ঢাকা , বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ১০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
খাগড়াছড়িতে সেনাবাহিনীর পৃথক অভিযানে সশস্ত্র সংগঠনের এক সদস্য নিহত, আত্মসমর্পণ দুই জুলাই আন্দোলনের ঘটনায় হত্যা চেষ্টা মামলায় মমতাজ বেগমকে নতুন করে গ্রেফতার দেখানোর আদেশ স্বর্ণের দামে বড় পতন, ভরিতে কমলো ৫,৪৮২ টাকা; রুপার দামও কমিয়েছে বাজুস চীন সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান: বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও নতুন অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের প্রত্যাশা বিদেশি দূতাবাস ও ভিসা সেন্টারের অর্থ প্রেরণ সহজ করল বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারি ক্রয়ে ৪৬ মার্কিন কোম্পানির পণ্য কেনায় নিষেধাজ্ঞা দিল চীন সিলেট ডিসির বদলির সঙ্গে মাজার ইস্যুর কোনো সম্পর্ক নেই: তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সংসদে,  মসজিদে রাজনীতি, জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি ও মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি নিয়ে তুমুল আলোচনা সাভার এলজিইডিতে দুর্নীতির ‘সিন্ডিকেট’ অভিযোগ: ১৮ বছর একই কার্যালয়ে অ্যাকাউন্টেন্ট,নিম্নমানের কাজ নিয়ে ক্ষোভ মানিকগঞ্জের সিংগাইরে নিখোঁজের ৬ দিন পর স্কুলছাত্রীর খণ্ড-বিখণ্ড মরদেহ উদ্ধার, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে সহপাঠী

চীন সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান: বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও নতুন অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের প্রত্যাশা

জেটিভি নিউজ বাংলা

তারিখ :২৪ জুন ২০২৬ ইং | সময় :সকাল ১১:০২ মিনিট।

চীন সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান: বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও নতুন অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের প্রত্যাশা

দালিয়ান ঝৌশুইজি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বহনকারী বিশেষ ফ্লাইট অবতরণের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে বহুল আলোচিত চার দিনের চীন সফর। দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই তাঁর প্রথম দ্বিপাক্ষিক রাষ্ট্রীয় সফর। ফলে কূটনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক দিক থেকেও সফরটিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এমন এক সময়ে এই সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন বাংলাদেশ একদিকে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, অন্যদিকে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, রফতানি বহুমুখীকরণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন উৎস খুঁজছে। সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, এবারের সফরের মূল লক্ষ্য শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করা নয়; বরং বাংলাদেশকে চীনা বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং উৎপাদনভিত্তিক শিল্পায়নের অন্যতম গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, অবকাঠামো খাতে নতুন অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে আরও গভীর করাও সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য। বিশ্লেষকদের মতে, গত পাঁচ দশকে চীন বাংলাদেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে আবির্ভূত হলেও এখন দুই দেশের সম্পর্ক নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করছে। অবকাঠামো উন্নয়ন ও ঋণ সহায়তার বাইরে গিয়ে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সহযোগিতার দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ ও চীন।

বেইজিং বিনিয়োগ সম্মেলন সফরের কেন্দ্রবিন্দু

প্রধানমন্ত্রীর সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হচ্ছে ২৫ জুন বেইজিংয়ে অনুষ্ঠেয় বাংলাদেশ বিনিয়োগ সম্মেলন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) যৌথভাবে এই সম্মেলনের আয়োজন করেছে। সম্মেলনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা, অগ্রাধিকার খাত এবং নতুন বাজেটে ঘোষিত বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা তুলে ধরা হবে। চীনের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, আর্থিক খাতের প্রতিনিধিসহ শতাধিক বিনিয়োগকারী এতে অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের উৎপাদনভিত্তিক শিল্পকে বাংলাদেশে আকৃষ্ট করা। বিশেষ করে ইলেকট্রিক যানবাহন (ইভি), ব্যাটারি, সৌরশক্তি, ইলেকট্রনিকস, মোবাইল ফোন, চিকিৎসা সরঞ্জাম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্বিন্যাসের কারণে বহু চীনা প্রতিষ্ঠান নিজ দেশের বাইরে নতুন উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছে। বাংলাদেশ সেই সুযোগ কাজে লাগাতে চায়।

