ঢাকা , মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
টাকা দিলেই অনলাইনে মিলছে এনআইডি, কল ডিটেলস, লাইভ লোকেশন ও বিকাশের তথ্য; ব্যক্তিগত তথ্য বেচাকেনায় গড়ে উঠেছে বড় অনলাইন বাজার গুমের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামিন চাইলেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক শেখ মামুন খালেদ গণতন্ত্রের প্রতি সরকার দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রায় একযুগ পর নতুন পে-স্কেল: স্বস্তি নাকি মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ? প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক চলছে, নতুন বেতনকাঠামোর প্রস্তাব উপস্থাপনের কথা স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ, দেশে ভোটার ১২ কোটি ৮৭ লাখ ৭৭ হাজার ৬৪৩ অভিনয়ে ফিরছেন না পপি? জীবনের বাকি সময় শান্তি ও ধর্মীয় অনুশীলনে কাটাতে চান জনপ্রিয় এই নায়িকা মাগুরার শিশু আছিয়া ধর্ষণ-হত্যা: হিটু শেখের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের রায় ঘোষণা শুরু ই-টেন্ডার প্রক্রিয়া সহজীকরণে কত সময় লাগবে, সংসদে এমপি মোশারফের প্রশ্ন আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে সংসদ অভিমুখে ১১ দলীয় ঐক্যজোটের পদযাত্রা

টাকা দিলেই অনলাইনে মিলছে এনআইডি, কল ডিটেলস, লাইভ লোকেশন ও বিকাশের তথ্য; ব্যক্তিগত তথ্য বেচাকেনায় গড়ে উঠেছে বড় অনলাইন বাজার

জেটিভি নিউজ বাংলা

তারিখ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ইং,সময়: রাত ৮টা ৫৪ মিনিট

টাকা দিলেই অনলাইনে মিলছে এনআইডি, কল ডিটেলস, লাইভ লোকেশন ও বিকাশের তথ্য; ব্যক্তিগত তথ্য বেচাকেনায় গড়ে উঠেছে বড় অনলাইন বাজার

ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে ১০টি সক্রিয় ওয়েবসাইট, এক মাসে ফেসবুকে মিলেছে ৬০০টির বেশি বিজ্ঞাপন

সাধারণ নাগরিকদের ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্য কেনাবেচাকে ঘিরে বাংলাদেশে অনলাইনে গড়ে উঠেছে একটি বড় বাজার। ফেসবুকে বিজ্ঞাপন, বিভিন্ন ওয়েবসাইট, টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য। টাকা দিলেই পাওয়া যাচ্ছে জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি, কল ডিটেলস রেকর্ড বা সিডিআর, মোবাইল ফোনের অবস্থান, এসএমএসের তালিকা, আইএমইআই নম্বর, টিআইএন, পাসপোর্টের তথ্য, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন, ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ এবং মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাব বিবরণী। তথ্য যাচাইকারী ও মিডিয়া গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির সঙ্গে জড়িত ১০টি সক্রিয় ওয়েবসাইটের সন্ধান পাওয়া গেছে। এ ছাড়া মাত্র এক মাসে ফেসবুকেই এ ধরনের ৬০০টির বেশি বিজ্ঞাপন শনাক্ত করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

‘সাইন কপি’ লিখে অনুসন্ধানে পাওয়া যায় ৬৭৫টি পোস্ট

গত জুন মাসে ভোটার তালিকা বিক্রির বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে একটি ফেসবুক পোস্টের মন্তব্যে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখতে পায় ডিসমিসল্যাব। বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত ‘সাইন কপি’ শব্দটি দিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে মোট ৬৭৫টি পোস্ট পাওয়া যায়। এর মধ্যে ১৫ জুন থেকে ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে প্রকাশিত ৬০৫টি পোস্টেই ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির প্রস্তাব ছিল। এ ধরনের একটি পোস্টের সূত্র ধরে ‘ভোটার লিস্ট’ নামের একটি টেলিগ্রাম গ্রুপের সন্ধান পান ডিসমিসল্যাবের গবেষকেরা। সেখানে এনআইডি বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখে তাঁরা নিজেরাই ক্রেতা পরিচয়ে বিজ্ঞাপনদাতার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

