জেটিভি নিউজ বাংলা
তারিখ : বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ইং,সময় ঃ সকাল ১০:৩৬ মিনিট।সরকারের ভর্তুকির সার সাগরপথে নিয়মিত মিয়ানমারে পাচার, দুই মাসে জব্দ ৩ হাজার ৩১০ বস্তা
সরকারের ভর্তুকির সার অবৈধভাবে সাগরপথে নিয়মিত মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে। গত ছয় মাসে মিয়ানমারে পাচারের সময় সারের একাধিক চালান জব্দ করেছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। শুধু গত দুই মাসে—জুলাই ও আগস্টে—পাচারের সময় আটটি চালানে ৩ হাজার ৩১০ বস্তা সার জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে জুলাই মাসে পাঁচটি এবং আগস্টে তিনটি চালান আটক করা হয়। বাংলাদেশ থেকে সার, সিমেন্টসহ বিভিন্ন পণ্য অবৈধভাবে মিয়ানমারে পাচার হলেও বিপরীত পথে দেশে ঢুকছে ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ বা আইসসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক। কোস্ট গার্ড জানায়, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা ইউরিয়া সার ছোট-বড় নৌযানে করে উপকূলীয় পথ ব্যবহার করে মিয়ানমারের দিকে পাচার করা হয়। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী উপকূলীয় এলাকা ও সাগরপথ ব্যবহার করছে সংঘবদ্ধ পাচারকারী চক্র। গত দুই মাসে আটটি চালানে ৩ হাজার ৩১০ বস্তা সার জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭০০ বস্তা ডায়ামোনিয়াম ফসফেট বা ডিএপি এবং বাকিগুলো ইউরিয়া সার। কোস্ট গার্ডের নিয়মিত টহল ও অভিযানে গত ছয় মাসে একাধিক চালান জব্দ করা সম্ভব হলেও পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি এই পাচার। সর্বশেষ গত সোমবার, ৩১ আগস্ট রাত ১টার দিকে কোস্ট গার্ড স্টেশন ভাটিয়ারীর উদ্যোগে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে একটি কার্গো বোট তল্লাশি করে অবৈধভাবে মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে বহন করা ৪১০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করা হয়। তবে কোস্ট গার্ডের উপস্থিতি টের পেয়ে পাচারকারীরা পালিয়ে যায়। কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, জব্দ করা ইউরিয়া সারের বাজারমূল্য প্রায় ১৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। এর আগে গত ২৭ আগস্ট কোস্ট গার্ড আউটপোস্ট পতেঙ্গার উদ্যোগে পৃথক অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে দুটি কার্গো বোট তল্লাশি চালিয়ে অবৈধভাবে মিয়ানমারে পাচারের সময় ২৮০ বস্তা ইউরিয়া সার এবং ১ হাজার বস্তা সিমেন্ট জব্দ করা হয়। তারও আগে ১৬ আগস্ট কক্সবাজারের কুতুবদিয়া থানাধীন দক্ষিণ কুতুবদিয়া চ্যানেলে অভিযান চালিয়ে একটি ফিশিং বোট থেকে ৬০ বস্তা ইউরিয়া সার ও ২৫০ বস্তা সিমেন্ট জব্দ করে কোস্ট গার্ড। এসব পণ্যও মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে বহন করা হচ্ছিল বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। জুলাই মাসেও সাগরপথে একের পর এক পাচারবিরোধী অভিযান চালিয়েছে কোস্ট গার্ড। গত ৩১ জুলাই কোস্ট গার্ড আউটপোস্ট পতেঙ্গার উদ্যোগে দুটি ফিশিং বোটে তল্লাশি চালিয়ে ৪৫০ বস্তা ডিএপি সার জব্দ করা হয়। এ সময় দুটি বোটে থাকা ২৩ জনকে আটক করা হয়। একই দিন পতেঙ্গা থানাধীন ১৫ নম্বর ঘাটসংলগ্ন এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে দুটি কাঠের বোট তল্লাশি করে এক টন খনিজ কয়লা ও ৬০০ কেজি গমের ভুসি জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় জড়িতরা কোস্ট গার্ডের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যায়। গত ২৮ জুলাই নোয়াখালীর ভাসানচরের মাংগুরিয়ার চরসংলগ্ন এলাকায় একটি কার্গো বোটে অভিযান চালিয়ে ৪৮০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করা