আনোয়ারার চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল: শিল্পায়নের নতুন মাইলফলক

সফরের আগে সবচেয়ে বড় অগ্রগতি এসেছে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল (সিইআইজেড) প্রকল্পে। সম্প্রতি একনেক প্রায় ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা অর্থায়ন করবে চীন। প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর গড়ে উঠতে যাওয়া এই শিল্পাঞ্চলকে সরকার ভবিষ্যতের শিল্পায়নের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করছে। কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিকটবর্তী হওয়ায় অঞ্চলটির ভৌগোলিক সুবিধাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এক লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে শত শত শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের মাধ্যমে কয়েকশ’ কোটি ডলারের বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় চীনা শিল্প স্থানান্তরের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ

চীনা বিনিয়োগকারীদের আরও কাছে যেতে প্রথমবারের মতো চীনে বিদেশি কার্যালয় খোলার প্রস্তুতি নিয়েছে বিডা। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই কার্যালয়ে স্থানীয় চীনা নাগরিকদের নিয়োগ দিয়ে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, তথ্য সহায়তা এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থা করা হবে। এর পাশাপাশি ইতোমধ্যে বিডার অধীনে একটি বিশেষ ‘চায়না ডেস্ক’ চালু করা হয়েছে, যা শুধুমাত্র চীনা বিনিয়োগকারীদের সেবা প্রদান করছে। সরকারের ধারণা, বিনিয়োগ-পরবর্তী সেবা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে।

৯ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়নের সম্ভাবনা

সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পে নতুন অর্থায়ন নিশ্চিত করা। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, চীন সরকার, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) এবং নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) মিলিয়ে ৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থায়ন প্রস্তাব বর্তমানে বিবেচনায় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প, মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন, বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক উন্নয়ন, ডিজিটাল সংযোগ সম্প্রসারণ, রেল অবকাঠামো উন্নয়ন, গ্যাস নেটওয়ার্ক উন্নয়ন এবং কনটেইনার জাহাজ ক্রয়। এ ছাড়া প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা নিয়েও আলোচনা চলছে। বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রার চ্যালেঞ্জ এবং উন্নয়ন ব্যয়ের চাপের মধ্যে এই অর্থায়ন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের উদ্যোগ

দুই দেশের মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশ ও চীন উভয় দেশই ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইউয়ান ও টাকার মাধ্যমে লেনদেন বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে। একই সঙ্গে কারেন্সি সোয়াপ ব্যবস্থাও আলোচনায় রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ যেহেতু বিপুল, তাই স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন চালু করা গেলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমবে এবং আমদানি ব্যয়ও তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে।

এফটিএ আলোচনায় নতুন গতি

বাংলাদেশ-চীন মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি বা এফটিএ নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। চীন ইতোমধ্যে দ্রুত আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ ২০২৯ সালে এলডিসি উত্তরণের পর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্ক সুবিধা হারাবে। সেই বাস্তবতায় এফটিএ দীর্ঘমেয়াদে রফতানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এফটিএর আগে বাংলাদেশের শিল্পখাতের সক্ষমতা, সম্ভাব্য সুবিধা এবং ঝুঁকি নিয়ে বিস্তারিত মূল্যায়ন প্রয়োজন।

বাণিজ্যে বৈষম্যের বাস্তবতা

বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্কের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ চীন থেকে প্রায় ১৮ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। বিপরীতে চীনে রফতানি হয়েছে মাত্র ৬৯ কোটি ৪৫ লাখ ডলারের পণ্য। অর্থাৎ বাংলাদেশ চীনে যত পণ্য রফতানি করে, তার ২৬ গুণের বেশি পণ্য আমদানি করে। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই বৈষম্য টেকসই নয়। তাই চীনে রফতানি বাড়ানোর বিকল্প নেই।

শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা, তবু রফতানি কম কেন?