৫০০ টাকায় ১৭ মিনিটে পাওয়া গেল এনআইডির কপি

ডিসমিসল্যাবের গবেষকেরা একটি মুঠোফোন নম্বর সরবরাহ করে এনআইডির তথ্য চান। বিজ্ঞাপনদাতাকে ৫০০ টাকা দেওয়ার মাত্র ১৭ মিনিটের মধ্যেই ওই মুঠোফোন নম্বরের গ্রাহকের এনআইডি কার্ডের পিডিএফ কপি দেওয়া হয়। পরে যাচাই করে দেখা যায়, সেখানে থাকা নাম, ছবি, জন্মতারিখসহ সব তথ্য সংশ্লিষ্ট সিম-মালিকের প্রকৃত তথ্যের সঙ্গে মিলে গেছে। শুধু তাই নয়, ওই ব্যক্তির এনআইডিতে দুই মাস আগে সংশোধন করা তাঁর মায়ের নামটিও হালনাগাদ অবস্থায় পাওয়া যায়। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অনলাইন বাজারে ভোটার নম্বর বা মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে এনআইডি সার্ভার কপি পাওয়ার জন্য ১৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। বিস্তারিত তথ্যসংবলিত তথাকথিত ‘সাইন কপি’ বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে।

পাওয়া যাচ্ছে কল রেকর্ড ও মোবাইলের অবস্থানের তথ্যও

ওই একই টেলিগ্রাম গ্রুপে ‘হেল্প বিডি’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকেও বিভিন্ন ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছিল। সেখানে এনআইডির পাশাপাশি জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন, মোবাইল ফোনের অবস্থান, কল ডিটেলস রেকর্ড বা সিডিআর, এসএমএসের তালিকা, আইএমইআই নম্বর, টিআইএন, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, পাসপোর্ট কপি এবং ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ বিক্রির কথাও উল্লেখ করা হয়।

১ হাজার ৫০ টাকায় তিন মাসের কল রেকর্ড

গত ২৫ জুন ওই গ্রুপের একজন অ্যাডমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। একটি গ্রামীণফোন নম্বর দিয়ে সেটির তিন মাসের কল ডিটেলস রেকর্ড বা সিডিআর চাওয়া হয়। এ জন্য ১ হাজার ৫০ টাকা দেওয়া হয়। আড়াই ঘণ্টার মধ্যেই বিজ্ঞাপনদাতারা কল রেকর্ডের ফাইল পাঠিয়ে দেয়। পরে ফাইলে থাকা সাম্প্রতিক ২০টি যোগাযোগ নম্বর, কলের সময় এবং কলের ধরন সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের প্রকৃত কল-ইতিহাসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হলে সব তথ্যের মিল পাওয়া যায়। অনুসন্ধানে পাওয়া বিভিন্ন ওয়েবসাইটের মূল্যতালিকা অনুযায়ী, তিন মাস থেকে এক বছরের কল ডিটেলস রেকর্ড ৯০০ থেকে ২ হাজার টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে।

১৬ মিনিটে মিলেছে মোবাইলের অবস্থান ও গুগল ম্যাপের তথ্য

অন্য একটি ওয়েবসাইটে একটি গ্রামীণফোন নম্বরের অবস্থান জানতে চাওয়া হয়। টাকা দেওয়ার মাত্র ১৬ মিনিটের মধ্যে নম্বরটির সর্বশেষ সক্রিয় সময়, মোবাইল টাওয়ারভিত্তিক অবস্থান, একটি ঠিকানা এবং গুগল ম্যাপের লিংক দেওয়া হয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, লাইভ বা রিয়েল-টাইম লোকেশন তথ্যের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। মোবাইল হ্যান্ডসেটের আইএমইআই নম্বরের তথ্য পেতেও ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

বিকাশ-নগদের হিসাব বিবরণীও বিক্রির অভিযোগ

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাব বিবরণীও অনলাইনে বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। একাধিক ওয়েবসাইটের মূল্যতালিকায় বিকাশ বা নগদের পূর্ণাঙ্গ অ্যাকাউন্ট স্টেটমেন্ট ৩ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকার মধ্যে বিক্রির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ডিসমিসল্যাবের গবেষকদের সঙ্গে কথা বলা চাঁদপুরের একটি ওয়েবসাইটের মালিক দাবি করেন, ৪ হাজার ৫০০ টাকায় বিকাশ স্টেটমেন্ট পাওয়া যায়। ওই বিক্রেতা আরও জানান, তিনি ৮০০ টাকায় মোবাইল গ্রাহকের কল তালিকা কিনে ৯০০ টাকায় বিক্রি করেন।

