জেটিভি নিউজ বাংলা
তারিখ: ২৩ জুন ২০২৬ ইং,সময়: দুপুর ১২:৩২ মিনিট। ফাইল ছবিসংসদে, মসজিদে রাজনীতি, জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি ও মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি নিয়ে তুমুল আলোচনা
ঢাকা: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় এবং প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১২তম কার্যদিবসে জাতীয় সংসদে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, মসজিদে রাজনৈতিক কার্যক্রম, স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দলের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি, বাজেট বৈষম্য, ‘মবোক্রেসি’ বিতর্ক এবং মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার (২২ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বক্তব্য দেন এবং একে অপরের সমালোচনা করেন। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরও জোরদারের আহ্বান বগুড়া-৫ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) সিরাজ বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্মানজনক ও দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব বজায় রাখা প্রয়োজন। তিনি বলেন, “ভারত আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র। আমরা চাই দুই দেশের বন্ধুত্ব অটুট থাকুক। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কেও বিচ্ছেদ হতে পারে, কিন্তু প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের কোনো বিচ্ছেদ হয় না। বাংলাদেশ যেমন ভারতকে অস্বীকার করতে পারে না, ভারতও বাংলাদেশকে অস্বীকার করতে পারে না।” তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকে বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠছে। জিএম সিরাজ বলেন, “আমি মোদী সরকারের কাছে বিনয়ের সঙ্গে আহ্বান জানাচ্ছি— পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু বাবুকে থামান। বাংলাদেশবিরোধী যেসব বক্তব্য মাঝেমধ্যে দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো ভারত-বাংলাদেশের বন্ধুত্বের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।” মসজিদে রাজনীতি বন্ধের দাবি কুষ্টিয়া-1 আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ জাতীয় সংসদে মসজিদভিত্তিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধে আইন প্রণয়নের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “মসজিদ আল্লাহর ঘর। সেখানে মানুষ নামাজ পড়বে, কোরআন তিলাওয়াত করবে। কিন্তু একটি রাজনৈতিক দল মসজিদে গিয়ে রাজনীতি করছে।” তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, মসজিদ ও মাদ্রাসায় রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা উচিত। রাজনৈতিক দলগুলোকে মাঠ, হলরুম কিংবা উন্মুক্ত স্থানে কর্মসূচি পালনের পরামর্শ দেন তিনি। স্বাধীনতাবিরোধী দলের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি ঝালকাঠি-১ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামাল কোনো দলের নাম উল্লেখ না করে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক শক্তির রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি জানান। তিনি বলেন, “যে দল ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল এবং বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতা করেছিল, তারা বাংলাদেশের রাজনীতি করতে পারবে না। ফ্যাসিস্টদের মতো তাদের রাজনীতিও নিষিদ্ধ করা হোক।” বাজেটকে ‘গরিব মারার বাজেট’ আখ্যা বিরোধী দলের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মাহবুব আলম সালেহী প্রস্তাবিত বাজেটকে অবাস্তব ও বাস্তবায়ন অযোগ্য বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “এই বাজেটে সম্পদের সুষম বণ্টন হয়নি, বরং বৈষম্য আরও বেড়েছে। উত্তরবঙ্গের উন্নয়নকে চরমভাবে অবহেলা করা হয়েছে। এটি গরিব মারার বাজেট।” তিনি অভিযোগ করেন, সরকারি ও বিরোধী দলের নির্বাচনী এলাকায় উন্নয়ন বরাদ্দের ক্ষেত্রে বৈষম্য করা হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, “বগুড়ার শিবগঞ্জে ১৩২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু গাজীপুরে তার চেয়ে প্রায় ৯০ শতাংশ বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তাহলে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা কীভাবে উন্নয়ন করবেন?” গাইবান্ধায় শিবির