চীন বাংলাদেশের প্রায় সব পণ্যের জন্য শতভাগ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে। তবুও প্রত্যাশিত হারে রফতানি বাড়ছে না। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এর কারণ বাজার গবেষণার অভাব, পণ্যের বৈচিত্র্য কম থাকা, ব্র্যান্ডিং দুর্বলতা এবং চীনা বাজারে স্থায়ী বিপণন নেটওয়ার্ক না থাকা। বর্তমানে চীনে বাংলাদেশের প্রধান রফতানি পণ্য হলো পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, তৈরি পোশাক, পাদুকা এবং হোম টেক্সটাইল। কিন্তু বিশ্বের বৃহত্তম ভোক্তা বাজারগুলোর একটিতে এই উপস্থিতি এখনো অত্যন্ত সীমিত। বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নেতারা মনে করেন, চীনের বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য স্থায়ী শোরুম ও আউটলেট প্রতিষ্ঠা করা গেলে রফতানি দ্রুত বাড়তে পারে।

নতুন বাজেটে চীনা বিনিয়োগের জন্য বার্তা

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণের সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। ইলেকট্রিক যানবাহন, সৌরশক্তি, ব্যাটারি, ইলেকট্রনিকস, মোবাইল ফোন, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং শিল্প কাঁচামাল খাতে ব্যাপক কর ও শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় সৌর প্যানেল, ব্যাটারি, ইভি এবং ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে চীনের জন্য এসব খাত বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করছে। সরকারের আশা, এসব শিল্প স্থাপিত হলে শুধু বৈদেশিক বিনিয়োগ নয়, প্রযুক্তি স্থানান্তর, কর্মসংস্থান এবং রফতানি আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় নতুন সহযোগিতা

চীনের প্রস্তাবিত ২৩ খাতভিত্তিক সহযোগিতা পরিকল্পনায় অর্থনীতি ও বাণিজ্যের পাশাপাশি ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং এবং প্রযুক্তি উদ্ভাবনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতের বৈশ্বিক অর্থনীতি প্রযুক্তিনির্ভর হবে। তাই শুধু অবকাঠামো নয়, প্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়নেও সহযোগিতা বাড়াতে হবে। এ কারণে সফরে প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং কারিগরি শিক্ষা সহযোগিতার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে।

সামনে বড় সুযোগ, তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে শুধু চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরি এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে চীনা বাজারে রফতানি বাড়ানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি কৌশল, বাজার গবেষণা এবং শক্তিশালী বাণিজ্য কূটনীতির প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিআই) সভাপতি মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বলেন, “চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ১৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যা দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে চীন ইতোমধ্যে শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা দিলেও বাংলাদেশ তা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি।” তিনি বলেন, “চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের পরিচিতি বাড়াতে দেশটির বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য নির্দিষ্ট আউটলেট স্থাপন, কারিগরি শিক্ষা ও প্রযুক্তি সহযোগিতা বাড়ানো এবং যৌথ বিনিয়োগ উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রফতানি বাড়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।” অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, “চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো রফতানি বৃদ্ধি। চীন বাংলাদেশের জন্য বড় বাজারের সুযোগ তৈরি করেছে, কিন্তু সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি।” তিনি মনে করেন, তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়া, পাটজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, ওষুধ এবং হালকা প্রকৌশল পণ্যের রফতানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে চীনকে গুরুত্ব দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য ও শিল্পনীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নতুন অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের পথে