বড় বাজার, বিভিন্ন স্তরে চলছে তথ্য কেনাবেচা

ফেসবুক পোস্ট এবং টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের সূত্র ধরে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির সঙ্গে জড়িত ১০টি সক্রিয় ওয়েবসাইট শনাক্ত করেছে ডিসমিসল্যাব। এসব ওয়েবসাইটে এনআইডি, জন্মনিবন্ধন, টিআইএন, সিডিআর, মোবাইল অবস্থানসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত তথ্যের আলাদা মূল্যতালিকা দেওয়া ছিল। ডিসমিসল্যাবের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শনাক্ত করা প্রায় সব ওয়েবসাইটের নকশা ও পরিচালনপদ্ধতিও একই ধরনের। এসব বিজ্ঞাপন ও পোস্টে যোগাযোগের জন্য অন্তত ১১২টি ভিন্ন মুঠোফোন নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া ৩৬টি সক্রিয় ফেসবুক গ্রুপে বারবার ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন পাওয়া গেছে।

অনেক বিক্রেতাই মূল উৎস নন

ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রি করা অনেক ব্যক্তি সরাসরি তথ্যের মূল উৎস নন। তাঁরা অন্য কোনো ওয়েবসাইট, গ্রুপ বা মধ্যস্বত্বভোগীর কাছ থেকে তথ্য কিনে পরে বেশি দামে বিক্রি করেন। অর্থাৎ ব্যক্তিগত তথ্য কেনাবেচার এই বাজারে রয়েছে একাধিক স্তর—মূল তথ্যের উৎস, পাইকারি বিক্রেতা এবং খুচরা বিক্রেতা। এ কারণে একজন নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য একবার ফাঁস হলে তা একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হাতে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

সরকারি সার্ভারের নিরাপত্তা ভাঙার দাবি, তবে স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি

ডিসমিসল্যাবের সঙ্গে কথা বলা এক বিক্রেতা দাবি করেন, তিনি একটি গ্রুপ থেকে এসব তথ্য সংগ্রহ করেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, ওই গ্রুপটি এপিআই ব্যবহার করে সরকারি সার্ভারের নিরাপত্তা ভেঙে তথ্য সংগ্রহ করে। এপিআই বা অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস হলো দুটি ভিন্ন সফটওয়্যার বা কম্পিউটার সিস্টেমের মধ্যে নিয়ন্ত্রিতভাবে তথ্য আদান-প্রদানের যোগাযোগব্যবস্থা। তবে সরকারি সার্ভারের নিরাপত্তা ভেঙে তথ্য সংগ্রহের বিষয়ে বিক্রেতার এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি ডিসমিসল্যাব।

২০২৩ সাল থেকেই পাওয়া যাচ্ছে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির পোস্ট

ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকেই অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন ও পোস্ট পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে ইউটিউবেও একই ধরনের সেবার বিজ্ঞাপনসংবলিত ভিডিও পাওয়া যায়। অর্থাৎ এটি কোনো সাম্প্রতিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং কয়েক বছর ধরে ব্যক্তিগত তথ্য কেনাবেচার একটি অনলাইন নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকার ইঙ্গিত মিলেছে।

কী থাকে সিডিআরে, কেন এটি এত সংবেদনশীল

বিশেষজ্ঞদের মতে, কল ডিটেলস রেকর্ড বা সিডিআরে একজন ব্যক্তি কার সঙ্গে কথা বলেছেন, কখন কথা বলেছেন এবং কতক্ষণ কথা বলেছেন—এসব তথ্য থাকতে পারে। একজন ব্যক্তি কল করেছেন নাকি কল গ্রহণ করেছেন, সে সম্পর্কেও তথ্য পাওয়া যায়। এ ছাড়া আইএমইআই বা মুঠোফোনের শনাক্তকরণ নম্বর এবং কল বা এসএমএসের সময় ব্যবহৃত মোবাইল টাওয়ারের তথ্যও থাকতে পারে। দীর্ঘ সময়ের কল রেকর্ড বিশ্লেষণ করলে একজন ব্যক্তি নিয়মিত কোথায় যান, কার সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তাঁর চলাফেরার ধরন কেমন—এসব বিষয়ে ধারণা পাওয়া সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