নেতা হত্যার বিচার দাবি সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য ও বিরোধীদলীয় হুইপ রফিকুল ইসলাম খান গাইবান্ধায় ছাত্রশিবির নেতা সাইফুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান। তিনি বলেন, “একটি স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে যুবদল ও ছাত্রদলের নেতারা ছাত্রশিবিরের ইউনিয়ন সভাপতি সাইফুল্লাহকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। মামলা হয়েছে, কিন্তু এখনো আসামিরা গ্রেপ্তার হয়নি।” তিনি আরও বলেন, “খুনি যে দলেরই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। খুনির কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে না।” ‘মবোক্রেসি’ শব্দ নিয়ে সংসদে বিতর্ক জাতীয় সংসদে বাজেট প্রতিক্রিয়া নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মিছিল ও প্রতিবাদকে ‘মবোক্রেসি’ হিসেবে আখ্যায়িত করার ঘটনায় তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়। জামায়াতের সংসদ সদস্য রাশেদুল ইসলাম স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, এই শব্দ সংসদের কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া উচিত। তবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, “এটি কোনো অশ্লীল শব্দ নয়। এটি এক্সপাঞ্জ করার মতো কিছু নয়। বাজেট আলোচনায় আপনারা এর জবাব দিতে পারেন।” পরবর্তীতে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “মবোক্রেসি কোনো ইতিবাচক অর্থ বহন করে না। এটি আপত্তিকর এবং বেমানান শব্দ। তাই এটি কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া উচিত।” তবে স্পিকার পুনরায় বলেন, “মবোক্রেসি এখন একটি বহুল ব্যবহৃত রাজনৈতিক পরিভাষা। এটি অশ্লীল বা অসংসদীয় শব্দ নয়। ফলে কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার কোনো কারণ নেই।” মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ বাজেট অধিবেশনে মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন। তিনি বলেন, “অধিকাংশ সময় মন্ত্রীদের আসন খালি থাকে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী নেই, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নেই, আরও অনেক মন্ত্রী অনুপস্থিত। বিষয়টি দুঃখজনক।” এ বিষয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদও উষ্মা প্রকাশ করে বলেন, “বাজেট অধিবেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি চাই মন্ত্রীরা আরও বেশি উপস্থিত থাকুন। অর্থমন্ত্রী অন্তত উপস্থিত আছেন, এ জন্য ধন্যবাদ।” চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, অনেক মন্ত্রী রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ত থাকলেও সংসদে উপস্থিত থাকা উচিত। তিনি বলেন, “অর্থমন্ত্রী শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উপস্থিত থাকেন। স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, আইন কিংবা অন্য যে কোনো খাতের বিষয়ে শেষ পর্যন্ত তাকেই উত্তর দিতে হয়।” সরকারি-বিরোধী পাল্টাপাল্টি মন্তব্য মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বিরোধী দলের সমালোচনার জবাবে বলেন, “মন্ত্রীদের অনুপস্থিতির কথা বলার আগে বিরোধী দলের নেতা ও উপনেতার আসনও দেখা উচিত। তারাও অনেক সময় অনুপস্থিত থাকেন।” তবে স্পিকার এ বিষয়ে বলেন, “বিরোধী দলের নেতা না থাকলেও চলবে, কিন্তু মন্ত্রীদের উপস্থিত থাকা জরুরি। কারণ মন্ত্রীদেরই সরকারের পক্ষে জবাব দিতে হয়।” তিনি আরও বলেন, সংসদের সৌন্দর্য, কার্যকারিতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সরকারি ও বিরোধী—উভয় পক্ষের সদস্যদের নিয়মিত উপস্থিত থাকা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া সফরে উল্লেখ্য, সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বর্তমানে রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন। তাঁর সফরসঙ্গী হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত মালয়েশিয়ায় রয়েছেন। সোমবার বিকেলে সংসদ অধিবেশনের শুরুতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ উপস্থিত ছিলেন না। পরে তিনি অধিবেশনে যোগ দেন। এ সময় সরকারি দলের তুলনায় বিরোধী দলের সদস্যদের উপস্থিতি কিছুটা বেশি দেখা গেলেও সরকারি দলের সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য।জেটিভি নিউজ বাংলা
দেশ ও দশের কথা বলে.....

ঢাকা থেকে বিশেষ প্রতিনিধি 





