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এবারের চীন সফর শুধু একটি কূটনৈতিক সফর নয়; বরং বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি সম্ভাবনাময় মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত। বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং বাণিজ্য—সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের সহযোগিতা নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। চীন ইতোমধ্যে বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার, অন্যতম বড় উন্নয়ন সহযোগী এবং দ্রুত বর্ধনশীল বিনিয়োগ উৎস। এখন চ্যালেঞ্জ হলো এই সম্পর্ককে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, যেখানে শুধু আমদানি নির্ভরতা নয়, বরং উৎপাদন, রফতানি, প্রযুক্তি এবং কর্মসংস্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশও সমানভাবে লাভবান হবে। প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফর সেই নতুন অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের ভিত্তি কতটা শক্তিশালী করতে পারে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে দেশের ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী এবং অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট মহল।  

জেটিভি নিউজ বাংলা

দেশ ও দশের কথা বলে.....

ট্যাগস

জনপ্রিয় সংবাদ

খাগড়াছড়িতে সেনাবাহিনীর পৃথক অভিযানে সশস্ত্র সংগঠনের এক সদস্য নিহত, আত্মসমর্পণ দুই

চীন সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান: বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও নতুন অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের প্রত্যাশা

আপডেট সময় ১৩ ঘন্টা আগে

জেটিভি নিউজ বাংলা

তারিখ :২৪ জুন ২০২৬ ইং | সময় :সকাল ১১:০২ মিনিট।

চীন সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান: বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও নতুন অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের প্রত্যাশা

দালিয়ান ঝৌশুইজি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বহনকারী বিশেষ ফ্লাইট অবতরণের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে বহুল আলোচিত চার দিনের চীন সফর। দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই তাঁর প্রথম দ্বিপাক্ষিক রাষ্ট্রীয় সফর। ফলে কূটনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক দিক থেকেও সফরটিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এমন এক সময়ে এই সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন বাংলাদেশ একদিকে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, অন্যদিকে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, রফতানি বহুমুখীকরণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন উৎস খুঁজছে। সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, এবারের সফরের মূল লক্ষ্য শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করা নয়; বরং বাংলাদেশকে চীনা বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং উৎপাদনভিত্তিক শিল্পায়নের অন্যতম গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, অবকাঠামো খাতে নতুন অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে আরও গভীর করাও সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য। বিশ্লেষকদের মতে, গত পাঁচ দশকে চীন বাংলাদেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে আবির্ভূত হলেও এখন দুই দেশের সম্পর্ক নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করছে। অবকাঠামো উন্নয়ন ও ঋণ সহায়তার বাইরে গিয়ে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সহযোগিতার দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ ও চীন।

বেইজিং বিনিয়োগ সম্মেলন সফরের কেন্দ্রবিন্দু

প্রধানমন্ত্রীর সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হচ্ছে ২৫ জুন বেইজিংয়ে অনুষ্ঠেয় বাংলাদেশ বিনিয়োগ সম্মেলন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) যৌথভাবে এই সম্মেলনের আয়োজন করেছে। সম্মেলনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা, অগ্রাধিকার খাত এবং নতুন বাজেটে ঘোষিত বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা তুলে ধরা হবে। চীনের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, আর্থিক খাতের প্রতিনিধিসহ শতাধিক বিনিয়োগকারী এতে অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের উৎপাদনভিত্তিক শিল্পকে বাংলাদেশে আকৃষ্ট করা। বিশেষ করে ইলেকট্রিক যানবাহন (ইভি), ব্যাটারি, সৌরশক্তি, ইলেকট্রনিকস, মোবাইল ফোন, চিকিৎসা সরঞ্জাম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্বিন্যাসের কারণে বহু চীনা প্রতিষ্ঠান নিজ দেশের বাইরে নতুন উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছে। বাংলাদেশ সেই সুযোগ কাজে লাগাতে চায়।

আনোয়ারার চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল: শিল্পায়নের নতুন মাইলফলক