নজরদারি, হয়রানি ও প্রতারণার বড় ঝুঁকি

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, কল ডিটেলস রেকর্ড এবং অবস্থানসংক্রান্ত তথ্যের মাধ্যমে একজন মানুষের যোগাযোগ ও চলাফেরার ধরন সম্পর্কে জানা সম্ভব। ফলে এসব তথ্য নজরদারি, ব্যক্তিগত হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল কিংবা প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এনআইডি ও অন্যান্য পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করে পরিচয় জালিয়াতি, অন্যের নামে ভুয়া পরিচয় তৈরি, ভুয়া ব্যাংক বা আর্থিক হিসাব খোলা এবং বিভিন্ন ধরনের আর্থিক অপরাধ সংঘটিত হতে পারে। সুমন আহমেদ সাবিরের মতে, এ ধরনের রিয়েল-টাইম তথ্য ফাঁসের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ব্যক্তি বা সিস্টেমের দুর্বলতা থাকার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন।

মোবাইল অপারেটরদের তথ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন

অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইন অনুযায়ী কল রেকর্ড ও ব্যবহারকারীর অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য মোবাইল অপারেটরদের কাছে সংরক্ষিত থাকে এবং নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা ও তদন্তের প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাকে দেওয়া হতে পারে। গ্রামীণফোন ও রবি লিখিতভাবে জানিয়েছে, তারা আইন ও নিয়মের বাইরে কোনো তথ্য তৃতীয় পক্ষকে সরবরাহ করে না। তবে একটি মোবাইল অপারেটরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিসমিসল্যাবকে জানান, বিটিআরসি, এনটিএমসি, পুলিশ সদর দপ্তরসহ অন্তত ১০টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কাছে অপারেটরদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিস্টেমে সরাসরি প্রবেশাধিকার রয়েছে। ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, তাদের নিজস্ব তদন্তে একটি সরকারি সংস্থার এপিআই ব্যবহারের মাধ্যমে তথ্য ফাঁসের বিষয়টি ধরা পড়েছিল এবং এ বিষয়ে বিটিআরসিকে একাধিকবার জানানো হয়েছিল।

তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানাল বিটিআরসি

বিটিআরসির সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের পরিচালক কর্নেল মো. কামরুল হাসান মামুন জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্তাধীন বিষয়গুলো নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

২০২৪ সালেও তথ্য পাচারের অভিযোগ

এর আগে ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে এনটিএমসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পাঠানো একটি চিঠিতে তথ্য পাচারের একটি ঘটনার কথা জানিয়েছিল বলে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে অ্যান্টি-টেররিজম ইউনিটের এক পুলিশ সুপার এবং র্যাব-৬-এর এক সহকারী পুলিশ সুপারের লগইন পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে তথ্য পাচারের অভিযোগের কথা বলা হয়। এ ছাড়া সাইবার ক্রাইম বিভাগের এক কনস্টেবল অর্থের বিনিময়ে কল রেকর্ড বিক্রির কথা স্বীকার করেছিলেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আইনে শাস্তির বিধান থাকলেও কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন

ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২৬ অনুযায়ী ব্যক্তির সম্মতি ছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে দেশে বড় ধরনের তথ্য ফাঁসের ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তির নজির নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ‘টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট’-এর একটি গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ঘটে যাওয়া ৬৮টি বড় তথ্য ফাঁসের ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তির নজির খুবই সীমিত।

সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মন্তব্য পাওয়া যায়নি

এনআইডির তথ্য এভাবে বিক্রি হওয়ার বিষয়ে ডিসমিসল্যাব নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ পরিচালকের কাছে জানতে চাইলে তিনি লিখিত আবেদন করতে বলেন। প্রতিষ্ঠানটি এনআইডি অনুবিভাগের মহাপরিচালক, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার বা এনটিএমসি এবং ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সির মহাপরিচালকের সঙ্গেও যোগাযোগ করে। তবে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁদের কাছ থেকে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

নাগরিকদের জন্য বড় প্রশ্ন—ব্যক্তিগত তথ্য কতটা নিরাপদ?

