে। কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক চাইলে নিজস্ব উদ্যোগে এই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হতে পারবে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সিআইপিএসে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো নিয়ন্ত্রক বাধা বা অতিরিক্ত অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তা বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরে আসেনি। তবে কোনো ব্যাংক বাস্তবে সংযুক্তির উদ্যোগ নিলে তখন প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো আরও পরিষ্কার হবে। কেন গুরুত্ব পাচ্ছে সিআইপিএস? বাংলাদেশের আমদানির সবচেয়ে বড় উৎস দেশ চীন। প্রতি বছর বাংলাদেশ প্রায় ২০ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য চীন থেকে আমদানি করে। অন্যদিকে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। বর্তমানে এই বাণিজ্যের অধিকাংশ নিষ্পত্তি হয় মার্কিন ডলারে। সিআইপিএসের মাধ্যমে ভবিষ্যতে ইউয়ানভিত্তিক লেনদেন বৃদ্ধি পেলে ডলারের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমতে পারে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার বাজারের ওপর চাপ কমানোরও সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করেন, শুধুমাত্র নতুন একটি পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়াই যথেষ্ট নয়। এর কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইউয়ানের ব্যবহার কতটা বাড়ছে তার ওপর। এক কর্মকর্তা বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আরএমবির ব্যবহার যত বাড়বে, সিআইপিএসের গুরুত্বও তত বৃদ্ধি পাবে। তাৎক্ষণিক সুফল কতটা? অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশ তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের সুবিধা নাও পেতে পারে। কারণ, বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য ভারসাম্যহীন। আমদানির পরিমাণ অনেক বেশি হলেও রপ্তানি সীমিত। ফলে ইউয়ানে লেনদেনের জন্য পর্যাপ্ত মুদ্রা প্রবাহ তৈরি হয় না। গবেষণা প্রতিষ্ঠান র‌্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সিআইপিএস দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিকল্প হতে পারে। তবে শুধুমাত্র ইউয়ানভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করলেই বড় সুবিধা মিলবে না। তার মতে, চীনা বিনিয়োগ, অবকাঠামো ঋণ, শিল্প খাতে অর্থায়ন এবং যৌথ প্রকল্প বৃদ্ধি পেলে ইউয়ানভিত্তিক আর্থিক প্রবাহ তৈরি হবে। তখন আন্তঃসীমান্ত লেনদেন আরও সহজ ও কার্যকর হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, অন্যথায় বাংলাদেশকে শেষ পর্যন্ত আবারও অধিকাংশ লেনদেনের জন্য ডলারের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। আলোচনায় পান্ডা বন্ডও বাংলাদেশ ব্যাংক ও চীনা প্রতিনিধি দলের বৈঠকে পান্ডা বন্ড ইস্যুর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। পান্ডা বন্ড হলো চীনের অভ্যন্তরীণ বন্ড বাজারে বিদেশি সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা অথবা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ইস্যু করা ইউয়ানভিত্তিক ঋণপত্র। এর মাধ্যমে বিদেশি সরকার বা প্রতিষ্ঠান সরাসরি চীনা বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। বাংলাদেশ ভবিষ্যতে পান্ডা বন্ড ইস্যু করলে চীনের বিশাল বন্ড বাজার থেকে ইউয়ানে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে বৈদেশিক অর্থায়নের উৎস আরও বহুমুখী হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চ সুদের ঋণের বিকল্প উৎস পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত মূলত সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনা ও অর্থায়ন কৌশলের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় অর্থ মন্ত্রণালয়ই এ বিষয়ে নেতৃত্ব দেবে। প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংক মতামত ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করবে। চীনের পুরোনো আগ্রহ, নতুন গতি বাংলাদেশকে সিআইপিএস নেটওয়ার্কে যুক্ত করার বিষয়ে চীনের আগ্রহ নতুন নয়। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন তৎকালীন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় বিকল্প নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার প্রবণতা এবং বিভিন্ন দেশের ডলার নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগের কারণে বাংলাদেশও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।

বিডার সঙ্গেও বৈঠক

চীনা এক্সিম ব্যাংকের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর বৈঠকও অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে সম্ভাব্য চীনা বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, অর্থায়ন এবং দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হবে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, যদি চীনা বিনিয়োগ ও প্রকল্পভিত্তিক অর্থায়ন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়, তাহলে সিআইপিএস ও পান্ডা বন্ড—উভয়ই বাংলাদেশের জন্য বাস্তব অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে আসতে পারে। বিশ্লেষণ: সুযোগ রয়েছে, তবে প্রস্তুতিও জরুরি বিশ্লেষকদের মতে, সিআইপিএস এবং পান্ডা বন্ড বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। একদিকে আন্তর্জাতিক লেনদেনে বিকল্প পেমেন্ট চ্যানেল তৈরি হবে, অন্যদিকে বৈদেশিক অর্থায়নের উৎস আরও বৈচিত্র্যময় হবে। তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু এখনও মার্কিন ডলার। ফলে ডলারের বিকল্প কোনো ব্যবস্থায় কার্যকর সুবিধা পেতে হলে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ঋণ ও আর্থিক সহযোগিতা আরও গভীর করতে হবে। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, সিআইপিএস বা পান্ডা বন্ড কোনো জাদুকরী সমাধান নয়। বরং এগুলো এমন আর্থিক অবকাঠামো, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হলে দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।

জেটিভি নিউজ বাংলা

দেশ ও দশের কথা বলে.....