সফরের আগে সবচেয়ে বড় অগ্রগতি এসেছে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল (সিইআইজেড) প্রকল্পে। সম্প্রতি একনেক প্রায় ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা অর্থায়ন করবে চীন। প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর গড়ে উঠতে যাওয়া এই শিল্পাঞ্চলকে সরকার ভবিষ্যতের শিল্পায়নের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করছে। কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিকটবর্তী হওয়ায় অঞ্চলটির ভৌগোলিক সুবিধাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এক লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে শত শত শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের মাধ্যমে কয়েকশ’ কোটি ডলারের বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় চীনা শিল্প স্থানান্তরের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ

চীনা বিনিয়োগকারীদের আরও কাছে যেতে প্রথমবারের মতো চীনে বিদেশি কার্যালয় খোলার প্রস্তুতি নিয়েছে বিডা। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই কার্যালয়ে স্থানীয় চীনা নাগরিকদের নিয়োগ দিয়ে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, তথ্য সহায়তা এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থা করা হবে। এর পাশাপাশি ইতোমধ্যে বিডার অধীনে একটি বিশেষ ‘চায়না ডেস্ক’ চালু করা হয়েছে, যা শুধুমাত্র চীনা বিনিয়োগকারীদের সেবা প্রদান করছে। সরকারের ধারণা, বিনিয়োগ-পরবর্তী সেবা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে।

৯ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়নের সম্ভাবনা

সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পে নতুন অর্থায়ন নিশ্চিত করা। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, চীন সরকার, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) এবং নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) মিলিয়ে ৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থায়ন প্রস্তাব বর্তমানে বিবেচনায় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প, মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন, বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক উন্নয়ন, ডিজিটাল সংযোগ সম্প্রসারণ, রেল অবকাঠামো উন্নয়ন, গ্যাস নেটওয়ার্ক উন্নয়ন এবং কনটেইনার জাহাজ ক্রয়। এ ছাড়া প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা নিয়েও আলোচনা চলছে। বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রার চ্যালেঞ্জ এবং উন্নয়ন ব্যয়ের চাপের মধ্যে এই অর্থায়ন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের উদ্যোগ

দুই দেশের মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশ ও চীন উভয় দেশই ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইউয়ান ও টাকার মাধ্যমে লেনদেন বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে। একই সঙ্গে কারেন্সি সোয়াপ ব্যবস্থাও আলোচনায় রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ যেহেতু বিপুল, তাই স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন চালু করা গেলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমবে এবং আমদানি ব্যয়ও তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে।

এফটিএ আলোচনায় নতুন গতি

বাংলাদেশ-চীন মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি বা এফটিএ নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। চীন ইতোমধ্যে দ্রুত আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ ২০২৯ সালে এলডিসি উত্তরণের পর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্ক সুবিধা হারাবে। সেই বাস্তবতায় এফটিএ দীর্ঘমেয়াদে রফতানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এফটিএর আগে বাংলাদেশের শিল্পখাতের সক্ষমতা, সম্ভাব্য সুবিধা এবং ঝুঁকি নিয়ে বিস্তারিত মূল্যায়ন প্রয়োজন।

বাণিজ্যে বৈষম্যের বাস্তবতা

বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্কের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ চীন থেকে প্রায় ১৮ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। বিপরীতে চীনে রফতানি হয়েছে মাত্র ৬৯ কোটি ৪৫ লাখ ডলারের পণ্য। অর্থাৎ বাংলাদেশ চীনে যত পণ্য রফতানি করে, তার ২৬ গুণের বেশি পণ্য আমদানি করে। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই বৈষম্য টেকসই নয়। তাই চীনে রফতানি বাড়ানোর বিকল্প নেই।

শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা, তবু রফতানি কম কেন?