এনআইডি থেকে শুরু করে কল রেকর্ড, মোবাইলের অবস্থান, এসএমএসের তালিকা এবং আর্থিক হিসাব বিবরণীর মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য যদি অল্প টাকায় অনলাইনে পাওয়া যায়, তাহলে সাধারণ নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা কতটা সুরক্ষিত—সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তথ্য ফাঁসের উৎস চিহ্নিত করা, মধ্যস্বত্বভোগী ও অনলাইন বিক্রেতাদের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা এবং যেসব প্রতিষ্ঠান নাগরিকদের সংবেদনশীল তথ্য সংরক্ষণ করে তাদের সাইবার ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদার করা জরুরি। অন্যথায় ব্যক্তিগত তথ্যের এই অবৈধ বাজার আরও বিস্তৃত হয়ে নাগরিকদের পরিচয়, আর্থিক নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারে।   জেটিভি নিউজ বাংলা

দেশ ও দশের কথা না.....

ট্যাগস

টাকা দিলেই অনলাইনে মিলছে এনআইডি, কল ডিটেলস, লাইভ লোকেশন ও বিকাশের তথ্য; ব্যক্তিগত তথ্য বেচাকেনায় গড়ে উঠেছে বড় অনলাইন বাজার

টাকা দিলেই অনলাইনে মিলছে এনআইডি, কল ডিটেলস, লাইভ লোকেশন ও বিকাশের তথ্য; ব্যক্তিগত তথ্য বেচাকেনায় গড়ে উঠেছে বড় অনলাইন বাজার

আপডেট সময় ৫ মিনিট আগে

জেটিভি নিউজ বাংলা

তারিখ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ইং,সময়: রাত ৮টা ৫৪ মিনিট

টাকা দিলেই অনলাইনে মিলছে এনআইডি, কল ডিটেলস, লাইভ লোকেশন ও বিকাশের তথ্য; ব্যক্তিগত তথ্য বেচাকেনায় গড়ে উঠেছে বড় অনলাইন বাজার

ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে ১০টি সক্রিয় ওয়েবসাইট, এক মাসে ফেসবুকে মিলেছে ৬০০টির বেশি বিজ্ঞাপন

সাধারণ নাগরিকদের ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্য কেনাবেচাকে ঘিরে বাংলাদেশে অনলাইনে গড়ে উঠেছে একটি বড় বাজার। ফেসবুকে বিজ্ঞাপন, বিভিন্ন ওয়েবসাইট, টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য। টাকা দিলেই পাওয়া যাচ্ছে জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি, কল ডিটেলস রেকর্ড বা সিডিআর, মোবাইল ফোনের অবস্থান, এসএমএসের তালিকা, আইএমইআই নম্বর, টিআইএন, পাসপোর্টের তথ্য, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন, ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ এবং মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাব বিবরণী। তথ্য যাচাইকারী ও মিডিয়া গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির সঙ্গে জড়িত ১০টি সক্রিয় ওয়েবসাইটের সন্ধান পাওয়া গেছে। এ ছাড়া মাত্র এক মাসে ফেসবুকেই এ ধরনের ৬০০টির বেশি বিজ্ঞাপন শনাক্ত করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

‘সাইন কপি’ লিখে অনুসন্ধানে পাওয়া যায় ৬৭৫টি পোস্ট

গত জুন মাসে ভোটার তালিকা বিক্রির বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে একটি ফেসবুক পোস্টের মন্তব্যে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখতে পায় ডিসমিসল্যাব। বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত ‘সাইন কপি’ শব্দটি দিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে মোট ৬৭৫টি পোস্ট পাওয়া যায়। এর মধ্যে ১৫ জুন থেকে ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে প্রকাশিত ৬০৫টি পোস্টেই ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির প্রস্তাব ছিল। এ ধরনের একটি পোস্টের সূত্র ধরে ‘ভোটার লিস্ট’ নামের একটি টেলিগ্রাম গ্রুপের সন্ধান পান ডিসমিসল্যাবের গবেষকেরা। সেখানে এনআইডি বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখে তাঁরা নিজেরাই ক্রেতা পরিচয়ে বিজ্ঞাপনদাতার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

৫০০ টাকায় ১৭ মিনিটে পাওয়া গেল এনআইডির কপি

ডিসমিসল্যাবের গবেষকেরা একটি মুঠোফোন নম্বর সরবরাহ করে এনআইডির তথ্য চান। বিজ্ঞাপনদাতাকে ৫০০ টাকা দেওয়ার মাত্র ১৭ মিনিটের মধ্যেই ওই মুঠোফোন নম্বরের গ্রাহকের এনআইডি কার্ডের পিডিএফ কপি দেওয়া হয়। পরে যাচাই করে দেখা যায়, সেখানে থাকা নাম, ছবি, জন্মতারিখসহ সব তথ্য সংশ্লিষ্ট সিম-মালিকের প্রকৃত তথ্যের সঙ্গে মিলে গেছে। শুধু তাই নয়, ওই ব্যক্তির এনআইডিতে দুই মাস আগে সংশোধন করা তাঁর মায়ের নামটিও হালনাগাদ অবস্থায় পাওয়া যায়। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অনলাইন বাজারে ভোটার নম্বর বা মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে এনআইডি সার্ভার কপি পাওয়ার জন্য ১৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। বিস্তারিত তথ্যসংবলিত তথাকথিত ‘সাইন কপি’ বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে।

