জ্বালানি তেলের দাম বাড়তেই পরিবহন খাতে ভাড়া বৃদ্ধি, বাজারে নিত্যপণ্যের দামে নতুন চাপ
জেটিভি নিউজ বাংলা
চট্টগ্রাম | বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬ ইং,সময় ১১:০১ মিনিট। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রভাব ইতোমধ্যেই দেশের পরিবহন খাতে দৃশ্যমান হয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে ট্রাক ভাড়া এক লাফে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাজারে, বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যদিও সরকার এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে পরিবহন ভাড়া কত বাড়ানো হবে তা নির্ধারণ করেনি, তার আগেই ট্রাক মালিকরা নিজ উদ্যোগে ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাস ও ট্রাক ভাড়া পুনর্নির্ধারণের বিষয়ে বৃহস্পতিবার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠকের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। বুধবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক বৈঠক শেষে তিনি বলেন, “নতুন ভাড়ার বিষয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। আগামীকালের বৈঠকে সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।” সরকার সম্প্রতি জ্বালানি তেলের নতুন মূল্য নির্ধারণ করেছে। সে অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ থেকে ১৩০ টাকা, অকটেন ১২০ থেকে ১৪০ টাকা এবং পেট্রোল ১১৬ থেকে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। নতুন এই দাম গত রবিবার থেকে কার্যকর হয়েছে। এর পরদিন থেকেই ট্রাক ভাড়া বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। চট্টগ্রামে ভাড়া বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা চট্টগ্রামের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া গুণতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। অনেক ক্ষেত্রে ট্রাক ভাড়া ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানিয়েছেন তারা। খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী নুরুল আমিন জেটিভি নিউজ বাংলাকে বলেন, “চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লার আশুগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় চাল পরিবহনে আগে ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা ভাড়া লাগতো। এখন তা বেড়ে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। প্রতি ট্রিপে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা বেশি দিতে হচ্ছে।” চাকতাই-খাতুনগঞ্জ হামিদুল্লাহ মিয়া বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস জানান, “আগে পাবনা থেকে চট্টগ্রামে পণ্য আনতে ৩০-৩২ হাজার টাকা লাগতো, এখন ৪০ থেকে ৪২ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে। একইভাবে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পণ্য পরিবহনে আগে ২৭-২৮ হাজার টাকা লাগলেও এখন ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে। তেলের দাম বাড়ার পর থেকেই এই অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হচ্ছে। আমরা বাধ্য হয়ে এই খরচ মেনে নিচ্ছি।” এদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে চট্টগ্রাম বন্দরের বেসরকারি কনটেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন ‘বিকডা’ সাড়ে ৮ শতাংশ ফুয়েল সারচার্জ আরোপ করেছে। রবিবার রাত থেকে এই চার্জ কার্যকর করা হলেও পরদিন সকালে স্টেকহোল্ডারদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে বিষয়টি জানানো হয়। এতে আমদানি-রফতানি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। বিকডার মহাসচিব রুহুল আমিন শিকদার বলেন, “অফডকের সব কার্যক্রমই ডিজেলনির্ভর। কনটেইনার পরিবহন থেকে শুরু করে যন্ত্রপাতি পরিচালনা—সব ক্ষেত্রেই ডিজেলের ব্যবহার রয়েছে। ডিজেলের দাম ১৫ শতাংশ বাড়ায় আমরা আইসিডি খাতে সাড়ে ৮ শতাংশ সারচার্জ আরোপ করেছি। ভবিষ্যতে তেলের দাম কমলে এই সারচার্জও কমানো হবে।”চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন,
“বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলো বন্দরের অংশ হিসেবে পরিচালিত হয়। এখানে ভাড়া বাড়াতে হলে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করা উচিত ছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা তা না করেই সারচার্জ বাড়িয়েছে। ব্যবহারকারীদের সঙ্গে আলোচনা করলে বিষয়টি আরও গ্রহণযোগ্য হতো।”সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে
তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে ইতোমধ্যেই বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। নগরীর চরপাড়ার বাসিন্দা সোহেল মিয়া বলেন, “আগেই সবকিছুর দাম বেশি ছিল। এখন তেলের দাম বাড়ায় আরও বেড়েছে। গত রমজানের তুলনায় এখন সবজির দাম প্রায় দ্বিগুণ। সব ধরনের পণ্যের দামই বেড়েছে।”বরিশালে ভাড়া বেড়েছে ৪-৫ হাজার টাকা
বরিশাল থেকে ঢাকায় পণ্য পরিবহনে ট্রাক ভাড়া বেড়েছে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। আগে যেখানে ১৭-১৮ হাজার টাকায় ট্রাক পাওয়া যেত, এখন সেখানে ২১-২২ হাজার টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে। ট্রাক মালিক ও চালকদের মতে, তেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি যন্ত্রাংশ, শ্রমিক ও অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় এই ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে বরিশাল ট্রাক মালিক সমিতির সহসভাপতি গোলাম রাব্বানী লাবু ভিন্নমত পোষণ করে বলেন, “আমাদের সংগঠনের আওতাধীন ট্রাকগুলোর ভাড়া এখনও বাড়ানো হয়নি। সরকার ও কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কিছু ট্রাক আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকায় তারা আগেই ভাড়া বাড়িয়েছে, যা ঠিক হয়নি।”কুড়িগ্রামেও প্রভাব
কুড়িগ্রামের সোনাহাট স্থলবন্দরে পণ্য পরিবহনেও ভাড়া বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। ব্যবসায়ী শহিদ জানান, “আগে যে ভাড়ায় পাথর পরিবহন করা হতো, এখন তার চেয়ে বেশি না দিলে ট্রাক পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতি ট্রাকে অন্তত ৫০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে।” জেলা চেম্বার অব কমার্স এবং ট্রাক-ট্যাংক-লরি-কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল আজিজ বলেন, “আমরা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ভাড়া বাড়াইনি। তবে দীর্ঘমেয়াদে তেলের দাম বেশি থাকলে ভাড়া বাড়ানো ছাড়া বিকল্প থাকবে না।” সামগ্রিকভাবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পরিবহন খাত হয়ে এখন সরাসরি বাজারে পৌঁছাতে শুরু করেছে। এতে করে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।জেটিভি নিউজ বাংলা
সত্য প্রকাশে অঙ্গিকারবদ্ধ.....

Reporter Name 





