চীন বাংলাদেশের প্রায় সব পণ্যের জন্য শতভাগ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে। তবুও প্রত্যাশিত হারে রফতানি বাড়ছে না। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এর কারণ বাজার গবেষণার অভাব, পণ্যের বৈচিত্র্য কম থাকা, ব্র্যান্ডিং দুর্বলতা এবং চীনা বাজারে স্থায়ী বিপণন নেটওয়ার্ক না থাকা। বর্তমানে চীনে বাংলাদেশের প্রধান রফতানি পণ্য হলো পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, তৈরি পোশাক, পাদুকা এবং হোম টেক্সটাইল। কিন্তু বিশ্বের বৃহত্তম ভোক্তা বাজারগুলোর একটিতে এই উপস্থিতি এখনো অত্যন্ত সীমিত। বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নেতারা মনে করেন, চীনের বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য স্থায়ী শোরুম ও আউটলেট প্রতিষ্ঠা করা গেলে রফতানি দ্রুত বাড়তে পারে।

নতুন বাজেটে চীনা বিনিয়োগের জন্য বার্তা

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণের সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। ইলেকট্রিক যানবাহন, সৌরশক্তি, ব্যাটারি, ইলেকট্রনিকস, মোবাইল ফোন, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং শিল্প কাঁচামাল খাতে ব্যাপক কর ও শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় সৌর প্যানেল, ব্যাটারি, ইভি এবং ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে চীনের জন্য এসব খাত বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করছে। সরকারের আশা, এসব শিল্প স্থাপিত হলে শুধু বৈদেশিক বিনিয়োগ নয়, প্রযুক্তি স্থানান্তর, কর্মসংস্থান এবং রফতানি আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় নতুন সহযোগিতা

চীনের প্রস্তাবিত ২৩ খাতভিত্তিক সহযোগিতা পরিকল্পনায় অর্থনীতি ও বাণিজ্যের পাশাপাশি ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং এবং প্রযুক্তি উদ্ভাবনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতের বৈশ্বিক অর্থনীতি প্রযুক্তিনির্ভর হবে। তাই শুধু অবকাঠামো নয়, প্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়নেও সহযোগিতা বাড়াতে হবে। এ কারণে সফরে প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং কারিগরি শিক্ষা সহযোগিতার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে।

সামনে বড় সুযোগ, তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে শুধু চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরি এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে চীনা বাজারে রফতানি বাড়ানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি কৌশল, বাজার গবেষণা এবং শক্তিশালী বাণিজ্য কূটনীতির প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিআই) সভাপতি মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বলেন, “চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ১৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যা দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে চীন ইতোমধ্যে শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা দিলেও বাংলাদেশ তা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি।” তিনি বলেন, “চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের পরিচিতি বাড়াতে দেশটির বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য নির্দিষ্ট আউটলেট স্থাপন, কারিগরি শিক্ষা ও প্রযুক্তি সহযোগিতা বাড়ানো এবং যৌথ বিনিয়োগ উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রফতানি বাড়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।” অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, “চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো রফতানি বৃদ্ধি। চীন বাংলাদেশের জন্য বড় বাজারের সুযোগ তৈরি করেছে, কিন্তু সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি।” তিনি মনে করেন, তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়া, পাটজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, ওষুধ এবং হালকা প্রকৌশল পণ্যের রফতানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে চীনকে গুরুত্ব দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য ও শিল্পনীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নতুন অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের পথে

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এবারের চীন সফর শুধু একটি কূটনৈতিক সফর নয়; বরং বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি সম্ভাবনাময় মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত। বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং বাণিজ্য—সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের সহযোগিতা নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। চীন ইতোমধ্যে বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার, অন্যতম বড় উন্নয়ন সহযোগী এবং দ্রুত বর্ধনশীল বিনিয়োগ উৎস। এখন চ্যালেঞ্জ হলো এই সম্পর্ককে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, যেখানে শুধু আমদানি নির্ভরতা নয়, বরং উৎপাদন, রফতানি, প্রযুক্তি এবং কর্মসংস্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশও সমানভাবে লাভবান হবে। প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফর সেই নতুন অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের ভিত্তি কতটা শক্তিশালী করতে পারে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে দেশের ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী এবং অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট মহল।  

জেটিভি নিউজ বাংলা

দেশ ও দশের কথা বলে.....