পাওয়া যাচ্ছে কল রেকর্ড ও মোবাইলের অবস্থানের তথ্যও

ওই একই টেলিগ্রাম গ্রুপে ‘হেল্প বিডি’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকেও বিভিন্ন ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছিল। সেখানে এনআইডির পাশাপাশি জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন, মোবাইল ফোনের অবস্থান, কল ডিটেলস রেকর্ড বা সিডিআর, এসএমএসের তালিকা, আইএমইআই নম্বর, টিআইএন, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, পাসপোর্ট কপি এবং ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ বিক্রির কথাও উল্লেখ করা হয়।

১ হাজার ৫০ টাকায় তিন মাসের কল রেকর্ড

গত ২৫ জুন ওই গ্রুপের একজন অ্যাডমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। একটি গ্রামীণফোন নম্বর দিয়ে সেটির তিন মাসের কল ডিটেলস রেকর্ড বা সিডিআর চাওয়া হয়। এ জন্য ১ হাজার ৫০ টাকা দেওয়া হয়। আড়াই ঘণ্টার মধ্যেই বিজ্ঞাপনদাতারা কল রেকর্ডের ফাইল পাঠিয়ে দেয়। পরে ফাইলে থাকা সাম্প্রতিক ২০টি যোগাযোগ নম্বর, কলের সময় এবং কলের ধরন সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের প্রকৃত কল-ইতিহাসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হলে সব তথ্যের মিল পাওয়া যায়। অনুসন্ধানে পাওয়া বিভিন্ন ওয়েবসাইটের মূল্যতালিকা অনুযায়ী, তিন মাস থেকে এক বছরের কল ডিটেলস রেকর্ড ৯০০ থেকে ২ হাজার টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে।

১৬ মিনিটে মিলেছে মোবাইলের অবস্থান ও গুগল ম্যাপের তথ্য

অন্য একটি ওয়েবসাইটে একটি গ্রামীণফোন নম্বরের অবস্থান জানতে চাওয়া হয়। টাকা দেওয়ার মাত্র ১৬ মিনিটের মধ্যে নম্বরটির সর্বশেষ সক্রিয় সময়, মোবাইল টাওয়ারভিত্তিক অবস্থান, একটি ঠিকানা এবং গুগল ম্যাপের লিংক দেওয়া হয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, লাইভ বা রিয়েল-টাইম লোকেশন তথ্যের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। মোবাইল হ্যান্ডসেটের আইএমইআই নম্বরের তথ্য পেতেও ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

বিকাশ-নগদের হিসাব বিবরণীও বিক্রির অভিযোগ

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাব বিবরণীও অনলাইনে বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। একাধিক ওয়েবসাইটের মূল্যতালিকায় বিকাশ বা নগদের পূর্ণাঙ্গ অ্যাকাউন্ট স্টেটমেন্ট ৩ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকার মধ্যে বিক্রির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ডিসমিসল্যাবের গবেষকদের সঙ্গে কথা বলা চাঁদপুরের একটি ওয়েবসাইটের মালিক দাবি করেন, ৪ হাজার ৫০০ টাকায় বিকাশ স্টেটমেন্ট পাওয়া যায়। ওই বিক্রেতা আরও জানান, তিনি ৮০০ টাকায় মোবাইল গ্রাহকের কল তালিকা কিনে ৯০০ টাকায় বিক্রি করেন।