হয়। একই বোট থেকে ৩ হাজার ৭০০ কেজি ছোলা ও ৬ হাজার ৮৫০ কেজি বুটের ডালও উদ্ধার করা হয়। ২৪ জুলাই রাতে সীতাকুণ্ড থানাধীন সন্দ্বীপ চ্যানেলসংলগ্ন এলাকায় একটি ফিশিং বোট ও একটি কার্গো বোটে তল্লাশি চালিয়ে ২৪০ বস্তা সিমেন্ট ও ৩৮০ বস্তা সার জব্দ করা হয়। এ সময় পাচারের সঙ্গে জড়িত ১০ জনকে আটক করে কোস্ট গার্ড। এর আগে ১৩ জুলাই চট্টগ্রাম বহির্নোঙর এলাকায় তিনটি কার্গো বোটে অভিযান চালিয়ে ২ হাজার ৪০০ বস্তা সিমেন্ট ও ২৫০ বস্তা ডিএপি সার জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় ২২ জন পাচারকারীকে আটক করা হয়েছিল। জুলাইয়ের শুরুতেও একই ধরনের পাচারের চেষ্টা ধরা পড়ে। ২ জুলাই পতেঙ্গা থানাধীন ১৫ নম্বর ঘাটসংলগ্ন এলাকায় একটি কাঠের বোট তল্লাশি করে ৬০০ বস্তা সিমেন্ট জব্দ করা হয়। এ সময় পাচারের সঙ্গে জড়িত পাঁচজনকে আটক করে কোস্ট গার্ড। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন পণ্য পাচার এবং মিয়ানমার থেকে মাদক আনার ক্ষেত্রে সাগরপথের পাশাপাশি নদী ও স্থলসীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট ব্যবহার করছে চোরাকারবারিরা। একটি সংঘবদ্ধ চক্র এই পাচারের সঙ্গে জড়িত। বিশেষ করে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ বা আইস পাচারের জন্য বিভিন্ন রুট সক্রিয় রয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক সোমেন মণ্ডল বলেন, ‘নদী, সাগর ও স্থলপথের একাধিক পয়েন্ট দিয়ে ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক দেশে ঢুকছে। সাগরপথে মাদক ও অন্যান্য চোরাচালান ঠেকাতে কোস্ট গার্ড সক্রিয় রয়েছে। অন্যদিকে সড়কপথে ইয়াবাসহ মাদক পাচার ঠেকাতে বিজিবি, পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরসহ একাধিক সংস্থা কাজ করছে।’ টেকনাফ স্থলবন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড ল্যান্ড পোর্ট লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (হিসাব) মো. জসিম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘দীর্ঘ এক বছর টেকনাফ স্থলবন্দর বন্ধ থাকার পর গত মে মাসে এটি চালু হয়েছে। এ স্থলবন্দর দিয়ে রফতানি হচ্ছে আলু, প্লাস্টিক প্রোডাক্ট, বিস্কুটসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য। একইভাবে আমদানি হচ্ছে তেঁতুল, মাছ, সানাকামাটি, শুঁটকি, সুপারি, নারিকেলসহ বিভিন্ন পণ্য। এই স্থলবন্দর দিয়ে বৈধভাবে কোনও সার বা সিমেন্ট রফতানি হচ্ছে না।’ চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক আপ্রু মারমা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকার ইউরিয়া, ডিএপিসহ চার ধরনের সারে বড় অঙ্কের আর্থিক ভর্তুকি দিয়ে থাকে। কোস্ট গার্ডের অভিযানে বিভিন্ন সময় সার জব্দের বিষয়টি আমরা জানতে পারি। তবে এসব সারের উৎস তথা কোথা থেকে পাচার হয়ে থাকে, তা উঠে আসে না। চট্টগ্রামে কোনও ডিলার পয়েন্ট থেকে এসব সার মিয়ানমারে পাচার হওয়ার তথ্য আমাদের কাছে নেই। আমাদের সংশ্লিষ্ট ডিলার পয়েন্টগুলো তদারকিতে রাখা হয়।’ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পাশের দেশ মিয়ানমার ও ভারতে বাংলাদেশের তুলনায় সারের দাম অনেক বেশি। এ কারণে বিভিন্ন সময়ে অবৈধভাবে সার পাচারের ঘটনা ঘটছে। সরকারি ভর্তুকিতে কৃষকদের জন্য সরবরাহ করা সার পাচারের ঘটনায় একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে সাগরপথকে ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ চোরাকারবারি চক্রের সক্রিয়তার বিষয়টিও সামনে আসছে। কোস্ট গার্ডের ধারাবাহিক অভিযানে একের পর এক চালান জব্দ হলেও সাগরপথে এই অবৈধ বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ করা এখনো সম্ভব হয়নি। জেটিভি নিউজ বাংলাদেশ ও দশের কথা বলে....

ডেস্ক রিপোর্ট 