বড় বাজার, বিভিন্ন স্তরে চলছে তথ্য কেনাবেচা

ফেসবুক পোস্ট এবং টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের সূত্র ধরে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির সঙ্গে জড়িত ১০টি সক্রিয় ওয়েবসাইট শনাক্ত করেছে ডিসমিসল্যাব। এসব ওয়েবসাইটে এনআইডি, জন্মনিবন্ধন, টিআইএন, সিডিআর, মোবাইল অবস্থানসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত তথ্যের আলাদা মূল্যতালিকা দেওয়া ছিল। ডিসমিসল্যাবের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শনাক্ত করা প্রায় সব ওয়েবসাইটের নকশা ও পরিচালনপদ্ধতিও একই ধরনের। এসব বিজ্ঞাপন ও পোস্টে যোগাযোগের জন্য অন্তত ১১২টি ভিন্ন মুঠোফোন নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া ৩৬টি সক্রিয় ফেসবুক গ্রুপে বারবার ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন পাওয়া গেছে।

অনেক বিক্রেতাই মূল উৎস নন

ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রি করা অনেক ব্যক্তি সরাসরি তথ্যের মূল উৎস নন। তাঁরা অন্য কোনো ওয়েবসাইট, গ্রুপ বা মধ্যস্বত্বভোগীর কাছ থেকে তথ্য কিনে পরে বেশি দামে বিক্রি করেন। অর্থাৎ ব্যক্তিগত তথ্য কেনাবেচার এই বাজারে রয়েছে একাধিক স্তর—মূল তথ্যের উৎস, পাইকারি বিক্রেতা এবং খুচরা বিক্রেতা। এ কারণে একজন নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য একবার ফাঁস হলে তা একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হাতে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

সরকারি সার্ভারের নিরাপত্তা ভাঙার দাবি, তবে স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি

ডিসমিসল্যাবের সঙ্গে কথা বলা এক বিক্রেতা দাবি করেন, তিনি একটি গ্রুপ থেকে এসব তথ্য সংগ্রহ করেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, ওই গ্রুপটি এপিআই ব্যবহার করে সরকারি সার্ভারের নিরাপত্তা ভেঙে তথ্য সংগ্রহ করে। এপিআই বা অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস হলো দুটি ভিন্ন সফটওয়্যার বা কম্পিউটার সিস্টেমের মধ্যে নিয়ন্ত্রিতভাবে তথ্য আদান-প্রদানের যোগাযোগব্যবস্থা। তবে সরকারি সার্ভারের নিরাপত্তা ভেঙে তথ্য সংগ্রহের বিষয়ে বিক্রেতার এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি ডিসমিসল্যাব।

২০২৩ সাল থেকেই পাওয়া যাচ্ছে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির পোস্ট

ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকেই অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন ও পোস্ট পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে ইউটিউবেও একই ধরনের সেবার বিজ্ঞাপনসংবলিত ভিডিও পাওয়া যায়। অর্থাৎ এটি কোনো সাম্প্রতিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং কয়েক বছর ধরে ব্যক্তিগত তথ্য কেনাবেচার একটি অনলাইন নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকার ইঙ্গিত মিলেছে।

কী থাকে সিডিআরে, কেন এটি এত সংবেদনশীল

বিশেষজ্ঞদের মতে, কল ডিটেলস রেকর্ড বা সিডিআরে একজন ব্যক্তি কার সঙ্গে কথা বলেছেন, কখন কথা বলেছেন এবং কতক্ষণ কথা বলেছেন—এসব তথ্য থাকতে পারে। একজন ব্যক্তি কল করেছেন নাকি কল গ্রহণ করেছেন, সে সম্পর্কেও তথ্য পাওয়া যায়। এ ছাড়া আইএমইআই বা মুঠোফোনের শনাক্তকরণ নম্বর এবং কল বা এসএমএসের সময় ব্যবহৃত মোবাইল টাওয়ারের তথ্যও থাকতে পারে। দীর্ঘ সময়ের কল রেকর্ড বিশ্লেষণ করলে একজন ব্যক্তি নিয়মিত কোথায় যান, কার সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তাঁর চলাফেরার ধরন কেমন—এসব বিষয়ে ধারণা পাওয়া সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

নজরদারি, হয়রানি ও প্রতারণার বড় ঝুঁকি

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, কল ডিটেলস রেকর্ড এবং অবস্থানসংক্রান্ত তথ্যের মাধ্যমে একজন মানুষের যোগাযোগ ও চলাফেরার ধরন সম্পর্কে জানা সম্ভব। ফলে এসব তথ্য নজরদারি, ব্যক্তিগত হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল কিংবা প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এনআইডি ও অন্যান্য পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করে পরিচয় জালিয়াতি, অন্যের নামে ভুয়া পরিচয় তৈরি, ভুয়া ব্যাংক বা আর্থিক হিসাব খোলা এবং বিভিন্ন ধরনের আর্থিক অপরাধ সংঘটিত হতে পারে। সুমন আহমেদ সাবিরের মতে, এ ধরনের রিয়েল-টাইম তথ্য ফাঁসের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ব্যক্তি বা সিস্টেমের দুর্বলতা থাকার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন।

মোবাইল অপারেটরদের তথ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন

অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইন অনুযায়ী কল রেকর্ড ও ব্যবহারকারীর অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য মোবাইল অপারেটরদের কাছে সংরক্ষিত থাকে এবং নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা ও তদন্তের প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাকে দেওয়া হতে পারে। গ্রামীণফোন ও রবি লিখিতভাবে জানিয়েছে, তারা আইন ও নিয়মের বাইরে কোনো তথ্য তৃতীয় পক্ষকে সরবরাহ করে না। তবে একটি মোবাইল অপারেটরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিসমিসল্যাবকে জানান, বিটিআরসি, এনটিএমসি, পুলিশ সদর দপ্তরসহ অন্তত ১০টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কাছে অপারেটরদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিস্টেমে সরাসরি প্রবেশাধিকার রয়েছে। ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, তাদের নিজস্ব তদন্তে একটি সরকারি সংস্থার এপিআই ব্যবহারের মাধ্যমে তথ্য ফাঁসের বিষয়টি ধরা পড়েছিল এবং এ বিষয়ে বিটিআরসিকে একাধিকবার জানানো হয়েছিল।

তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানাল বিটিআরসি

বিটিআরসির সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের পরিচালক কর্নেল মো. কামরুল হাসান মামুন জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্তাধীন বিষয়গুলো নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

২০২৪ সালেও তথ্য পাচারের অভিযোগ

এর আগে ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে এনটিএমসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পাঠানো একটি চিঠিতে তথ্য পাচারের একটি ঘটনার কথা জানিয়েছিল বলে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে অ্যান্টি-টেররিজম ইউনিটের এক পুলিশ সুপার এবং র্যাব-৬-এর এক সহকারী পুলিশ সুপারের লগইন পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে তথ্য পাচারের অভিযোগের কথা বলা হয়। এ ছাড়া সাইবার ক্রাইম বিভাগের এক কনস্টেবল অর্থের বিনিময়ে কল রেকর্ড বিক্রির কথা স্বীকার করেছিলেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আইনে শাস্তির বিধান থাকলেও কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন

ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২৬ অনুযায়ী ব্যক্তির সম্মতি ছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে দেশে বড় ধরনের তথ্য ফাঁসের ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তির নজির নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ‘টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট’-এর একটি গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ঘটে যাওয়া ৬৮টি বড় তথ্য ফাঁসের ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তির নজির খুবই সীমিত।

সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মন্তব্য পাওয়া যায়নি

এনআইডির তথ্য এভাবে বিক্রি হওয়ার বিষয়ে ডিসমিসল্যাব নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ পরিচালকের কাছে জানতে চাইলে তিনি লিখিত আবেদন করতে বলেন। প্রতিষ্ঠানটি এনআইডি অনুবিভাগের মহাপরিচালক, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার বা এনটিএমসি এবং ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সির মহাপরিচালকের সঙ্গেও যোগাযোগ করে। তবে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁদের কাছ থেকে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

নাগরিকদের জন্য বড় প্রশ্ন—ব্যক্তিগত তথ্য কতটা নিরাপদ?

এনআইডি থেকে শুরু করে কল রেকর্ড, মোবাইলের অবস্থান, এসএমএসের তালিকা এবং আর্থিক হিসাব বিবরণীর মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য যদি অল্প টাকায় অনলাইনে পাওয়া যায়, তাহলে সাধারণ নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা কতটা সুরক্ষিত—সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তথ্য ফাঁসের উৎস চিহ্নিত করা, মধ্যস্বত্বভোগী ও অনলাইন বিক্রেতাদের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা এবং যেসব প্রতিষ্ঠান নাগরিকদের সংবেদনশীল তথ্য সংরক্ষণ করে তাদের সাইবার ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদার করা জরুরি। অন্যথায় ব্যক্তিগত তথ্যের এই অবৈধ বাজার আরও বিস্তৃত হয়ে নাগরিকদের পরিচয়, আর্থিক নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারে।   জেটিভি নিউজ বাংলা

দেশ ও দশের কথা না.....